গভীর রাতে আফ্রিকার জঙ্গলে দস্যু বনহুর নির্ভীকচিত্তে অগ্রসর হচ্ছে। সুন্দর মুখমণ্ডলে কঠিন সংকল্পের ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বলিষ্ঠ হস্তদ্বয়ের মাংসপেশীগুলো শক্ত হয়ে উঠেছে–যে কোন হিংস্র জন্তুকে সে এই মুহূর্তে কাবু করবে তাতে কোনো ভুল নেই।
কিন্তু এতো করে সন্ধান চালিয়েও বনহুর গরিলা এবং শ্যালনের সন্ধান পেলো না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হলো সে তাবুতে ফিরে আসতে।
সমস্ত রাত্রিটা নানা রকম আলোচনায় কেটে গেলো। ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে বনহুর দলবল নিয়ে বের হলো। শ্যালনের সন্ধান তাকে করতেই হবে। বনহুর জানে সত্যিকারের গরিলা মানুষ ভক্ষণ করে না, তারা মানুষকে হত্যা করে পিষে থেতলে মেরে ফেলে। আবার কতগুলো গরিলা আছে যারা মেয়েছেলে দেখলে পুতুল মনে করে খেলার জন্য হরণ করে নিয়ে যায়, হত্যা করে না। শ্যালনকেও গরিলা পুতুল মনে করে নিয়ে গিয়ে থাকবে। নিশ্চয়ই তাহলে তাকে হত্যা করবে না সে কিছুতেই।
প্রত্যেকের হস্তেই গুলী ভরা রাইফেল। কারো কারো হস্তে রিভলভার বা পিস্তল। বনহুর রিভলভার এবং ছোরা সঙ্গে নিয়েছে।
গত রাতে যে পথে বনহুর গরিলার সন্ধানে অগ্রসর হয়েছিলো আজও তারা সে পথ ধরে অগ্রসর হলো। বেশ কিছুদূর এগুনোর পর সবাই অবাক হয়ে দেখলো–একটি মৃত সিংহীর পাশে কতগুলো সিংহ শাবক ঘুর ঘুর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ বা মায়ের বুকের দুগ্ধের সন্ধান করছে, কেউ বা দেহের উপর চড়ে মায়ের নিদ্রা ভঙ্গের চেষ্টা করছে।
বনহুর বললো স্যার, কাল রাতে বাধ্য হয়ে আমি ঐ বাচ্চাগুলোকে মা-হারা করেছি। চলুন, এখানে বিলম্ব করা উচিৎ হবেনা।
সবাই আবার চলতে শুরু করলো।
সে কি গহন বন!
প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর জন্য তারা প্রস্তুত হয়ে নিলো। কারণ চারদিকে ক্রুদ্ধ হিংস্র জন্তু যে কোনো সময়ে লাফিয়ে পড়তে পারে তাদের ঘাড়ে।
প্রফেসার ম্যাকমারার মুখে এতোদিন যে জানার উন্মাদনা পরিলক্ষিত হতো, আজ তা সমূলে অন্তর্ধান হয়েছে। কন্যার এই বিপদে ভদ্রলোক একেবারে মুষড়ে পড়েছেন। মুখখানা তার কালো হয়ে গেছে অমাবস্যার অন্ধকারের মত। একটি কথাও তার কণ্ঠ দিয়ে বের হচ্ছেনা। তিনি কাষ্ঠ-পুত্তলিকার মত দলবলকে অনুসরণ করছেন মাত্র।
বহুদূর অগ্রসর হয়েও গরিলা বা শ্যালনের সন্ধান পাওয়া গেলোনা। বেলা গড়িয়ে আসছে, ক্ষুধায় সকলের পেটে আগুন ধরে গেছে। তাবু থেকে কিছু পাউরুটী আর মাখন ওরা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলো, চলতে চলতে কেউ খেয়ে নিচ্ছিলো তারই দু’একটা।
বনহুরের ক্ষুধা তৃষ্ণা যেন উবে গিয়েছিলো, তার মনে সদা উদয় হচ্ছে গরিলা আর শ্যালন।
বড় পিপাসা বোধ করায় বনহুর ফ্লাক্স থেকে পানি ঢেলে পান করে নিলো, এবার অনেকটা শান্তি পেলো সে। ক্ষুধা সহ্য করা বনহুরের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো, কারণ সে দস্যু–তাকে সব সময় নানা ভাবে কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, খাবার সময় তার কোথায়।
সিদ্ধ জিনিসের চেয়ে ফলমূল ছিলো বনহুরের প্রিয় খাদ্য। তার আস্তানায় বনহুরের জন্য সব রকম ফল সংগ্রহ করে রাখা হতো। দেশ-বিদেশ থেকে ফল আসতো। সর্দারের খাদ্যের ফল সংগ্রহের জন্যই দূর দূর দেশে তার অনুচর ছিলো, এরা সব সময় বিদেশ থেকে ফল আমদানি করতো।
বনহুর আফ্রিকার জঙ্গলের ফল খেয়ে তৃপ্তি লাভ করতো। ক্ষুধা পেলেই নানা রকম ফল পেড়ে খেতো সে। ছোট বেলা হতে এটা ছিলো বনহুরের অভ্যাস।
আজ বনহুর ফল ভক্ষণের নেশাও ত্যাগ করেছে।
ফ্লাক্স থেকে পানি পান করে ফিরে দাঁড়াতেই বনহুরের দৃষ্টি চলে গেলো একটা গাছের পাশে, একখানা লেডিস্ সু’পড়ে আছে। বনহুর দ্রুত গিয়ে লেডিস্ সুখানা হাতে তুলে নিলো।
ততক্ষণে দলবল সবাই এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশে।
ম্যাকমারা কাঁদো কাঁদো গলায় বললো–এ যেন আমার শ্যালনের জুতা। হায়! হায়! মাকে আমার হত্যা করে ফেলেছে গরিলাটা–
বনহুর সান্ত্বনা বাক্যে বললো-স্যার, আপনি বিচলিত হবেন না। শ্যালন নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। আপনি বরং কয়েকজনকে নিয়ে তাবুতে ফিরে যান। আমি এদের নিয়ে আপনার শ্যালনের সন্ধান করে দেখছি।
অন্যান্য সবাই বনহুরের কথায় সায় দিলো, কয়েকজন রাজি হলো বনহুরের সঙ্গে শ্যালনের সন্ধানে যেতে।
অগত্যা প্রফেসার ম্যাকমারা কয়েকজনকে নিয়ে ফিরে চললেন তাবুতে।
বনহুর অগ্রসর হলো সামনের দিকে।
বনহুর মাত্র পাঁচজন বলিষ্ঠ ব্যক্তিকে বেছে নিয়েছিলো তাকে সাহায্যের জন্য।
বেলা যখন শেষ প্রহর তখন বনহুর সঙ্গীদের নিয়ে উপস্থিত হলো এক পাহাড়ের মত উঁচু ঢিবির পাশে। সেই স্থানটা আরও ঘন বনে আচ্ছাদিত। বিরাট বিরাট শাল আর সেগুন গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আরও কত রকম অজানা গাছের সমারোহ।
উঁচু পাহাড়ের মত ঢিবিটার আশে পাশে বহু জলাভূমি নজরে পড়লো। হঠাৎ বনহুর চমকে উঠলো–জলাভূমির নিকটে ভিজে মাটিতে কয়েকটি পায়ের ছাপ স্পষ্ট ফুটে রয়েছে, সেই ভয়ঙ্কর গরিলা মহারাজের পদচিহ্ন বলেই মনে হলো–তবে অন্য কোনো গরিলাও হতে পারে। তবু বনহুরের হৃদয়ে। একটা আশার আলো উঁকি দিয়ে গেলো।
বনহুর তার পঞ্চসাথীকে লক্ষ্য করে বললো–এ পদচিহ্ন অনুসরণ করে আমরা অগ্রসর হবো।
বিলম্ব না করে ওরা উঁচু ঢিবি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। বিরাট পদচিহ্ন ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। বনহুরের সঙ্গীগণ কিছুটা ভীত আশঙ্কিত হয়ে পড়েছে বলে মনে হলো।
