গরিলা এবার প্রবেশ করলো সুড়ঙ্গ মধ্যে। একটা পাগলা হাতি যেন হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে। নিশ্বাসটা যেন ঠিক ঝড়ের মত মনে হলো।
বনহুর রিভলভার ঠিক রেখে প্রতিক্ষা করতে লাগলো। শ্যালন কাঁধে না থাকলে সে নিজেকে এতোটা বিপন্ন মনে করতোনা। শ্যালনের জন্যই তার যত চিন্তা হচ্ছিলো।
গরিলার দেহটা সুড়ঙ্গ মধ্যে হস্তির দেহের মত গড়িয়ে গড়িয়ে এগুচ্ছে। একটা উৎকট ফোঁস ফোঁস শব্দ ক্রমান্বয়ে নিকটবর্তী হচ্ছে বনহুরের। ওটা গরিলা-রাজের নিশ্বাসের শব্দ বলেই মনে হলো তার।
সুড়ঙ্গ মধ্যে এতোক্ষণ তবু কিঞ্চিৎ আলোক রশ্মি প্রবেশে সক্ষম হচ্ছিলো, এবার গভীর অন্ধকার জমাট হয়ে এলো। বনহুর লক্ষ্য করলো তার সম্মুখে মেঘের মত একটা গাঢ় অন্ধকার থ’ মেরে দাঁড়িয়ে পড়েছে, সঙ্গে সঙ্গে ভোটা গন্ধ। গরিলা-রাজের দেহের গন্ধ বেশ অনুভব করলো বনহুর। ফাটলের মধ্যে যতদূর সম্ভব নিজেকে গোপন করে দাঁড়িয়ে রইলো।
গরিলাটা আরও কিছুটা হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হলো, এবার বোধ হয় সে শ্যালনকে খুঁজে চলেছে, বাম হস্ত দিয়ে গরিলা হাতড়াচ্ছে সুড়ঙ্গ মধ্যে।
বনহুরের পাশ দিয়ে চলে গেলো বার কয়েক হাতখানা। বনহুর ফাটলের মধ্যে এমনভাবে আত্মগোপন করে রইলো যাতে একটুও দেখা না যায়। এখনও বনহুরের কাঁধে শ্যালনের অজ্ঞান দেহটা পূর্বের মতই ধরা রয়েছে।
গরিলা মহারাজ এবার হুঙ্কার ছাড়ে, সমস্ত সুড়ঙ্গ মধ্যে থরথর করে কেঁপে উঠে। বনহুর বুঝতে পারে–শ্যালনকে খুঁজে না পেয়ে সে এমন করছে। _ রুদ্ধ নিশ্বাসে বনহুর প্রতিক্ষা করছে, না জানি আজ তার এবং শ্যালনের জীবনে এই শেষ মুহূর্ত কিনা।
গরিলা বার বার হাতড়ে ফিরছে, অন্ধকারে সে দেখতে পাচ্ছেনা বটে, কিন্তু হাত দিয়ে সে অনুভব করে দেখছে মেয়েটিকে। সে যেখানে রেখে গেছে সেখানে আছে কিনা। ক্রমেই গরিলার রাগ চরমে উঠলো। পিছু হটে সে সুড়ঙ্গ মধ্য থেকে বেরিয়ে গেলো বাইরে।
বনহুর এবার হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
শ্যালনের সংজ্ঞাহীন দেহটা কাঁধের উপর থেকে নামিয়ে নিলো দু’হাতের উপর, তারপর শ্যালনকে কোলের উপর শুইয়ে দিয়ে বসে পড়লো।
বাইরে তখন গরিলা মহারাজ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। মনে হচ্ছে, সুড়ঙ্গ মুখের বাইরে যেন ভীষণ ভাবে ঝড় শুরু হয়েছে। গাছপালা ভেঙে পড়ার মড় মড় শব্দ, বড় বড় পাথর ছুঁড়ে ফেলার গুম্ গুম আওয়াজ আর তার সঙ্গে গরিলার কণ্ঠের গর্জন। দুর্বল হৃদয় মানুষ হলে এতোক্ষণ সে শ্যালনের মতই অজ্ঞান হয়ে পড়তো।
বনহুরের হৃদয় কঠিন, লোহার চেয়েও শক্ত তার মনসামান্যে ভীতু হবার বান্দা সে নয়। সে জানে, গরিলা মহারাজ আর ফিরে গুহামধ্যে আসবেনা। মনে পড়লো সঙ্গী-সাথীদের কথা প্রফেসর ম্যাকমারার অন্যান্য ছাত্রদের কথা। না জানি বেচারীদের অবস্থা কি হয়েছে। সুড়ঙ্গ মুখেই ওরা অপেক্ষা করছিলো–
হঠাৎ বনহুরের চিন্তাধারা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, শ্যালন নড়ে উঠে ধীর মৃদু কণ্ঠে বলে –কে–কে তুমি?
বনহুর শ্যালনের হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে বলে–শ্যালন আমি। আমি আলম।
শ্যালন বনহুরকে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরে–গরিলাটা কোথায়?
ভয় নেই শ্যালন, গরিলা মহারাজ বাইরে চলে গেছে।
ও কিসের শব্দ? সুড়ঙ্গ মুখ থেকে তখন ভীষণ আওয়াজ আসছিলো। সে আওয়াজ শুনে শ্যালন কম্পিত কণ্ঠে কথাটা জিজ্ঞাসা করলো বনহুরকে।
বনহুর শ্যালনের হাতখানা দক্ষিণ হস্তে ধরে বললো–গরিলাটা সুড়ঙ্গ মধ্যে তোমাকে না পেয়ে ক্ষেপে গেছে।
তাহলে উপায়?
আর আসবেনা বলেই মনে হচ্ছে।
কিন্তু আমার বড় ভয় হচ্ছে, আবার যদি আসে–
ভয় করোনা শ্যালন, আমি যতক্ষণ আছি ততক্ষণ তোমার কোনো চিন্তা নেই। গরিলা তোমাকে স্পর্শ করতে পারবেনা।
আলম, তুমি আমার বন্ধু।
হাঁ শ্যালন, আমাকে বন্ধু বলেই মনে করো।
শ্যালন বনহুরের কণ্ঠ আলিঙ্গন করে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলো তার গণ্ডদ্বয়, আবেগ ভরা গলায় ডাকলো–আলম! বন্ধু!
বনহুরের শিরায় শিরায় জেগে উঠলো তার পৌরুষত্বভাব, কিন্তু সে নিজেকে পাষাণের মত সংযমী করে রাখলো। যদিও তার হৃদয়ে একটা উন্মত্ত উন্মাদনা ভীষণভাবে আলোড়ন জাগাচ্ছিলো তবু সে এতোটুকু বিচলিত হলোনা। ধীরস্থির গম্ভীর গলায় বললো–শ্যালন, এর বেশি তুমি আমার কাছে কিছু পাবে না।
বনহুরের কথাটা শ্যালন ঠিক বুঝলো কিনা সন্দেহ, তার মুখে ভাবের কোনো পরিবর্তন এলো কিনা তাও দেখা গেলোনা গাঢ় অন্ধকারে।
বাইরে তখন গরিলা মহারাজের প্রচণ্ড দাপট থেমে এসেছে। বোধ হয় গরিলাটা চলে গেছে তার ছোট্ট মেয়েটির সন্ধানে।
বনহুর বললো–শ্যালন, গরিলা মহারাজ বোধ হয় সরে গেছে। চলো এবার পালাই।
আমার কিন্তু বড় ভয় করছে। বাইরে বেরুলেই যদি আবার সে আমাকে ধরে ফেলে?
অবশ্য শ্যালনের কথাটা মিথ্যা নয়, আরও কিছুটা সময় তাদের অপেক্ষা করা উচিৎ এখানেই। যদিও বনহুরের কাছে এই মুহূর্তগুলো অত্যন্ত অপ্রতিভ মনে হচ্ছিলো তবু বাধ্য হলো সে কিছু সময় এই অন্ধকারে আত্মগোপন করতে।
*
বেশ কিছু সময় কেটে যাবার পর বনহুর আর শ্যালন সুড়ঙ্গের বাইরে বেরিয়ে এলো। সুড়ঙ্গমুখ এখন ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে ঢাকা নেই। গরিলা সব ডালপালাগুলো ক্রুদ্ধ হয়ে দূরে নিক্ষেপ করেছে।
হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি চলে গেলো অদূরে, বিস্ময়ভরা চোখে দেখলো–অদূরে একটা গাছের গুঁড়ি পাশে পড়ে আছে তাদেরই দলের একজন যুবক।
