আজও তিনি দূরে এক টিলার আড়ালে আত্মগোপন করে ঐ গরিলা জাতীয় জীবটার ছবি নিচ্ছিলেন। ক্যামেরার সাহায্যে। হঠাৎ গরিলাটা তাদের তাবুর দিকে ছুটে আসে এবং দ্রুত হস্তে ধরে ফেলে মিস শ্যালনকে। শ্যালনকে ধরবার সঙ্গে সঙ্গে গরিলা জাতীয় জীবটা গর্জন করতে করতে ছুটে পালায় গহন বনের দিকে। অতি দ্রুত গতিতে জীবটা তাদের চোখের আড়ালে চলে যায়, কাজেই দল-বল সহজে জীবটা ও শ্যালনকে খুঁজে পায় না। ওরা গুলী করার অনেক চেষ্টাও করেছে কিন্তু সফলকাম হয়নি। বন বাদার ভেঙে অগ্রসর হতে গিয়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছিলো প্রফেসার ম্যাকমারার দলবল।
বনহুর হঠাৎ শ্যালনের চিৎকার শুনতে পেয়ে ওকে উদ্ধারের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো তাই রক্ষা। জীবটাকে হত্যা করার পর প্রফেসার ম্যাকমারা ও তার দল-বল গিয়ে পৌঁছেছিলো সেখানে।
প্রফেসারের দল বনহুরকে দেবতার মত ভক্তি-শ্রদ্ধা করতে শুরু করলো। সবাই মিলে বনহুরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলো। প্রফেসার নিজে শ্যালনকে বনহুরের সেবায় নিয়োজিত করে দিলো।
বনহুর বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছিলো, সে কারো সেবা গ্রহণে ইচ্ছুক নয়, হেসে ধন্যবাদ জানালো সবাইকে।
ম্যাকমারা বনহুরের পরিচয় জানতে চাইলেন– আপনার পরিচয় যদি জানান তবে আরও খুশি হবো।
বনহুর বললো– জাহাজডুবি হয়ে আমি এ জঙ্গলে এসে পড়েছি। প্রথমে তীরে এসে উঠি, তারপর এই গহন বনে। আজ প্রায় এক সপ্তাহ হতে চললো আমাদের জাহাজডুবি হয়েছে। আমার নাম আলম। আমাদের নিজস্ব মালবাহী জাহাজে আমি জম্বুর বন্দরে যাচ্ছিলাম।
প্রফেসার ম্যাকমারা খুশি হলেন, আপনি আমার কন্যার জীবন রক্ষা করেছেন, আপনি এখন থেকে আমাদেরই একজন।
যাক বনহুর এই ভয়ঙ্কর জঙ্গলে তবু সঙ্গী-সাথী পেলো। প্রফেসার ম্যাকমারা বনহুরকে অত্যন্ত স্নেহ করতে লাগলেন। তিনি জাতিতে ক্রীশ্চান, তবু তার চালচলন ছিলো ঠিক বাঙালিদের মত। বনহুরের ব্যবহারে তিনি মুগ্ধ হলেন।
বনহুরও প্রফেসার ম্যাকেমারার একজন অনুগত ছাত্রের মতই হয়ে পড়লো। প্রফেসার নিজে তাকে তার ব্যবহারী দ্রব্যাদি বের করে দিলেন। অনেক কয়টা দিন পর বনহুর পেট পুরে খেলো, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি জন্মেছিলো, শেভ করে ফেললো। বনহুরের যে রূপ ঢাকা পড়ে গিয়েছিলো আবার তা আত্মপ্রকাশ পেলো।
বনহুরের সুন্দর চেহারা দেখে সবাই মুগ্ধ বিস্মিত হলো। প্রফেসার দুহিতা শ্যালন আরও বেশি বিমুগ্ধ হলো, বনহুরকে ওর ভাল লেগেছে প্রথম থেকেই, সোজা সে বাবাকে বললো মিঃ আলমকে আমি বিয়ে করবো, বাবা।
কথাটা অতি স্বাভাবিক সচ্ছ ভাবেই বলেছিলো শ্যালন, কারণ তাদের মধ্যে বিয়েটা তেমন কোন লজ্জাকর ব্যাপার নয়। যাকে যার পছন্দ হবে তাকেই সে গ্রহণ করতে পারবে। কাজেই শ্যালনের কথায়। যদিও বনহুর হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো প্রথমে, পরক্ষণেই সামলে নিয়েছিলো নিজকে। ভয়ঙ্কর গহনে বনে, মৃত্যুর মুখোমুখি বসে এমন একটা উক্তি তার কঠিন মনকে উজ্জ্বল করে তুলেছিলো, হেসেছিলো আপন মনে।
বনহুর আরও জানতে পারলো ম্যাকমারার একজন বিশিষ্ট ছাত্র ইতিমধ্যে বন্যশূকরের কবলে প্রাণ হারিয়েছে। একজন কোনো এক গণ্ডারের ছবি তোলাকালে ভীষণ আহত হয়েছিলো এখন সে সুস্থ হয়েছে।
জঙ্গলের এ জায়গাটা প্রফেসার ম্যাকমারার কাছে বেশ পছন্দনীয় মনে হওয়ায় এখানেই ক’দিন কাটিয়ে আরও কিছু ফটো সংগ্রহ করবেন বলে মনস্থির করে নিয়েছেন।
জায়গাটা জঙ্গলে পরিপূর্ণ হলেও বেশ হাল্কা। মাঝখানে খানিকটা জলাভূমি, ঠিক একটা হদের মত। আশেপাশে সমতলভূমি, ফাঁকা ফাঁকা গাছপালা। সূর্যের আলো প্রবেশে এখানে তেমন কোন। অসুবিধা নেই। আফ্রিকার জঙ্গল হলেও জায়গাটা মনোরম। এক জায়গায় ক্যামেরা রেখে দূরদূরান্তের ফটো তুলে নেওয়া যায়।
বনহুর অবাক হয়ে এ সব ফটো তোলা লক্ষ্য করতে লাগলো। বহুদূরের বস্তুও এসব ক্যামেরার সাহায্যে একেবারে নিকটে এসে পড়ে হয়তো বা কোনো ব্যাঘ্র তার বাচ্চাদের নিয়ে অনেক দূরে বসে বসে খেলা করছে, প্রফেসার ম্যাকমারার ক্যামেরার দ্বারা তার বাচ্চাকাচ্চাসহ ফটো তুলে নিলো। হয়তো বা একদল হরিণ অনেক দূরে ছুটে পালাচ্ছে বা কোন ঝরণায় পানি পান করছে, ক্যামেরায় তার ছবি স্পষ্ট ধরে নেয়া হলো। ভয়ঙ্কর জীবজন্তু যেগুলোর নিকটে যাওয়া সম্ভব নয়, সে সব জীবের ফটোও অতিসহজে উঠিয়ে নিচ্ছিলেন ম্যাকমারা।
এসব ক্যামেরা চালাতে বেশ কিছু লোকের প্রয়োজন হচ্ছিলো। ম্যাকমারার ছাত্রগণ হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিলো তাকে সাহায্য করতে। কারণ কখনও ক্যামেরাটাকে উঁচুতে তুলে নিয়ে নিচের ছবি নেওয়া হচ্ছিলো, কখনও বা নিচ থেকে উপরের ছবি। হয়তো বা কোনো বৃক্ষের শাখায় বিরাট একটি অজগর সাপ ভীমরাজের মত বিশ্রাম করছে ম্যাকমারা তার ফটো নেবেন। কোনো গাছের ডগায় বসে আছে। অজানা কোনো অদ্ভুত পাখি। ম্যাকমারা তার ফটোও উঠিয়ে নিতে ছাড়বেন না। এসব ছবি বা ফটো সংগ্রহ করতে তাঁকে ভীষণ পরিশ্রম করতে হচ্ছিলো, তবু বৃদ্ধের চোখেমুখে এতোটুকু ক্লান্তির ছাপ নেই। প্রফেসার ম্যাকমারা অবিরাম খেটে চলেছেন।
বনহুর নিশ্চুপ থাকতে পারেনা, সেও যোগ দেয় ম্যাকমারার ছাত্রদের সঙ্গে সাহায্য করতে।
খুশি হন ম্যাকমারা।
বিশেষ করে বনহুরের ব্যবহার এবং কার্যকলাপ তাকে মুগ্ধ করেছিলো। বনহুরকে তিনি সবার চেয়ে বেশি ভালবেসে ফেললেন, এতে ম্যাকমারার কয়েকজন ছাত্রের মধ্যে ঈর্ষা দেখা দিলো।
