এখন বনহুর তাদের সন্ধানে আগ্রহান্বিত হয়ে উঠলো। শত্রু হোক আর মিত্র হোক, সেই সভ্য সমাজী মানুষদের সঙ্গে তাকে পরিচয় করে নিতে হবে
বনহুরের চিন্তাধারায় বাধা পড়লো, তার দৃষ্টি চলে গেলো ও- পাশে কয়েকটা কমলালেবুর খোসার পাশে ছোট্ট একটা রুমাল পড়ে আছে। বনহুর সরে এসে রুমালখানা তুলে নিলো হাতে। লেডিস রুমাল, রুমালের এক কোণে ইংলিসে লিখা আছে “শ্যালন”, তাহলে কি দলটায় নারীও আছে? তাই হবে, নাহলে এ লেডিস রুমাল আসবে কি করে। পকেটে রাখলো রুমালখানা। বনহুর সমস্ত দিন জঙ্গলে ঘুরে বেড়ালো। কতগুলো হিংস্র জন্তুর আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে হলো। প্রতি মুহূর্তে তাকে সজাগ হয়ে চলতে হচ্ছিলো। বেলা শেষ হয়ে আসছে, বনের মধ্যে ক্রমেই অন্ধকার নেমে আসছে বনহুর তবু অগ্রসর হচ্ছে।
হঠাৎ একটা নারীকণ্ঠের আর্তচিৎকার তার কানে এসে পৌঁছতেই সজাগ হয়ে উঠলো। বনের মধ্য থেকেই আর্তনাদটা আসছে, বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে ছুটে চললো। খানিকটা অগ্রসর হতেই সে দেখতে পেলো একটি গরিলা জাতীয় জীব একটি যুবতীকে ধরে ফেলেছে। যুবতীর দেহে শিকারীর ড্রেস, মাথায় ব করা ছোট চুল, পায়ে বুট, হাতের মুঠায় তখনও ধরা রয়েছে একটা বন্দুক।
বনহুর কিছুমাত্র সময় নষ্ট না করে জীবটিকে লক্ষ্য করে তার রিভলভার উঁচু করে ধরলো, কিন্তু যুবতীটি এখন ঐ ভয়ঙ্কর গরিলা জাতীয় জীবটার বাহুর মধ্যে আবদ্ধা।
জীবটা বনহুরকে দেখতে পেয়ে বিরাট বিরাট তীক্ষ্ম দাঁতগুলো বের করে অদ্ভুত শব্দ করলো।
বনহুর বুঝতে পারলো, এটা এক ধরনের ভয়ঙ্কর গরিলা জাতীয় জীব। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েটিকে সে হত্যা করে ফেলবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সেকি ভয়ঙ্কর চেহারা জীবটির, মাঝে মাঝে হুঙ্কার ছাড়ছে।
বনহুর আর বিলম্ব করতে পারে না, গরিলা জাতীয় জীবটার পা লক্ষ্য করে গুলী ছুড়লো।
সঙ্গে সঙ্গে একটা উৎকট শব্দ করে মাটিতে পড়ে গেলো জীবটা। কিন্তু তার হাতের মুঠায় তখনও ধরা রয়েছে যুবতীটি।
বনহুর এবার তার ছোরাখানা মুক্ত করে নিয়ে লাফিয়ে পড়লো জীবটার দেহের উপর।
জীবটা এবার যুবতীটিকে ছেড়ে দিয়ে বনহুরকে আক্রমণ করলো। বনহুরের হস্তে সূতীক্ষ্ম ধার ছোরা আর গরিলার দেহে অসীম শক্তি, নখগুলো ভীষণ ধারালো দাঁতগুলোও তেমনি মারাত্মক তীক্ষ্ম।
কিছুক্ষণ চললো ভীষণ ধস্তাধস্তি, কিন্তু বনহুরের ছোরার আঘাতে জীবটি বেশিক্ষণ যুদ্ধ করতে সক্ষম হলো না। বনহুরের ছোরা তার বক্ষে গেঁথে গেলো সমূলে।
জীবটা তীব্র চিৎকার করে বনহুরকে জাপটে ধরে ফেললো, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার বলিষ্ঠ লোমশ বাহু দুটো শিথিল হয়ে দুপাশে খসে পড়লো।
বনহুর টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো। ফিরে তাকাতেই দেখলো একদল লোক যুবতীটিকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সকলেরই দৃষ্টি বনহুর ও জীবটার দিকে। সকলেরই মুখ ভয়ার্ত ফ্যাকাশে।
বনহুরকে উঠে দাঁড়াতে দেখে কয়েকজন ছুটে গিয়ে তাকে ঘিরে দাঁড়ালো, দু’জন ধরে ফেললো তাকে। বনহুরের কপালের এক পাশে কেটে রক্ত ঝরছিলো।
শিকারীদল বনহুরকে তাড়াতাড়ি এক জায়গায় বসিয়ে তার সেবায় আত্মনিয়োগ করলো।
যুবতীর দেহে তেমন কোনো আঘাত বা ক্ষত হয় নি, তবে ভয়ে একেবারে বিবর্ণ হয়ে গেছে।
একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক যুবতীটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউ-মাউ করে কাঁদছে, হয়তো লোকটির কন্যা হবে যুবতী। প্রৌঢ় বিলাপ করে বলছিলেন– কেন তুই এলি মা? কেন তোর এমন সখ চেপেছিলো? হায় হায়! ওনি যদি তোকে বাঁচিয়ে না নিতেন তাহলে এতোক্ষণ তোর অবস্থা কি হতো বল দেখি?
বৃদ্ধ যখন কন্যাকে ফিরে পেয়ে নানা রকম সান্ত্বনা লাভের চেষ্টা করছিলেন, তখন অন্যান্য লোকজন বনহুরের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছে।
বনহুর একটু সুস্থ হয়ে উঠলে তাকে নিয়ে ওরা বনের মধ্যে বেশ কিছুদূর অগ্রসর হয়ে একটা সমতল প্রশস্ত জলাভূমির পাশে গিয়ে হাজির হলো। বনহুর দেখলো একটি তাঁবু খাটানো রয়েছে। বনহুরকে সে তাবুর মধ্যে নিয়ে যাওয়া হলো, এবং একটি বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মাথায় ব্যাণ্ডেজ করে দেওয়া হলো। তাবুতে সব রকম জিনিসপত্র রয়েছে, এমন কি ঔষধপত্র সব রয়েছে তাদের সঙ্গে।
বনহুর অল্প সময়ে সুস্থ হয়ে উঠলো।
সুস্থ হয়ে সে জানতে পারলো, এরা একটি আবিষ্কারক দল। বয়স্ক ভদ্রলোক প্রফেসার ম্যাকমারা আর যুবতী তার কন্যা মিস শ্যালন– যার রুমাল সে কুড়িয়ে পেয়েছিলো কমলালেবুর খোসার পাশে। অন্যান্য লোকজন প্রফেসার ম্যাকমারার ছাত্র ও কয়েকজন তাদের দেহরক্ষী। ছাত্র হলেও দলের অনেকেই বেশ বয়স্ক ছিলো, সবগুলো মিলে প্রায় পনেরো জনের মত লোক তাদের দলে। মেয়েদের মধ্যে শ্যালন একা, শ্যালনও যে তার পিতার ছাত্রী তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বনহুর বুঝতে পারলো– এ দলের সন্ধানই সে পেয়েছিলো সেদিন। এদের আলোক রশ্মিই তার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিলো অগ্নি শিখারূপে। বনহুর আশ্বস্ত হলো এবার।
প্রফেসার ম্যাকমারা জীবনে বহু কিছু আবিষ্কার করেছেন বিশেষ করে নতুন এবং অজানা জীবজন্তু আবিষ্কার করাই তার নেশা। আজ পর্যন্ত তিনি বহু রকম জীবের সন্ধান পেয়েছেন এবং তাদের ফটো সংগ্রহ করেছেন। এবার তিনি দলবল নিয়ে আফ্রিকার জঙ্গলে আবির্ভাব হয়েছেন, নানা রকম বিপদের সম্মুখীন হয়েও তিনি অবিরত অদ্ভুত জীব-জন্তুর ফটো গ্রহণ করে চলেছেন।
