সমস্ত তাবু জুড়ে একমাত্র জেগে রয়েছে বনহুর।
প্রফেসার ম্যাকমারা তাবুর সঙ্গে ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমাচ্ছিলেন, কিন্তু কতক্ষণ এভাবে ঘুমাবেন এক সময় বসে পড়লেন মাটির মধ্যে এবং তাবুতে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
বনহুর লক্ষ্য করলো ম্যাকমারা নিদ্রার কোলে হেলে পড়লেন। তাবুর অন্যান্য সবাই ঘুমাচ্ছে। তার পাশে ঘুমিয়ে রয়েছে মিস শ্যালন। বনহুর উঠে দাঁড়ালো দক্ষিণ হস্তে রিভলভারটা শক্ত করে ধরে পায়চারী করতে লাগলো। এক সঙ্গে সবাই ঘুমালে চলবে না, জেগে তাকে থাকতেই হবে। যদিও বনহুরের দু’চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছিলো, তবুও সে সজাগ হয়ে পাহারা দিতে লাগলো।
বার বার হাই উঠছে, বনহুর শ্যালনের উদ্ধারের জন্য দুদিন যা পরিশ্রম করেছে তা অবর্ণনীয়। পা দু’খানা ক্লান্তি আর অবসাদে যেন নুয়ে পড়ছে।
বনহুর একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলো। হঠাৎ শ্যালনের তীব্র চিৎকারে চমকে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে প্রফেসার ম্যাকমারা এবং অন্যান্য সবাই জেগে উঠলো।
বনহুর ফিরে তাকাতেই দেখলো বিরাট একখানা হাতের মুঠায় শ্যালনের দেহটা চোখের পলকে অদৃশ্য হলো।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে তাবু থেকে বেরিয়ে পড়লো, কিন্তু অন্ধকারে তখন অনেক দূরে চলে গেছে গরিলাটা শ্যালনকে নিয়ে।
হতাশ হয়ে বনহুর ফিরে এলো তাবুর মধ্যে।
ম্যাকমারা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন মাটি, ধুলো, বালির মধ্যে কণ্ঠ দিয়ে তার কোনো শব্দ বের হচ্ছেনা। অন্যান্য সবাই ভয়ে বিবর্ণ ফ্যাকাশে মুখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কারো কিছু করবার উপায় নেই।
আজ বনহুর নিজেও হতবাক হয়ে পড়েছে। কি বলে সে সান্তনা দেবে প্রফেসার ও তার ছাত্র দলকে।
ম্যাকমারা বনহুরকে স্নেহ করতো বলে প্রথম প্রথম দলের সবাই বনহুরকে ঈর্ষা করতো, কিন্তু এখন সবাই তাকে সমীহ করে। বনহুরই যেন এখন ওদের ভরসা।
ভোর হলেই তারা রওয়ানা দেবে ভেবেছিলো কিন্তু হলোনা, সব পণ্ড হয়ে গেলো। প্রফেসার ম্যাকমারা আর দাঁড়াতে পারলেন না। তিনি মাটির মধ্যে পড়ে গড়া গড়ি দিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
কিছু সময় কেটে গেলো, কারো চোখে ঘুম নেই।
হঠাৎ একটা খক্ খক্ শব্দে সবাই আবার সচকিত হয়ে উঠলো। প্রত্যেকেই নিজ নিজ অস্ত্র বাগিয়ে ধরলো।
শব্দটা ঠিক কোন লোক যেন খক্ খক্ করে কাশছে সে রকম বলে মনে হলো। অদ্ভুত এ শব্দ। বনহুর তাবুর বাইরে যাবার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করতেই প্রফেসার ম্যাকারা তাকে জাপটে ধরলেন– যেওনা বাবা আলম, ওটা ভয়ঙ্কর জীব। আমি ঐ জীবের ছবি নিয়েছি, আর সে ছবি সংগ্রহ করতে গিয়ে আমার পুত্র সমতুল্য একমাত্র তার হস্তে নিহত হয়েছে।
কথাটা শুনে বনহুরের আরও ইচ্ছা জাগলো জীবটাকে দেখার, কিন্তু কি উপায়ে দেখবে বা দেখতে পারবে।
বনহুর তাবুর একটি ফাঁকে চোখ রেখে তাকালো, যদিও বাইরে ঘন অন্ধকার তবুও বোঝা গেলো জীবটা অদ্ভুত দেখতে। বিরাট উঁচু বলে মনে হলো। মাথাটা কুমিড়ের মাথার মত লম্বাটে। সম্মুখে দুটো হাত আছে। পিছনের পা দু’খানার উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে জীবটা। বোধ হয় তাবুর মধ্যে মানুষের গন্ধ পেয়েছে।
বনহুর তাবুর ফাঁকে জীবটাকে লক্ষ্য করে রিভলভার উদ্যত করে ধরলো।
ম্যাকমারা উঠি পড়ি করে চেপে ধরলেন বনহুরের হাতখানা, চাপা কণ্ঠে বললেন–সর্বনাশ করোনা আলম।
বনহুর বললো–কেনো?
ও জীব অতি সাংঘাতিক, রিভলভারের গুলী ওর শক্ত চামড়া ভেদ করতে পারবেনা। বরং ক্রদ্ধ হয়ে আমাদের তাবু ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। প্রফেসার ম্যাকমারা তাবুর মধ্যের সমস্ত আলো নিভিয়ে ফেলার জন্য নির্দেশ দিলেন।
কয়েক জন মিলে চট পটু তাবুর মধ্যের মশালগুলো বালি চাপা দিয়ে নিভিয়ে ফেললো।
জীবটা তখনও অদ্ভুত কাশির মত শব্দ করে চলেছে।
এবার আলোগুলো নিভে যেতে জীবটা যেন একটু ভড়কে গিয়েছে বলে মনে হলো।
প্রফেসার ম্যাকমারা বললেন–ঐ জীবটা অন্ধকারে একেবারে চোখে দেখেনা। দিনের বেলা আলো ছাড়া ও বাইরে বের হয়না।
বনহুর বললো–ভুল করে হয়তো বাইরে এসে পড়েছে। কিন্তু অতো বড় একটা জীব থাকে কোথায়?
প্রফেসার ম্যাকমারা জবাব দিলেন–মাটির নিচে বিরাট গর্ত তৈরি করে ঐ সব জীব বাস করে।
জীবটা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে বলে মনে হলো, কতকটা আশ্বস্ত হলো তাবুর সবাই।
এক সময় ভোর হলো।
তাবুর বাইরে বেরিয়ে আসতেই বনহুর লক্ষ্য করলো তাবুর আশে পাশে ভিজে মাটিতে অদ্ভুত এক ধরনের পায়ের ছাপ। গরিলার পদচিহ্নের কাছাকাছি এলোমেলো ভাবে ফুটে রয়েছে। বনহুর আশ্চর্য হলো, এমন পদচিহ্ন সে কোনোদিন দেখেনি।
কিন্তু এখন তাদের যে অবস্থা তাতে তার চিন্তা করার বা কিছু ভাববার সময় নেই। বনহুর আজ দলবল নিয়ে অগ্রসর হলো না, সে একাই রওয়ানা দিলো।
প্রফেসার ম্যাকমারা হতাশভাবে চেয়ে রইলেন, অন্যান্য সকলে আজ কেউ সাহসী হলোনা বনহুরের সঙ্গে গমন করতে।
সবাই ভীত আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, আর এক মুহূর্ত কেউ থাকতে রাজি নয়। বনহুর বললো– আমি ফিরে না আসা অবধি আপনারা তাঁবুতে অপেক্ষা করুন।
তাঁবুর খাদ্যও প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো, যা কিছু অবশিষ্ট ছিলো তা শুকিয়ে শক্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পাউরুটি, শুকনো মাংস, প্যাটিজ সবগুলোরই প্রায় এক অবস্থা। একে বন্য হিংস্র জন্তুর ভয়, অন্যদিকে খাদ্যদ্রব্য সব অখাদ্য হয়ে উঠেছে। ছাত্রগণ ফিরে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, এমন সময় বনহুর আবার বেরিয়ে পড়লো মিস শ্যালনের উদ্দেশ্যে।
