বনহুর শ্যালনকে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে বললো–শ্যালন দেখো।
শ্যালন ওদিকে তাকিয়ে ছুটে গেলো–সর্বনাশ! আমাদের লোক!
বনহুরও ততক্ষণে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে যুবকের দেহটার পাশে। যুবকটার মাথা থেতলে চ্যাপটা হয়ে গেছে। মুখ দেখে চিনবার জো নেই। দেহের বহুস্থানে ক্ষত, তখনও তাজা রক্ত ঝরছে মৃতদেহটা থেকে।
শ্যালন দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেললো।
বনহুর বললো–হতভাগ্য গরিলার হস্তে জীবন দিয়েছে।
শ্যালন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
বনহুর বুঝতে পারলো–শ্যালনের কোমল মনে আঘাত লেগেছে। এ দৃশ্য সে সহ্য করতে পারছেনা। তাড়াতাড়ি শ্যালনকে নিয়ে সরে এলো বনহুর, অন্যান্য সঙ্গীদের অন্বেষণ করতে লাগলো।
বেশ কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক খোঁজাখুঁজি করতেই পাঁচ জনের মধ্যে তিন জনকে আবিষ্কার করে ফেললো বনহুর। ভয়ে সবাই আড়ষ্ট হয়ে লুকিয়ে ছিলো ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে। একজনের মৃত্যু হয়েছে, আর একজনকে পাওয়াই গেলোনা। বনহুর শেষ পর্যন্ত অনেক খোঁজাখুঁজি করেও যখন চার নম্বর ব্যক্তির সন্ধান পেলোনা তখন আর বিলম্ব করা উচিৎ মনে করলোনা। তিন জন সঙ্গীসহ শ্যালন আর বনহুর ফিরে চললো তাদের তাবুতে।
অতি সতর্ক এবং সাবধানে ওরা চলছে, না জানি আবার কোন দণ্ডে তাদের সম্মুখে কোনো বিপদ এসে পড়বে। কিংবা গরিলা মহারাজা এসে হামলা চালাবে। শ্যালন বনহুরের পাশে পাশে চলতে লাগলো।
প্রফেসার ম্যাকমারার ছাত্রদ্বয় এমনভাবে চলছে তারা বেঁচে আছে না মরে গেছে বোঝা যাচ্ছেনা। ওদের মুখ কালো বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। দু’দজন সঙ্গীকে হারিয়ে মনের অবস্থা অত্যন্ত মর্মান্তিক।
পথে তেমন কোনো বিপদে আর পড়লোনা।
বেলা শেষে বনহুর ফিরে এলো শ্যালন ও সঙ্গীদ্বয়কে নিয়ে।
প্রফেসার ম্যাকমারা সেই ভোর হতে একটিবার আসন গ্রহণ করেন নি, সদা বিলাপ করে। চলেছেন। শ্যালন তার জীবনের চেয়েও বেশি আদরিণী। একমাত্র কন্যা শ্যালনকে হারিয়ে তিনি উন্মাদ প্রায় হয়ে পড়েছেন।
শ্যালনকে ফিরে পেয়ে প্রফেসার আকাশের চাঁদ যেন হাতে পেলেন। কন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে শপথ করলেন। আমার জীবনের এই শেষ আবিস্কার চেষ্টা। আর কোনোদিন আমি নতুন কোনো জীবের সন্ধানে গহন বনে প্রবেশ করবোনা।
তাবুর অন্যান্য সবাই মরিয়া হয়ে উঠেছে, আর একটি দিনও তারা আফ্রিকার জঙ্গলে কাটাতে রাজি নয়। প্রফেসার ম্যাকমারার সখও মিটে গেছে ভালভাবে। ম্যাকমারা আফ্রিকার জঙ্গল ত্যাগ করার বাসনা প্রকাশ করলেন।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, রাত্রিটা তাদের এখানেই কাটাতে হবে। কিন্তু ভয়–গরিলা তার ছোট্ট মেয়েটির সন্ধানে আবার তাবুতে হানা দিয়ে বসবে না তো?
প্রফেসার ম্যাকমারা বললেন কাল ভোরেই আমরা আফ্রিকা জঙ্গল ত্যাগ করে চলে যাবো। জঙ্গলের দক্ষিণ অঞ্চলে বাইরে সাগরবক্ষে ম্যাকমারার জাহাজ অপেক্ষা করছে।
কিন্তু আজ রাতটা কাটবে কি ভাবে কে জানে!
ম্যাকমারা কন্যাকে নিয়ে বেশি চিন্তায় পড়লেন। বনহুরকে তিনি কি ভাবে যে কৃতজ্ঞতা জানাবেন ভেবে পাচ্ছেন না। একবার নয় দু’বার মৃত্যুর মুখ থেকে শ্যালনকে রক্ষা করে এসেছে আলম।
ম্যাকমারা কন্যাকে ছেড়ে দিলেন আলমের হাতে; তিনি বললেন –আলম, আমার শ্যালন তো তোমার। ওকে রক্ষা করেছো তুমি। বার বার মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছো। আজ রাতেও আমি শ্যালনকে তোমার জিম্মায় দিলাম। বাবা আলম, তুমিই ওকে যদি বাঁচাতে পারো।
বনহুর কোনো জবাব দিতে পারেনা।
কিন্তু রাতের বেলায় বাধ্য হলো বনহুর শ্যালনকে নিজের বিছানায় আশ্রয় দিতে।
প্রফেসার ম্যাকমারা ভয়ানকভাবে ভয় পেয়ে গেছেন। দলের একটি নয়, দুটি নয়, তিন তিনজনকে হারিয়েছেন তিনি। নতুন আবিস্কারের স্বপ্ন তার অন্তর থেকে উধাও হয়েছে জন্মের মত। রাত ভোর না হওয়া পর্যন্ত তার সান্তনা হচ্ছেনা। অস্থির চিত্ত নিয়ে তিনি তাবুর মধ্যে পায়চারী করছেন।
অন্যান্য সকলে বসে বসে ঝিমুচ্ছে, সকলের মধ্যেই একটা ভীত আতঙ্কভাব ভাব ফুটে উঠেছে। কারো মুখে কোন কথা নেই, সমস্ত তাবুর মধ্যে বিরাজ করছে একটা নিস্তব্ধতা।
বনহুর তার বিছানার এক কোণে বসে আছে, পাশে পড়ে রয়েছে গুলীভরা রিভলভার। সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলেছে। বিছানায় ঘুমিয়ে আছে শ্যালন। একরাশ সোনালী চুলের ফাঁকে শ্বেত পঙ্খীর মত শুভ্র সুন্দর একখানা মুখ।
বনহুরের দৃষ্টি এক সময় তার অজ্ঞাতেই চলে গেলো ঘুমন্ত শ্যালনের মুখে। চট করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারেনা সে। মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকে। সিগারেটটা দূরে নিক্ষেপ করে সে, তারপর দক্ষিণ হাতখানা রাখে শ্যালনের কোমল নরম চিবুকের উপর। চুলগুলো আলগোছে সরিয়ে দেয় আঙুল দিয়ে।
আবার ফিরে তাকায় সে তাবুর একপাশে যেখানে ভীত দুর্বল ছাত্রগণ জড়োসড়ো হয়ে। গুমটোমেরে শুয়ে আছে। বড় অসহায় বলে মনে হয় ওদেরকে।
রাত গম্ভীর হতে গভীরতর হয়ে আসছে।
তাবুর বাইরে নানা রকম জীব-জন্তুর কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে আসছিলো।
আজ কদিন প্রফেসার ম্যাকমারার চোখে ঘুম নেই। গত দুদিন তিনি সব সময় কন্যার জন্য কাঁদা কাটা করেছেন। আজ তিনি বড় ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছেন, তবু হুসিয়ারীর সঙ্গে পাহারা দিচ্ছেন। যাতে কোন ক্রমে তার কন্যা বিপদগ্রস্ত না হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যাকমারা আর পারলেন না, নিদ্রা দেবী তার দু’চোখে এসে ভর করলেন। তিনি তাবুর সঙ্গে ঠেশ দিয়ে দাঁড়ালেন, চোখ দুটো ধীরে ধীরে মুদে এলো।
