এরপর তাবুর বাইরে বের হওয়া কারো সম্ভব নয়।
রাতে জেগে জেগেই প্রায় সময় কাটিয়ে দেয় সবাই। ঘুম কম, জেগে থাকাই বেশি। তবু একদল ঘুমায় আর একদল জেগে থাকে।
শেষ রাতের দিকে বনহুর ঘুমিয়ে পড়েছে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। তাবুর বাইরে মেঘ গর্জনের মত হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে। সে হুঙ্কারের শব্দে মাটি যেন থর থর করে কেঁপে উঠছে।
বনহুর উঠে বসলো তার বিছানায়, দক্ষিণ হস্তে চেপে ধরলো তার রিভলভারখানা। সে বুঝতে পারলো কোন ভয়ঙ্কর জীবের গর্জন এটা। ব্যাঘ্র বা সিংহের হুঙ্কার নয়। এ শব্দটা সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। তাবুর সকলেই জেগে উঠেছে। এমনকি শ্যালন পর্যন্ত জেগে তার পিতার পাশে বসে থর থর করে। কাঁপছে।
প্রফেসার ম্যাকমারা চাপা কণ্ঠে বনহুরকে তাঁর পাশে ডেকে নিলেন, তারপর বললেন– এটা কিসের আওয়াজ বলে তোমার মনে হয়?
বনহুর একটু ভালভাবে শুনে নিয়ে বললো- স্যার, এটা বাঘ-ভলুক বা সিংহের কণ্ঠের আওয়াজ নয়, নতুন কোন জীব। জীবটা যে অতি ভয়ঙ্কর তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বনহুর ও প্রফেসার ম্যাকমারার অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে তাকে স্যার বলেই সম্বোধন করতো।
বনহুরের কথায় বললো মিস শ্যালন– আমার বড় ভয় করছে আলম, তুমি আমার পাশে এসো।
ম্যাকমারা বলে উঠলেন– কোনো ভয় নেই মা, আমাদের তাবু অত্যন্ত মজবুত ভাবে তৈরি। কোনো রকম জীব-জন্তু এ তাবুর মধ্যে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না, কিন্তু জীবটার ফটো নেবো আমি
ম্যাকমারার কথা শেষ হয় না, তাবুর এক ধারের পর্দা নড়ে উঠে ভীষণভাবে, সঙ্গে সঙ্গে ছিঁড়ে যায়। তাবুক খানিকটা অংশ। একখানা লোমশবাহু প্রবেশ করে তাবুর ছেঁড়া অংশ দিয়ে।
মিস শ্যালন বাহুটার দিকে তাকিয়ে তীব্র চিৎকার করে ঢলে পড়ে শয্যায় উপরে।
প্রফেসার ম্যাকমারা ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত হতে যাচ্ছিলেন, কন্যাকে ঢলে পড়তে দেখে তিনি ক্যামেরা রেখে ছুটে এলেন- মা শ্যালন! মা শ্যালন–
লোমশ বাহুটা তখন তাবুর মধ্যে চক্রাকারে ঘুরে ফিরছে।
স্যার ম্যাকমারা আর বনহুর ছাড়া সবাই ভীত ভাবে আর্তনাদ শুরু করে দিয়েছে। তাবুর মধ্যে সবাই ছুটোছুটি করে এ ওর গায়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ছে। লোমশ বাহুটা লক্ষ্য করে বনহুর গুলী ছুড়লো।
সঙ্গে সঙ্গে হাতখানা অদৃশ্য হলো তাবুর বাইরে।
বনহুর ব্যস্তকণ্ঠে সবাইকে বললো–আপনারা তাবুর দক্ষিণ দিকে চলে আসুন, চলে আসুন শীগগীর–
উঠি-পড়ি করে সবাই তাবুর ভাল অংশে চলে এলো, কিন্তু সকলেরই চোখে মুখে ভীত-কম্পিত ভাব। প্রায় অনেকেই আর্তনাদ শুরু করে দিয়েছে। বনহুরের পিছনে সবাই এসে জড়ো হলো, কেউ কেউ সাহস করে রাইফেল বাগিয়ে দাঁড়ালো বনহুরের পাশে। প্রফেসার ম্যাকমারা ক্যামেরা ও কন্যাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, তিনি কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
বাইরে গর্জনটা এবার আরও ভয়ংঙ্কর মনে হলো। জীবটা তার আহত হাতখানা নিয়ে বুঝি যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়েছে। কিন্তু পর মুহূর্তেই সম্পূর্ণ তাবুটা দুলে উঠলো। বাইরে যেন ভীষণ ঝড় শুরু হয়েছে।
বনহুর রিভলভার উদ্যত করে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য সবাইকে বললো তাদের নিজ নিজ অস্ত্র নিয়ে তৈরি থাকতে।
আশ্চর্য! আবার একখানা হাত বেরিয়ে এলো পূর্বের সেই ছেঁড়া অংশ দিয়ে। বনহুর অবাক হয়ে দেখলো এটা সেই হাত, যে হাতে বনহুর একটু পূর্বে গুলী বিদ্ধ করেছিলো। লোমশ বাহু দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরছে। হাতখানা এবার দ্রুত কিছু অন্বেষণ করে ফিরছে বলে মনে হলো।
*
তাবুর মধ্যে আবার একটা আর্ত চিৎকার জেগে উঠলো, গুলী ছোঁড়া তো দূরের কথা, সবাই নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য এ-ওর গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগলো।
বনহুর পর পর গুলী ছুঁড়তে লাগলো।
দক্ষিণ হাতখানা বুঝি এবার অকেজো হলে গেলো জীবটার, তাই সে গর্জন করে বাম হস্ত প্রবেশ করিয়ে দিলো তাবুর মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিলো মিস শ্যালনের সংজ্ঞাহীন দেহটা। পরক্ষণেই তাবুর ফাঁকে ভেসে উঠলো একখানা বিশাল মুখ।
বনহুর এবং অন্যান্য সবাই দেখলো একটা বিরাট আকার রাক্ষসের মুখ। বুঝতে বাকি রইলো না, জীবটা অন্য কিছু নয় গরিলা।
বনহুর এবার গুলী ছুঁড়তে পারলো না চট করে, কারণ গরিলা মহারাজের হাতের মধ্যে মিস শ্যালনের সংজ্ঞাহীন দেহটা রয়েছে। অন্য কাউকে না নিয়ে মিস শ্যালনকে নেবার মতলব দেখে বনহুরের চক্ষুস্থির হলো। ততক্ষণে গরিলা মহারাজ বিরাট পা ফেলে হুম্ হুম্ আওয়াজ তুলে গহন বনে। অদৃশ্য হয়েছে।
প্রফেসার ম্যাকমারার আর্তনাদে তাবুর অভ্যন্তর ভরে উঠলো, বাঁচাও! বাঁচাও! আমার কন্যাকে তোমরা বাঁচাও–
শুচিভেদ্য অন্ধকারে কিছু আর দৃষ্টিগোচর হলোনা। শুধু শোনা গেলো পাশের জঙ্গলের মধ্যে। মড়মড় শব্দে ডালপালা ভেঙে পড়ার শব্দ।
বনহুর কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারলোনা, একটা অব্যক্ত বেদনা তার অন্তরটাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেললো। শ্যালনের সরল সহজ মুখখানা তার মানস পটে ভেসে উঠতে লাগলো স্পষ্ট হয়ে। গরিলা মহারাজ তখন চলে গেছে অনেক দূর। বনহুর পাথরের মূর্তির মত থ’হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রফেসার ম্যাকমারা বনহুরের দক্ষিণ হাতখানা চেপে ধরে করুণ কণ্ঠে বলে উঠলেন–আলম, তুমি একবার আমার শ্যালন মাকে রক্ষা করেছিলে, এবার কেনো তুমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছো? যাও, যাও আলম আমার মাকে রক্ষা করে নিয়ে এসো।
