বনহুর আবার অগ্রসর হলো, দক্ষিণ হস্তে সব সময় গুলী ভরা রিভলভার উদ্যত রয়েছে।
এটা আফ্রিকার জঙ্গল, প্রতিমুহূর্তে হিংস্র জীবজন্তুর সঙ্গে তাকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সমস্ত দিন ধরে বনহুর বনময় ঘুরে বেড়ালো, ইতিমধ্যে আরও দুটো গুলী তাকে ব্যয় করতে হয়েছে।
শেষ বেলা বনহুর চিন্তিত হয়ে পড়লো, দিনের আলোয় জঙ্গলটা তবু দেখতে পাচ্ছিলো, কিন্তু রাতের অন্ধকারে নিজেকে রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হবে। তার মোটর-বোটটা সেই সাগর-তীরে পড়ে আছে, সেখানে ফিরে যাবার আর কোনো উপায় নেই।
বনহুর একটা বৃক্ষে আরোহণ করে রাত্রিযাপন করবে মনে স্থির করেছিলো, কিন্তু সবগুলো বৃক্ষই তার জন্য নিরাপদ বলে মনে হলোনা। সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো কোন্ বৃক্ষটায় আরোহণ করলে রাতের মত নিশ্চিন্ত হতে পারে।
কিন্তু আশেপাশে তেমন কোনো ছোটখাটো বৃক্ষ নজরে পড়লো না, সবগুলো প্রায় বিরাট বিরাট বৃক্ষ। বনহুর আরও কিছুটা এগিয়ে গেছে– হঠাৎ তার নজরে পড়লো, দূরে একটি আলোকরশ্মি দেখা যাচ্ছে। আলোটা কিসের বোঝা যাচ্ছে না, তবু বনহুরের মনে সন্দেহ জাগলো নিশ্চয়ই কোনো মানুষ এ জঙ্গলে প্রবেশ করেছে। নিকটবর্তী একটি বৃক্ষে আরোহণ করে চুপচাপ বসে রইলো।
বৃক্ষটির উপর হতে আলোটা আরও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এবার বনহুর বুঝতে পারলো আলোটা ছোট খাটো নয়, বেশ বড়; কোনো অগ্নিকুণ্ড হবে, বহুদূরে বনের মধ্যে জ্বলছে বলে অমন ছোট মনে হচ্ছে। নিশ্চয়ই কোনো মানুষ এ জঙ্গলে এসেছে, কিন্তু সে মানুষ সভ্য জগতের না অসভ্য জংলী কিংবা কোনো ডাকাত বা দস্যু দল। যাই হোক রাত ভোর না হওয়া পর্যন্ত তাকে ধৈর্য ধরে থাকতেই হবে, কাল সকালে সে ওদের সঙ্গে মিলিত হবার চেষ্টা করবে।
বনহুর বৃক্ষশাখায় হেলান দিয়ে ঐ অগ্নিশিখাটাই লক্ষ্য করছিলো। প্রথমে মশালের আলো বলেই ভ্রম হয়েছিলো তার কিন্তু এবার তার সে ভুল ভেঙে গেলো কারণ অন্ধকার যতই গাঢ় হচ্ছে ততই আলোক রশ্মিটা স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হয়ে উঠছিলো। এখন আলোটা মস্ত বড় বলে মনে হলো।
রাত বাড়ছে।
বনহুরের সাহসী প্রাণেও একটা আতঙ্ক জেগে উঠছে। এমন গহন বনে, একা সত্যি ঘাবড়াবার কথা। কিন্তু বনহুর ভয়ে কুঁকড়ে যায়নি, একটু ভীতিভাব জাগলেও সেটাকে কিছুতেই সে প্রশ্রয় দিচ্ছিলোনা। বৃক্ষতলে গাঢ় জমাট অন্ধকার বনের কোনদিকে এখন আর নজর চলছেনা, শুধু হিংস্র জীবজন্তুর ভয়ঙ্কর গর্জন আর মারামারি ধস্তাধস্তি চলেছে। সেকি উৎকট তীব্র হুঙ্কার। বনহুর আজ রাতের অন্ধকারে উপলব্ধি করছে আফ্রিকার জঙ্গলের আসল রূপ।
গোটা রাত হিংস্র জীবজন্তুর লড়াই-এর শব্দ শুনতে শুনতে রাত ভোর হয়ে গেলো। গাছে গাছে পাখির কলরব জেগে উঠলো, পূর্ব আকাশে দেখা দিলো সূর্যদেব।
বনহুর এবার বৃক্ষ থেকে নেমে দাঁড়ালো নিচে। রাত্রিতে এখানে কি ভয়ঙ্কর লড়াই না হয়ে গেছে, ওদিকে লক্ষ্য করতেই বনহুর চমকে উঠলো, বিরাট একটা লোমশ দেহ পড়ে আছে ঝোপঝাড় আর আগাছার মধ্যে। সেদিকে অগ্রসর হলো বনহুর, জীবটা মৃত না জীবিত। জীবিত হলে নিশ্চয়ই ওভাবে পড়ে থাকতোনা।
নিকটে পৌঁছে দেখলো বিরাট এক গরিলা চিৎ হয়ে পড়ে আছে, মরে শক্ত হয়ে গেছে ওর দেহটা। কিন্তু বনহুর আশ্চর্য হলো গরিলার দেহে কোথাও আঘাত বা ক্ষতচিহ্ন নেই। হঠাৎ গরিলাটা মারা পড়লো কেনো, রাতে মেঘ গর্জনের মত একটা হুঙ্কার তার কানে এসেছিলো, সেটা যে ঐ গরিলার কণ্ঠের তীব্র আর্তনাদ এখন সে স্পষ্ট বুঝতে পারলো।
হঠাৎ বনহুরের নজর চলে গেলো গরিলার হাতের মুঠায়। বিস্মিত হলো সে, অবাক হয়ে দেখলো গরিলার দক্ষিণ হস্তের মুঠায় একটি সাপ জড়িয়ে আছে, সাপটার অর্ধেকটা পড়ে আছে তার বাম হস্তের পাশে। বিরাট কালনাগ সাপ ওটা। বনহুর এবার বুঝতে পারলো সর্পদংশনে গরিলাটার মৃত্যু ঘটেছে। ক্রুদ্ধ গরিলা সর্পরাজকে দু’খণ্ড করে ফেলেছে বটে, কিন্তু তার পূর্বেই সর্পরাজ দংশন করেছিলো গরিলা মহারাজকে।
বনহুর এবার অগ্রসর হলো– গত রাতে যেদিকে সেই আলোক রশ্মিটা দেখা গিয়েছিলো। সেদিকে। দিনের আলোয় বনটা হালকা আলোতে ভরে উঠেছে, কোথাও বা ঘন জমাট অন্ধকার। কারণ বনটা যেখানে বেশি নিবিড় সেখানে অন্ধকার গাঢ়। বনহুর দক্ষিণ হস্তে রিভলভার ঠিক রেখে সতর্কভাবে চলতে লাগলো।
বনহুর কিছুটা এগুতেই হঠাৎ তার নজরে পড়লো একটা সিগারেটের খালি বাক্স পড়ে আছে শুকনো পাতার মধ্যে। বনহুর সিগারেটের বাক্সটা হাতে তুলে নিলো। নিশ্চয়ই সভ্য সমাজের মানুষের পদার্পণ হয়েছে। একটা আশার আলো উঁকি দেয় বনহুরের মনে। যা হোক তবু এই নিঃসঙ্গ মুহূর্তে সঙ্গী পাওয়া যাবে। আরও কিছুটা অগ্রসর হতেই দৃষ্টি পড়লো গহন জঙ্গলের মধ্যে, একটি অগ্নিকুণ্ডের চিহ্ন দেখে বনহুর বুঝতে পারলো এ অগ্নিকুণ্ডের আলোকরশ্মি গত রাতে বৃক্ষশাখায় বসে সে দেখেছে। আশেপাশে লক্ষ্য করে আরও বুঝতে পারলো সেখানে কোনো একটি তাবু গাড়া হয়েছিলো। কতগুলো বিস্কুটের এবং লজেন্সের খালি প্যাকেট বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে পড়ে আছে। সিগারেটের বাক্স, অর্ধদগ্ধ। সিগারেটের অংশ, কমলালেবুর খোসা এমনি আরও কত রকম উচ্ছিষ্ট বস্তু পড়ে রয়েছে সে স্থানে। বনহুরের ধারণা সত্যি বলে মনে হলো। কিন্তু এরা কারা, এই আফ্রিকার জঙ্গলে কি উদ্দেশ্যেই বা। আগমন হয়েছে তাদের?
