বনহুর তাদের পিঠ চাপড়ে সাহস দিলে বললো–ভয় কি মৃত্যু যখন একদিন হবেই, তখন না। হয় দু’দিন আগেই মরলেন। ঘরে রোগে ধুকে মরার চেয়ে বীরের মত মরবেন।
বনহুরের কথা শুনে আবার তাদের সাহস হলো, নব উদ্যমে পাহাড়টার গা বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। প্রত্যেকের হস্তেই গুলী ভরা রাইফেল। বনহুরের হস্তে রিভলভার পিঠে বাঁধা আছে রাইফেল। কোমরের বেল্টে সূতীক্ষ্ণ-ধার ছোরা। সম্পূর্ণ কালো ড্রেস তার শরীরে।
বেশ কিছুটা উপরে উঠার পর তারা লক্ষ্য করলো–পদচিহ্ন বামদিকে বাঁকা হয়ে চলে গেছে। ওদিকে জঙ্গলটা বেশ ফাঁকা বলে মনে হলো। কিন্তু অল্প কিছুটা এগুনোর পর সম্মুখে দেখা গেলো প্রকাণ্ড একটা সুড়ঙ্গ মুখ। সুড়ঙ্গ মুখটা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না, কারণ সুড়ঙ্গ মুখে অনেকগুলো ডালপালা স্তূপাকার করে রাখা হয়েছে। কিন্তু বনহুর পদচিহ্ন লক্ষ্য করে এগুতে লাগলো, তার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে একটা আনন্দদ্যুতি। নিশ্চয়ই এ গুহাটা সেই গরিলা মহারাজের। এখানেই হয়তো পাওয়া যাবে শ্যালনকে।
বনহুর ও তার দল বল গুহাটার নিকটে এসে উপস্থিত হলো। গুহার মুখে এমন ভাবে আগাছা আর ডালপালা রাখা হয়েছে, গুহার মধ্যে প্রবেশ করা কিছুতেই সম্ভব নয়।
বনহুরের সঙ্গীগণ ভয় পেয়ে গেছে বলে মনে হলো, ওরা আর এগুতে রাজি নয়। বনহুর অগত্যা। নিজেই ডালপালা সরাতে শুরু করলো।
অন্যান্য সকলে তাকে সাহায্য করলো বটে, কিন্তু কেউ সুড়ঙ্গ মধ্যে প্রবেশ করতে সাহসী হলোনা। অনেক চেষ্টায় খানিকটা ফাঁকা করে নিয়ে সেই পথে বনহুর সুড়ঙ্গ মধ্যে প্রবেশ করলো।
বনহুরের সঙ্গীগণ এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিলো, সকলেরই মুখ ভয়ে বিবর্ণ হলো। কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার, সুড়ঙ্গ মধ্যে কি বিপদ যে ওৎপেতে বসে আছে কে জানে।
সুড়ঙ্গ মুখটা ছিলো বিরাট, অনায়াসে একটি হস্তী এ সুড়ঙ্গে প্রবেশে সক্ষম হবে। বনহুর সঙ্গে একটি টর্চ এনেছিলো, সে টর্চটি এ মুহূর্তে তার কাজে এলো। সুড়ঙ্গ মধ্যে ঘন অন্ধকার জমাট বেঁধে উঠেছিলো। বনহুর টর্চের আলো ফেলে অগ্রসর হলো। সুড়ঙ্গ মধ্যে প্রবেশ করে মাটিতে টর্চের আলো ফেলতেই আশ্চর্য হলো সে, মাটিতে এখন কোনো পদচিহ্ন নেই শুধু গোলাকার গর্তের মত দাগ স্পষ্ট হয়ে ফুটে রয়েছে। ভাল করে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারলো বনহুর, গোলাকার দাগগুলো অন্য কিছু নয়–গরিলাটি এ সুড়ঙ্গ মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রবেশ করতে পারে না, তাই সে হামাগুড়ি দিয়ে এর মধ্যে প্রবেশ করে থাকে। গরিলার হাটুর দাগ ব্যস হস্তীপদ চিহ্নের আকার ধারণ করেছে।
বনহুর বুঝতে পারলো– গরিলা মহারাজ হামাগুড়ি দিয়ে এ সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে থাকে। এ সুড়ঙ্গটাই তার বাসস্থান। অল্প কিছুটা অগ্রসর হতেই বনহুরের কানে একটা করুণ কান্নার শব্দ এসে পৌঁছলো। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনলে মানুষের কণ্ঠ বলেই মনে হলো তার–তবে কি শ্যালনের কণ্ঠ? নিশ্চয়ই তাই হবে, না হলে এই নির্জন পাহাড়িয়া অঞ্চলে মানুষ আসবে কোথা হতে।
বনহুর শব্দ লক্ষ্য করে দ্রুত অগ্রসর হলো।
কিন্তু বেশিদূর তাকে এগুতে হলোনা, অন্ধকারে গুটিশুটি মেরে সাদা মত কিছু নজরে পড়লো। টর্চের আলো ফেলতেই বনহুরের মুখমণ্ডল আনন্দে উজ্জ্বল হলো।
শ্যালনও আলো দেখে চোখ তুলে তাকালো, বনহুরকে দেখে প্রথমে চমকে উঠলো–তারপর ছুটে এসে জাপটে ধরলো–আলম, তুমি এসেছো–আলম–আলম–
বনহুরকে আঁকড়ে ধরে শ্যালন থর থর করে কাঁপছে।
বনহুর শ্যালনকে বাম হস্তে কাছে টেনে নিয়ে বলে উঠে–ভয় নেই শ্যালন! চলো, শীঘ্র এখান থেকে পালাতে হবে।
আলম, গরিলাটা আবার এসে পড়বে না তো?
জানিনে, তবে তুমি শীঘ্র চলো।
বনহুর শ্যালনকে নিয়ে দ্রুত সুড়ঙ্গ মধ্য হতে বেরিয়ে আসতে লাগলো। সম্পূর্ণ দুটো দিন অনাহারে কাটানোর পর শ্যালন বড় দুর্বল হয়ে পড়েছিলো, বনহুর ওকে বলিষ্ঠ হাতে ধরে রাখলো শক্ত করে।
সুড়ঙ্গ মুখে বেরিয়ে আসতেই একটা হুঙ্কার বনহুর আর শ্যালনের কানে ধাঁ ধাঁ লাগিয়ে দিলো।
শ্যালন বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো, পরক্ষণেই বনহুরের হাতের উপর ঢলে পড়লো।
গরিলা মহারাজ তখন একেবারে প্রায় এসে পড়েছে। বনহুর এ মুহূর্তে কি করবে ভেবে পায়না, সংজ্ঞাহীন শ্যালনের দেহটা হাতের উপর তুলে নিয়ে দ্রুত সরে দাঁড়ালো পাশের একটা ফাটলের মধ্যে।
গরিলার হুঙ্কার তখন আরও ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে, তীব্র আর্তনাদ শোনা গেলো সুড়ঙ্গ মুখের বাইরে থেকে। বোধ হয় প্রফেসার ম্যাকমারার কোনো ছাত্র গরিলা রাজের হস্তে প্রাণ বিসর্জন দিলো। বনহুরের এখন অন্য কথা চিন্তা করার সময় নেই। গরিলার হাত থেকে নিজে বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে শ্যালনকে।
বনহুর শ্যালনের দেহটা কাঁধে ফেলে দক্ষিণ হস্তে রিভলভার উদ্যত করে দাঁড়ালো। সমস্ত শরীর তার ঘেমে চুপসে উঠেছে। সুড়ঙ্গ মধ্যে একটা ভ্যাপসা গরম, তারপর শ্যালনের সংজ্ঞাহীন দেহটা তখন তার কাঁধে। বনহুর রুদ্ধ নিশ্বাসে প্রতিক্ষা করছে গরিলা মহারাজের।
এবার বনহুর লক্ষ্য করলো সুড়ঙ্গ মুখ থেকে ডালপালা সব সরিয়ে ফেলেছে গরিলাটা, ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে সব এদিক-সেদিকে। একরকম গর্জন শোনা যাচ্ছে, ঠিক যেন মেঘের ডাক।
বনহুর আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অন্ধকারে তাকে মোটেই দেখা যাচ্ছেনা।
