বনহুর যা ভেবেছিলো হলো তাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ ছেয়ে গেলো কালো মেঘে। বাতাস। ভীষণ ঝড়ের আকার ধারণ করলো। সাগরবক্ষ কেঁপে-ফুলে দশ হাত উঁচু হয়ে উঠলো। প্রচণ্ড প্রচণ্ড ঢেউ তীরবেগে ছুটে এসে আছড়ে পড়তে লাগলো। বনহুর মোটর-বোটের হাল চেপে ধরে শক্ত হয়ে বসে রইলো দক্ষ মাঝির মত।
প্রবল ঝড়ের দাপটে এবার তীরবেগে বোটখানা ছুটতে লাগলো দিশেহারার মত।
সেকি ভীষণ ঝড়!
অবশ্য বনহুরের কাছে এ ঝড় নতুন নয়; সে আরও দু’বার সাগরবক্ষে সাইক্লোনের কবলে পড়েছিলো, কিন্তু এমনভাবে নয়; সে হলো জাহাজের উপর। আর আজ এ সম্পূর্ণ ক্ষুদ্র একটি জলযানের উপর, বনহুর তবু এতোটুকু বিচলিত হলোনা।
ঝড়ের মধ্যেই শুরু হলো প্রবল বৃষ্টিপাত।
বনহুর ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর ছিলো, ঠাণ্ডা-শীতল বৃষ্টিধারা পান করার জন্য সে লালায়িত হয়ে উঠলো। হাতে নিয়ে বৃষ্টির জল পান করার কোনো উপায় ছিলোনা। কারণ বলিষ্ঠভাবে হাল ধরে সে বোটখানাকে বাঁচিয়ে নিচ্ছিলো। বনহুর আকাশের দিকে হা করে বৃষ্টিধারা পান করতে লাগলো।
এতো বিপদেও বনহুরের হাসি পেলো, চাতক পাখির মত আজ তার অবস্থা হয়েছে, কিন্তু এখন কোনো কথা ভাববার বা চিন্তা করবার সময় নেই। এতোটুকু ভুল হলেই তার বোট ঢেউ-এর তলায় নিমজ্জিত হবে।
সেকি ভীষণ অবস্থা। সাগরবক্ষ যেন উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। পাগলা হাতির মত ঢেউগুলো ছুটছে এদিক থেকে সেদিকে। বনহুরের শরীরে ঝড়ের ঝাপ্টা তীরবেগে এসে লাগছে। দুর্বল কোন মানুষ হলে কখন কুটোর মত উড়ে যেতো কোথায় কে জানে।
বনহুর জীবনে বহু প্রাণীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে।
হাঙ্গর কুমীরের সঙ্গেও সে লড়াই করেছে, বাঘ-ভল্লুক-সিংহ শাবক ছিলো তার ছোটবেলার খেলার সাথী। কত হিংস্র জীবজন্তু যে বনহুরের হাতে জীবন দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
আজ বনহুর লড়াই করে চলেছে ঝড়ের সঙ্গে, ঝড় নয় প্রচণ্ড সাইক্লোনের সঙ্গে। বনহুর দেখতে চায় কে জয়ী হয়– সে না সাইক্লোন। যত ঝড়ের বেগ বাড়তে থাকে, ততই বনহুর তটস্থ হয়ে উঠে। প্রচণ্ডবেগে প্রকাণ্ড ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে বনহুরের দেহে। কিন্তু অতি কৌশলে বনহুর তার মোটর বোটখানাকে বাঁচিয়ে নিতে লাগলো।
শেষ পর্যন্ত জয়ী হলো বনহুর।
ভয়ঙ্কর সাইক্লোন তার বোটখানাকে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হলোনা। এক সময় ধীরে ধীরে ঝড়ের দাপট কমে এলো। আকাশও সচ্ছ হয়ে এলো অনেক। সাগরের উন্মত্ততাও কমে এলো আস্তে আস্তে। এবার বনহুর আশ্বস্ত হলো, যা এ যাত্রা সে পরিত্রাণ পেলো।
বনহুর ভিজে কাপড়-চোপড় ভাল করে নিংড়ে আবার পড়ে নিলো, কিছুক্ষণ পূর্বে সেই আকাশ বাতাসের রূপ সম্পূর্ণ পাল্টে গেলো। কে বলবে এ প্রকৃতি একটু আগে কি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছিলো। সচ্ছ আকাশ, সাগরের প্রচণ্ড ঢেউগুলো এখন শান্ত ছেলের মতই নীরব নিশ্চুপ হয়ে পড়েছে।
বনহুর পূর্বের চেয়ে এখন অনেক সুস্থ্য বোধ করছে। কদিন তার গোসল ছিলোনা, শরীরটা জ্বালা করছিলো ভীষণভাবে। এখন আর শরীরে তেমন কোন জ্বালাময় ভাব নেই। আংগুল দিয়ে বনহুর চুলগুলো আঁচড়ানোর মত করে নিলো।
কিছু সময়ের মধ্যে তার শরীরের ভিজে জামা কাপড়গুলো শুকিয়ে এলো। বনহুর এবার তার ক্লান্ত অবশ দেহটা এলিয়ে দিলো মোটর-বোটের আসনে।
সিগারেট আর নেই– নিঃশেষ হয়ে গেছে কবে। খাবার না পেলো তবু যদি এ সময় সিগারেট পেতো দু’চারটে তাহলেও এতোটা খারাপ লাগতোনা তার।
আপন মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে বনহুর– এমন সময় হঠাৎ পাখি দেখতে পেলো আকাশে উড়ছে। তড়িৎ গতিতে বনহুর উঠে বসলো, ভাল করে লক্ষ্য করতেই আনন্দে আপ্লুত হলো। পাখিটি সাধারণ একটি মাছরাঙা পাখি। বনহুর বুঝতে পারলো তার বোটখানা তীরের অত্যন্ত নিকটে এসে পড়েছে। নাহলে এমন ছোট পাখি আকাশে উড়তে দেখা যেতোনা।
যা ভেবেছিলো বনহুর, ভালভাবে তাকাতেই সে দেখলো–পশ্চিম দিকে কালো রেখার মত কিছু। নজরে পড়ছে। বোটের মধ্যে ছোট্ট একটি বৈঠা ছিলো, বনহুর সেই বৈঠা হাতে তুলে নিয়ে পানি টানতে শুরু করলো।
জানে বনহুর সামান্য বৈঠার টানে এই বিশাল সাগরবক্ষে অগ্রসর হওয়া কতটুকু সম্ভব। তবু সে আপ্রাণ চেষ্টায় পানি টানতে আরম্ভ করলো।
বনহুরের অসাধ্য বুঝি কিছু নেই, সে বেশ কয়েক ঘন্টার অবিরাম পরিশ্রমের পর তীরের সন্নিকটে আসতে সক্ষম হলো। সেকি ভয়ঙ্কর জঙ্গল, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বৃক্ষরাজি জমাট বেঁধে যেন দাঁড়িয়ে আছে সাগর তীরের সন্নিকটে। বনহুরের দৃষ্টি সে জঙ্গলে প্রবেশে সক্ষম হলোনা। অদূরে নজর পড়তেই বনহুর অবাক হলো, এক দল হরিণ সাগরতীরে পানি পান করছে।
বনহুরের বোটখানা দেখতে পেয়ে ছুটে পালালো হরিণদল। একটি ছোট্ট হরিণ শিশু তখনও পালাতে সক্ষম হয়নি, সকলের পিছনে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছিলো। বনহুর সেই হরিণশিশু লক্ষ্য করে রিভলভার উঁচু করে ধরলো, কিন্তু পর মুহূর্তে নামিয়ে নিলো রিভলভারখানা। কি হবে ওটাকে হত্যা করে, সামান্য একটা হরিণশিশু! সঙ্গে ম্যাচবাক্স থাকলে তবু না হয় আগুন জ্বেলে ওটাকে উদরস্থ করা যেতো, কিন্তু সে রকম কোনো উপায় নেই।
বনহুর তার বোটখানা তীরে লাগিয়ে নেমে পড়লো। কিছুক্ষণের জন্য মৃত্তিকায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো। ক’দিন অবিরত সাগরবক্ষে থাকায় মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছিলো, বোটের দোলাটা যেন এখনও তার শরীরে দোল জাগাচ্ছিলো, বনহুর তার বোটখানা টেনে তুলে নিলো ডাঙ্গায়।
