জোয়ার আসায় তার বোটের তলায় পানি এসে গেছে।
বনহুর আর বিলম্ব না করে তার বোটের পাশের সুড়ঙ্গ মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে দু’খানা বাহু তাকে জড়িয়ে ফেললো বলিষ্ঠভাবে। অন্ধকারে বনহুর কিছু দেখতে পাচ্ছে না, তবু অল্পক্ষণেই সে। বুঝে নিলো শুধু দুটি বাহু নয়; বেশ কয়েকটি শক্ত বলিষ্ঠ বাহু তাকে মজবুত করে বেঁধে ফেলেছে। নিঃশ্বাস ফেলতে তার কষ্ট হচ্ছে। এবার সে বুঝতে পারলো– এ বাহুগুলো কোনো মানুষ বা ঐ ধরনের। জীবের নয়। অক্টোপাশের কবলে পড়েছে সে, এই তার জীবনের শেষ মুহূর্তে। একে অন্ধকার বনহুরের দেহটাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে অক্টোপাশটা, একটুও নড়তে পারছে না সে। সেকি ভীষণ প্রচণ্ড শক্তি অক্টোপাশের দেহে।
অক্টোপাশটা মানুষের রক্তের গন্ধ পেয়ে উঠে এসেছে এই স্থানে। তাছাড়া সাগরের জলরাশিও আছাড় খেয়ে খেয়ে পড়ছে বনহুর আর অক্টোপাশটার শরীরে।
বনহুর মরিয়া হয়ে উঠেছে। কোনো ক্রমে ছোরাখানা সে কোমরের বেল্ট থেকে খুলে নিতে পারছেনা। একবার যদি কোনো ক্রমে ছোরাখানা বেল্ট থেকে খুলে নিতে পারতো তাহলে সে দেখে নিতো– কে জয়ী হয়। মৃত্যু হলেও সে সান্ত্বনা পেতো শেষ চেষ্টা সে করেছে।
বনহুর যখন নিজের কোমরের বেল্ট থেকে ছোরাখানা খুলে নেওয়ায় চেষ্টা করছিলো তখন তার গলায় অক্টোপাসের একটি বাহু এমনভাবে বেষ্টন করে ধরে ছিলো বনহুর কিছুতেই আর দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম হচ্ছিলো না। পড়ে গেলো সে ভূতলো অক্টোপাসের সঙ্গে বনহুরের যে অদ্ভুত লড়াই পৃথিবীর আলো দেখলোনা। রাতের অন্ধকারে দুর্ধর্ষ বনহুর আর ভয়ঙ্কর অক্টোপাশে চলেছে লড়াই।
হঠাৎ বনহুর তার দক্ষিণ হাতখানা কোমরের কাছে নিয়ে যেতে সক্ষম হলো। কৌশলে সে খুলে নিলো সূতীক্ষধার ছোরাখানা। এবার সে হয়ে উঠলো দুর্দান্ত, জীবন-মরণ পণ করে সূতীক্ষ ছোরা দিয়ে অক্টোপাশের বাহুগুলো ঘ ঘর্চ করে কেটে ফেলতে লাগলো। যদিও অক্টোপাশের বাহুগুলো ভয়ানক শক্ত। ছিলো তবু বনহুরের ছোরার কাছে টিকতে পারলো না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অক্টোপাশের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে সক্ষম হলো দস্যু বনহুর।
বালির মধ্যে বসে পড়ে ভীষণভাবে হাপাতে লাগলো। সমস্ত দেহটা যেন থেতলে একাকার হয়ে। গেছে। জীবনে বহু রকম বিপদের কবলে পড়েছে, কিন্তু আজকের মত বিপদ বুঝি তার জীবনে কোনোদিন আসেনি। কি ভয়ঙ্কর শক্তিশালী ঐ অক্টোপাশটা।
এক সময় রাত ভোর হয়ে গেলো, বনহুর বালির মধ্যে শুয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলো। ভোরের মিষ্টি হাওয়ায় ঘুম ভেঙে গেলো বনহুরের। জেগে উঠতেই প্রথম তার নজরে পড়লো তার অনতিদূরে বালির মধ্যে ছিন্নভিন্ন একটি অক্টোপাশ পড়ে আছে। তার কতগুলো বাহু টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে। এদিক সেদিকে। বনহুর জানে, তার ছোরার আঘাতেই অক্টোপাশটির মৃত্যু ঘটেছে। ছোরাখানা না থাকলে আজ তার জীবনলীলা সাঙ্গ হয়ে যেতো তাতে সন্দেহ নেই। বনহুর তার রক্তমাখা ছোরাখানা সাগরের পানিতে পরিষ্কার করে ধুয়ে নিলো। নিজের দেহের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে, তার সুন্দর শরীরের স্থানে স্থানে রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে আছে। যেমন ভীষণ আঘাত পেলে মানুষের দেহে জখমের দাগ হয়, অক্টোপাশটির বাহুর বন্ধনে বনহুরের দেহেও তেমনি দাগ হয়ে গিয়েছিলো।
বনহুর জামাটা খুলে পরিষ্কার করে নিলো, মেলে দিলো তার মোটর-বোটটার গায়ে।
বেলা বাড়ছে ক্ষুধা বাড়ছে বনহুরের, ওদিকের পাথর খণ্ডটার উপরে কালকের সেই পাকা বেলটা তখনও পড়ে রয়েছে। বনহুর পাথরখণ্ডটার উপর থেকে বেলটা তুলে নিয়ে ভেঙে ফেললো, তারপর তৃপ্তি মিটিয়ে খেলো।
বেলগুলো যথেষ্ট বড় এবং সুমিষ্ট, তাই বনহুর প্রাণভরে ভক্ষণ করে নিলো।
অনেকটা সুস্থ বোধ করলো বনহুর।
এবার সে আবার প্রবেশ করলো বনের মধ্যে। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে অগ্রসর হলো, দিনের আলোয় বনের মধ্যে বেশ পরিস্কার সব নজরে পড়ছে। মানুষের সাড়া পেয়ে অনেক রকম ছোটোখাটো জীবজন্তু ছুটে পালাতে লাগলো। কোনো কোনো জায়গায় হরিণ হরিণী মনের আনন্দে ছোট ছোট গাছের পাতা ভক্ষণ করছিলো। কোথাও গাছের গর্তে শিয়ালী তার বাচ্চাদের নিয়ে পরম নিশ্চিন্তে বসে বিশ্রাম। নিচ্ছিলো। কোথাও বা জেব্রা তার লম্বা গলা বাড়িয়ে উঁচু কোনো ডাল থেকে কচি ডগাটা ভেঙে নেবার চেষ্টা করছিলো। বনহুরের পদশব্দে ঘাড় ফিরিয়ে তাকে দেখে নিলো, কিন্তু নড়লোনা– যেমন গাছের ডগা অন্বেষণ করছিলো তেমনি করতে লাগলো। বনহুর এদের নির্ভীক আচরণে মুগ্ধ হলো।
আরও কিছুদূর অগ্রসর হতেই দেখলো– একটি বাঘিনী তার কতগুলো বাচ্চা নিয়ে নিশ্চিন্ত আরামে নাক ডাকাচ্ছে। হয়তো মানুষের আগমন সে বুঝতেই পারেনি।
বনহুর ব্যাঘ্র-গৃহিণীর নিদ্রায় ব্যাঘাত না ঘটিয়ে বিপরীত দিকে চলতে লাগলো। কিছুটা এগুতেই দক্ষিণ পাশের ঝোপের মধ্যে একটা ঘোঁৎ ঘোৎ আওয়াজ তার কানে প্রবেশ করলো। তৎক্ষণাৎ বনহুর ফিরে দাঁড়ালো, দক্ষিণ হস্তে তার রিভলভার ধরাই ছিলো। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই নজরে পড়লো– একটি বন্যশুকর তীব্র বেগে ছুটে আসছে, মাথাটা নিচু করে!
বন্যশূকরটি যে তাকে লক্ষ্য করে ছুটে আসছে তাকে কোনো ভুল নেই। বনহুর দ্রুত একটি গাছের গুঁড়ির আড়ালে আত্মগোপন করে রিভলভার উঁচু করে ধরলো। অব্যর্থ লক্ষ্য তার, বনহুরের গুলী সোজা গিয়ে বিদ্ধ হলো শূকরটির মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে শূকরটি ঘুরপাক খেয়ে পড়ে পেলো ঝোপটার মধ্যে, বাইরে বেরিয়ে আসার সুযোগ আর তার হলোনা।
