ম্যাকমারা যখন ক্যামেরা চালান তখন নানা রকম হিংস্র জীবজন্তুর আক্রমণ হবার সম্ভাবনা থাকে, কোনো কোনোদিন ব্যাঘ্র হামলা করে বসে, কোনোদিন বা দাঁতওয়ালা বন্য শূকর। কোনোদিন তার চেয়েও কোনো ভয়ঙ্কর জীব হানা দেয়। পাহারাদারগণ সামলে উঠতে পারেনা, বনহুর এ কদিনে অনেকগুলো হিংস্র জীব হত্যা করেছে। বনহুরের অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ। শুধু ম্যাকমারাই নয় সবাই স্তম্ভিত হতবাক হয়ে যেতো, মিস শ্যালন তো এক মুহূর্তে বনহুরকে ছেড়ে থাকতে পারতোনা।
বনহুর নানা কাজে ব্যস্ত থাকলেও শ্যালন সব সময় তার পাশে ছায়ার মত লেগে থাকতো। ওকে ছেড়ে থাকতে নাকি ওর মোটেই ভাল লাগেনা।
আফ্রিকার জঙ্গলে, মৃত্যু ভয়ঙ্কর মুহূর্তে শ্যালনের মত একটি শ্বেতাঙ্গিনী যুবতীকে পাশে পেয়ে বনহুর বিব্রত হয়নি বরং সে খুশিই হয়েছে। শ্যালনের সরল-সহজভাব বনহুরকে মুগ্ধ করেছে।
শ্যালনের মধ্যে ছিলোনা কোনো সঙ্কোচ বা দ্বিধা। সে এমন ভাবে বনহুরের সঙ্গে মিশতো, যা সভ্যসমাজের যে কোনো লোকের চোখে অশোভনীয়।
বনহুর এখন সম্পূর্ণ প্রফেসার ম্যাকমারার লোক বনে গেছে। ম্যাকমারা যখন তখন বনহুরকে নিয়েই তার কঠিন আলাপ-আলোচনা করতে শুরু করলেন অবশ্য তার অন্যান্য ছাত্রগণও তখন সঙ্গে থাকতো।
বনহুর সেদিন তাবুর বাইরে বসে রাইফেলটা পরিষ্কার করছিলো, এমন সময় মিস শ্যালন এসে বসলো তার পাশে। বনহুরের কাঁধে মাথা রেখে বললো– মোটেই ভাল লাগছে না আলম।
বনহুর যেমন রাইফেলটা পরিষ্কার করছিলো তেমনি করতে করতে বলে- হঠাৎ ভাল না লাগার কারণ?
তুমি চলে এলে আমাকে তাবুতে একা ফেলে, তাই।
এই সামান্য কারণে তুমি—
আলম, তোমাকে ছেড়ে আমি এক মুহূর্ত বাঁচবোনা। শ্যালন বনহুরের কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরে।
বনহুর তাকালো এদিক-সেদিকে; কেউ দেখে ফেললো নাকি!
শ্যালন তখন বনহুরের গণ্ডে চুম্বন দিতে শুরু করেছে। অদ্ভুত এ মেয়েটির কবল থেকে বনহুর নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেনা। ওর কোঁকড়ানো রাশিকৃত চুলে বনহুরের মুখমণ্ডল ঢাকা পড়ে যায়।
বনহুর বলে–ছিঃ, শ্যালন, একি হচ্ছে?
কেন তোমার ভাল লাগছেনা?
বনহুর কোনো জবাব দিতে পারেনা।
শ্যালন পুনরায় বলে– আলম, তুমি বড় সেকেলে। তোমার মধ্যে কোনো আনন্দ নেই। বেরসিক তুমি। খিলখিল করে হেসে উঠে মিস শ্যালন।
বনহুর শ্যালনকে তুমি বলে ডাকতো, শ্যালনও ওকে তুমি বলে সম্বোধন করতো। শ্যালনের যেমন প্রথম থেকেই বনহুরকে ভাল লেগেছিলো, তেমনি বনহুরেরও ভাল লেগেছিলো ওকে– তাই বলে বনহুর ওকে তো গ্রহণ করতে পারেনা। শ্যালনের সান্নিধ্য ভাল লাগতো এই যা।
গহন জঙ্গলে শ্যালন এক নতুন উন্মাদনা জোগালো বনহুরের হৃদয়ে। চঞ্চল হরিণীর মতই ছিলো শ্যালন। সব সময় বন্দুক নিয়ে ছুটতো এদিক-সেদিকে। আবার ভয়ও পেতো, সেদিনের ঘটনার পর; একা যাওয়া তার হোতনা। যখনই সে বন্দুক হাতে শিকার করতে বের হতো তখন বনহুরকে সে কিছুতেই ছাড়তোনা। ওকে টেনে-হিঁচড়ে তবুও সঙ্গে নিতো।
বনহুরের নিঃসঙ্গ জীবন উজ্জ্বল হয়ে উঠতো, শ্যালনের সঙ্গ তাকে মোগ্রস্ত করে ফেলতো। বনহুরের জীবনে বহু নারী এসেছে, কিন্তু বনহুর কাউকে অন্তর দিয়ে গ্রহণ করতে পারেনি একমাত্র মনিরা আর নূরীকে ছাড়া। এ দুটি নারীকেই বনহুর গ্রহণ করেছে অন্তর দিয়ে, উজাড় করে দিয়েছে সে সমস্ত সত্ত্বা। শ্যালনকে বনহুরের ভাল লাগে, কিন্তু ভালবাসতে পারে না সে।
শ্যালন যখন তার সুকোমল শুভ্র বাহু দুটি দিয়ে বনহুরের কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরে তখন সে হারিয়ে ফেলে নিজেকে, তার মধ্যে জেগে উঠে পৌরুষত্ব মনোভাব, কিন্তু সাবধানে সে নিজেকে সংযত রাখে। সে পুরুষ কিন্তু ব্যাভিচারী নয়।
শ্যালন বলে– আলম, আমি তোমাকে কত ভালবাসি আর তুমি আমাকে একটুও ভালবাসো না।
কে বলে আমি তোমাকে ভালবাসি না?
সত্যি তুমি আমাকে ভালবাসো?
হাঁ শ্যালন।
তবে তুমি আমাকে ধরা দাও না কেনো?
সব সময় তো তোমার কাছে রয়েছি। তুমি আমাকে এক রকমই ধরেই রেখেছ সর্বক্ষণ।
আলম!
বলো?
দেশে ফিরেই আমাদের বিয়ে হবে।
আনমনা হয়ে যায় বনহুর।
শ্যালন ওকে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরে বলে– আলম, তুমি কথা বলছো না কেনো?
উ।
আলম, বলো রাজি আছো আমাকে বিয়ে করতে?
বনহুর কি জবাব দেবে ভেবে পায় না।
শ্যালন করুণ কণ্ঠে বলে তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না আলম, আমি মরে যাবো–
বনহুরের চোখের সম্মুখে ভেসে উঠে একটি মুখ, সেও বলেছিলো– হুর, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবোনা হুর– একটা দীর্ঘশ্বাস বনহুরের বুক চিরে বেরিয়ে আসে।
শ্যালন ব্যথিত নয়নে তাকিয়ে থাকে, অসহায় করুণ সে আঁখি দুটি। এক রাশ ঝকড়া সোনালী চুলের ফাঁকে তীব্র ঘোলাটে দুটি চোখ।
বড় মায়া হয় বনহুরের, মিথ্যা বলতে দোষ কি। জীবনে সে লোকের মঙ্গলের জন্য বহু মিথ্যা বলেছে, আজও না হয় শ্যালনকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিলো– ক্ষতি কি তাতে। কিন্তু একটা অবলা নির্বোধ মেয়েকে এতোবড় মিথ্যা আশ্বাস সে চট করে দিতে পারলো না। বনহুর ওকে টেনে নিলো নিবিড় করে।
শ্যালন ভুলে গেলো বিয়ের কথাটা।
বনহুরের বাহু-বন্ধন থেকে শ্যালন যখন মুক্তি পেলো তখন তার শ্বেত গণ্ডদ্বয় রাঙা হয়ে উঠেছে।
শ্যালনের চোখে-মুখে খুশির উৎস।
*
তাবুর বাইরে অগ্নিকুণ্ড দপ দপ করে জ্বলছে। কয়েকজন পাহারাদার রাইফেল কাঁধে সতর্কভাবে পাহারা দিচ্ছে তাবুর বাইরে নয় ভিতরে। এ জঙ্গলে রাতে বাইরে থাকা কিছুতেই নিরাপদ নয়। একজন পাহারাদার বাঘের কবলে প্রাণ হারিয়েছে কদিন আগে রাতে বাইরে বেরিয়েছিলো পায়খানা করতে।
