এবার সে তাকালো গহন বনের দিকে। ক্ষুধা-পিপাসায় বুকটা শুকিয়ে উঠেছে। অত্যন্ত শক্তিশালী বলেই বনহুর এখনও চলতে পারছে। কিন্তু আর বেশিক্ষণ এভাবে চলা তার সম্ভব হবে না।
বেলাও আর বেশি নেই।
সূর্যাস্তের শেষ রশ্মি সাগরবক্ষে আবির ছড়িয়ে দিয়েছে যেন। বনহুর আর বিলম্ব না করে গহন। বনে প্রবেশ করলো। সেকি ভয়ঙ্কর ভীষণ বন, চারদিকে নানারকম বৃক্ষ লতাগুল্ম জমাট বেঁধে আছে। বনে প্রবেশ করতেই একটা গর্জন শুনতে পেলো সে, প্রকাণ্ড কোনো হিংস্র জন্তুর গর্জন।
বনহুর সচকিত হয়ে তাকালো, বনের মধ্যে বেলা শেষের অন্ধকার তখনও ঘনীভূত হয়ে উঠেনি। যদিও তবু বেশ ঝাপসা হয়ে এসেছিলো। সম্মুখে তাকাতেই দেখতে পেলো– ঝাপসা অন্ধকারে দুটো আগুনের গোলা জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। বনহুর মুহূর্তে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ালো, প্যান্টের পকেট থেকে রিভলভার বের করে অগ্নিগোলাদ্বয় লক্ষ্য করে গুলী ছুড়লো। সঙ্গে সঙ্গে হুঙ্কার করে লাফিয়ে পড়লো একটি বিরাট ব্যাঘ্র। বনহুর নিমিষে সরে দাঁড়ালো, ব্যাঘ্রটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো মাটিতে। তারপর আর উঠে দাঁড়াবার শক্তি ছিলোনা, কাৎ হয়ে শুয়ে পড়লো। বারকয়েক একটা গোঁ গোঁ শব্দ করে নীরব হয়ে গেলো ওর দেহটা।
বনহুর এগিয়ে এলো, ভাল ভাবে লক্ষ্য করে দেখলো বিরাট একটি চিতাবাঘ সে হত্যা করেছে। এমন বাঘ তার নজরে আজ পর্যন্ত খুব কমই পড়েছে, কিছুক্ষণ স্থিরভাবে তাকিয়ে থেকে দেখলো বনহুর বাঘটাকে। ভাগ্যিস তার নিকটে রিভলভার ছিলো, না হলে এই দণ্ডে তার মৃত্যু ঘটতো।
বনহুর দু’পা অগ্রসর হয়েছে অমনি একটা কিছু তার পায়ে জড়িয়ে ধরলো, চমকে উঠে পায়ের দিকে তাকাতেই আড়ষ্ট হয়ে গেলো বনহুর কালো মত কিছু একটা তার পা দুখানা জড়িয়ে ধরেছে। কি এটা! বনহুর আর চলতে পারছে না। নিশ্চয়ই কোনো জীব হবে। বনহুর ভাল ভাবে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলো– জীবই বটে। একটা জোক তার পা দু’খানাকে লেপটে ধরেছে।
বনহুর বুঝতে পারলো–ওটা আফ্রিকার জঙ্গলের জোক। তার পায়ে ভারী বুট থাকায় জেঁকটা চাক্তি বসাতে পারছেনা। অনেক চেষ্টা করলো বনহুর কিন্তু জোকটাকে সে কিছুতেই পা থেকে সরিয়ে নিতে পারলোনা। এখন উপায়, বনহুর এবার তার কোমরের বেল্ট থেকে সূতীক্ষ্ণধার ছোরাখানা খুলে নিলো, তারপর দ্রুতহস্তে সেঁকটাকে দুই খণ্ড করে ফেললো।
এবার তার পা দুখানা মুক্ত হয়ে এলো। তাকালো বনহুর চারদিকে, অগ্রসর হবে কিনা ভাবছে। সে জানে, এটা কত বড় ভয়ঙ্কর মারাত্মক স্থান। পৃথিবীর সবচেয়ে সাংঘাতিক বন এই আফ্রিকার জঙ্গল। এ জঙ্গলে প্রবেশ করা মানে সানন্দে মৃত্যুকে বরণ করা। কিন্তু উপায় কোথায়, পিছনে সীমাহীন সাগর আর সম্মুখে গহন বন। বনহুর এখন কোন দিকে যাবে, রিভলভারে মাত্র কয়েকটা গুলী এখনও জমা রয়েছে। কতক্ষণ ঐ গুলী কটি তাকে রক্ষা করবে, ভেবে পায়না সে।
ক্ষুধা-পিপাসায় কণ্ঠনালী শুকিয়ে উঠেছে, নাড়ী-ভুড়ি হজম হবার জোগাড় প্রায়। বনহুর ক্লান্ত অবশ দেহটা টেনে নিয়ে আরও কিছুটা অগ্রসর হলো, হঠাৎ সম্মুখে কয়েকটা বেল ফল পড়ে থাকতে দেখে। আনন্দে অধীর হয়ে উঠলো। সুমিষ্ট বেলগুলো বনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আছে, কতগুলো দু’খণ্ড হওয়া। বনহুর দুটি বেল হাতে তুলে নিয়ে নাকে ধরলো। সুন্দর সুমিষ্ট গন্ধ বেল দুটি হাতে করে বনহুর দ্রুত বেরিয়ে এলো বন থেকে।
সাগরতীরে তখন অন্ধকার হয়ে গেছে।
সাগর-তরঙ্গের গর্জন ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। বনহুর একটা পাথর খন্দ্রে উপরে চেপে বসে বেল দুটির একটি ভেঙে ফেললো। তারপর পরম আনন্দে গোগ্রাসে গলধঃকরণ করলো।
একটি বেল খেয়েই বনহুরের ক্ষুধা-পিপাসা লাঘব হয়ে গেলো। অন্যটি পাশে রেখে ভাবলো এবার একটু নিশ্চিন্ত জায়গায় প্রয়োজন, কিন্তু এখানে তেমন নিরাপদ স্থানের আশা দুরাশা মাত্র। হিংস্র জীবজন্তু পরিপূর্ণ এ জঙ্গলে প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে অতীব ভয়ঙ্কর।
বনহুর ভাবলো, তার মোটর-বোটখানা আবার সাগরে ভাসিয়ে রাতের মত নিশ্চিন্ত হতে পারে, কিন্তু সাগরের ঢেউ-এর স্রোতে আবার যদি তাকে সাগর মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাহলে উপায় কি হবে!
রাতের মত তাকে আশ্রয় করে নিতেই হবে।
বনহুর এবার একটা বুদ্ধি আটলো মাথায়। তার মোটর-বোটখানা উঁচু করে নিচে যদি শুয়ে পড়ে তাহলে হয়তো নিশাচর হিংস্র জন্তুর কবল হতে রক্ষা পেলেও পেতে পারে। বনহুর এবার পাথর খণ্ডটার উপর থেকে নেমে এগিয়ে গেলো তার মোটর বোটটার পাশে। অল্পক্ষণের চেষ্টায় বোটখানা বনহুর উঁচু করে ফেললো, কিন্তু এখন ভিতরে প্রবেশের উপায় কি? বনহুর হতাশ হবার বান্দা নয়, বোটখানার পাশে বালির মধ্যে একটা গর্ত করে ফেললো– তারপর সেই সুড়ঙ্গ মুখ দিয়ে প্রবেশ করলো সে ভিতরে। যাক, রাতের মত আশ্রয় হলো তার।
পরম নিশ্চিন্ত মনে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো বনহুর। কদিন তার দেহের উপর দিয়ে ভীষণ যুদ্ধ চলেছিলো, শুধু দেহেই নয় মনটাও দুশ্চিন্তায় ভরে ছিলো, কারণ সাগরবক্ষ থেকে তীরে পৌঁছতে পারবে কিনা সন্দেহ ছিলো তার।
বনহুর ঘুমিয়ে পড়েছে, কতক্ষণ ঘুমিয়েছে খেয়াল নেই হঠাৎ মনে হলো তার শরীরটা যেন পানিতে ভাসছে। তাড়াতাড়ি উঠে বসতে গেলো কিন্তু মাথায় আঘাত লেগে তন্দ্রা ছুটে গেলো মুহূর্তে। স্মরণ হলো, সে সাগরতীরে মোটর-বোটের নিচে শুয়ে ছিলো।
