বৃদ্ধের আর্তকণ্ঠে বনহুরের মন ভেঙে পড়ছিলো, রাতের অন্ধকার না হলে বনহুর এতোক্ষণ ছুটে। যেতো ঐ গরিলা রাজের পিছু পিছু, কিন্তু এখন সে উপায়হীন, এতোটুকু আলো নেই কোথাও, তাছাড়া এটা যা-তা বন নয় আফ্রিকার জঙ্গল। বনহুর জীবনের মায়া করেনা, কিন্তু গরিলার কবল থেকে। শ্যালনকে রাতের অন্ধকারে গহন বনে উদ্ধার করে নিয়ে আসা কিছুতেই সম্ভব নয়।
কিন্তু ম্যাকমারার ব্যাকুলতা বনহুরকে আরও উদ্ভ্রান্ত করে তুললো।
আলম, আমার মাকে রক্ষা করো। রক্ষা করো আলম। আমি শ্যালনকে হারিয়ে বাঁচতে পারবোনা। আমার শ্যালন মা শ্যালন–
বনহুর আর স্থির থাকতে সক্ষম হলোনা, একটা ফুল পাওয়ার টর্চ ও গুলী ভরা রিভলভার নিয়ে তাবু থেকে বেরিয়ে পড়লো।
অন্যান্য সবাই হায় হায় করে উঠলো।
প্রফেসার ম্যাকমারা নিজেও ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বনহুর অন্যান্যদের লক্ষ্য করে বললো স্যারকে ধরে রাখুন, আমি চেষ্টা করে দেখি কিছু করতে সক্ষম হই কিনা। বনহুর বেরিয়ে গেলো। ম্যাকমারাকে ধরে ফেললো অন্যান্য ছাত্রগণ।
বনহুর টর্চের আলো ফেলে ছুটতে শুরু করলো। গরিলাটি শ্যালনকে নিয়ে এত দ্রুত সরে পড়েছে। যে বনহুর ছুটেও তার সন্ধান করতে পারলো না। টর্চের আলোতে সে দেখতে পেলো এক পাশের ঝোপ ঝাড় আর জঙ্গল থেতলে গুঁড়িয়ে কোনো বন্য হস্তী যেন চলে গেছে।
বনহুর সেই পথে অগ্রসর হলো।
একটু পূর্বে গরিলা-রাজ ঐ পথে গেছে বলে অন্যান্য হিংস্র জীব-জন্তু সব সরে পড়েছিলো এবং সে কারণে এখন পর্যন্ত বনহুর সম্মুখে তেমন কোনো জন্তু দেখতে পেলো না।
গাঢ় অন্ধকারে টর্চের আলো ফেলে চারদিকে ভালভাবে লক্ষ্য করে বনহুর এগুতে লাগলো। দুঃসাহসী প্রাণ দস্যু বনহুর এতোটুকু ভরকে গেলো না বা তার হৃদয় কম্পিত হলো না। যেমন করে হোক বাঁচাতে হবে শ্যালনকে। এতো বিপদেও শ্যালনের একটি কথা বার বার মনে পড়ছে–আলম, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না– শ্যালন ভালবেসেছিলো বনহুরকে, মাত্র ক’দিনের পরিচয়েই সে এতো আপন করে নিয়েছিলো, যা বনহুরের প্রাণেও রেখাপাত করেছিলো।
সবচেয়ে বনহুরের বেশি ভাল লেগেছিলো শ্যালনের সরলতা, সহজ মনোভাব। বনহুরের সঙ্গে মিশতে সে এতোটুকু দ্বিধা বোধ করতো না বা সঙ্কোচিত হতো না। উচ্ছল মনোভাব নিয়ে সে নিজেকে বিলিয়ে দিতো বনহুরের মধ্যে।
আজ এই ভয়ঙ্কর বিপদসংকুল মুহূর্তে শ্যালনের মায়াময় মুখখানা গভীরভাবে আকর্ষণ করছে। বনহুরকে। বনহুর ভুলে গেছে তার চারদিকে হিংস্র জীব-জন্তুর অস্তিত্ব, ভুলে গেছে নিজের জীবনের মায়া। শ্যালনকে তার রক্ষা করতেই হবে। মৃত্যুভয়ে ভীত নয় সে, নির্ভীক সাহসী মন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সে প্রফেসার ম্যাকমারার কন্যা উদ্ধারে।
বনহুরের ভয় হচ্ছে, গরিলা মহারাজ শ্যালনকে তো হত্যা করে ফেলেনি! শ্যালনকে যদি নিহত করে থাকে, একটি সুন্দর ফুলের মত জীবন অকালে ঝরে পড়বে এই গহন জঙ্গলে, ইস কি ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক সে পরিণতি–
হঠাৎ বনহুর চমকে উঠে, তার সম্মুখে কিছুটা দূরে সাদা কিছু দেখা যায়। দ্রুত টর্চের আলো ফেলে সেদিকে এগিয়ে যায় বনহুর। সাদা জিনিসটার নিকটে পৌঁছে দেখতে পায় সেটা শ্যালনের ওড়না।
বনহুর ওড়নাখানা হাতে নিয়ে দেখে, বুঝতে পারে এ দিকেই চলে গেছে গরিলাটা শ্যালনকে নিয়ে। বনহুর বন-জঙ্গল ভেদ করে অগ্রসর হলো সম্মুখের দিকে।
কিছুটা এগুতেই ঝোপের মধ্যে প্রায় মাটির সঙ্গে লাগানো দুটো বাল্বের মত জ্বলন্ত গোলক তার চোখে পড়লো। বনহুর টর্চের আলো ফেলতেই শিউরে উঠলো, ভয়ঙ্কর একটি অজগর সাপ পথ রোধ করে মাটিতে পড়ে আছে। বাল্বের মত অগ্নি গোলক দুটি অজগরের চোখ। সাপের চোখ যে অন্ধকারে এতো তীব্র আলোর মত মনে হয় বনহুর এর আগে এমন করে দেখেনি।
সর্পরাজ বনহুরকে দেখে গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে আসতে লাগলো, মাঝে মাঝে তার মুখের মধ্যে থেকে জিক্টা লিক্ লিক্ করে বেরিয়ে আসছে, সে কি তীক্ষ্ণ ছোরার মত লম্বা জিভ!
বনহুর বিলম্ব করতে পারে না।
সর্প রাজের দেহটা বেশ কিছুটা জায়গা নিয়ে বিস্তার করছিলো। শীঘ্র সরে যাবার কোনো লক্ষণ নেই, বনহুর সর্পরাজের দেহের উপর দিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে গেল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আর একটা বিপদ ওৎপেতে ছিলো তার জন্য। একটি সিংহী তার শাবক নিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলো, কোনো শিকারের সন্ধানেই বুঝি বেরিয়েছে সিংহীরাণী। বনহুরের উপর নজর পড়তেই গর্জন করে উঠলো। সে কি ভয়ঙ্কর শব্দ! গোটা বনভূমি যেন প্রকম্পিত হয়ে উঠলো।
থমকে দাঁড়ালো বনহুর। দক্ষিণ হস্তে উদ্যত রিভলভার।
সিংহীরাণী সম্মুখে লোভাতুর শিকার দেখে খুশি হয়েছে বলে মনে হলো। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে আবার গর্জন করে উঠলো। এবার সে আক্রমণ করে বসবে বনহুরকে। বনহুর বিলম্ব না করে সিংহীকে লক্ষ্য করে গুলী ছুড়লো। মাত্র একটি গুলী–সিংহীর মাথাটা ফুটো করে গুলীটা বেরিয়ে গেলো ঘাড়ের পাশ দিয়ে। একটু নড়তে পারলো না, মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো তার বাচ্চাগুলোর পাশে।
বনহুরের মায়া হলো, এতোগুলো বাচ্চাকে সে মা-হারা করলো। কিন্তু উপায় ছিলো না। আবার চললো সম্মুখ পানে।
তাদের তাবু ছেড়ে অনেক দূর চলে এসেছে বনহুর। এতোক্ষণ তাবুর সম্মুখের অগ্নিকুণ্ডটা তবু দৃষ্টিগোচর হচ্ছিলো। এখন তাও সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়েছে।
