আজকের দিনটাও বনহুরের এ ভাবেই কেটে চললো। প্রখর সূর্যের তাপে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো বনহুর। ক্ষুধা-পিপাসায় কণ্ঠ শুকিয়ে আছে। বনহুর ভেবে পায়না আর কতক্ষণ এ ভাবে জীবন বাঁচিয়ে রাখতে পারবে সে।
*
সমস্ত জাহাজে সাড়া পড়ে গেলো, মিঃ আলমগীর সাহেব গেলেন কোথায়! জাহাজের ক্যাপ্টেন চিন্তিত হয়ে পড়লেন? সকলেরই ধারণা দস্যু বনহুর তাকে কৌশলে জাহাজ থেকে উধাও করেনি তো। পুলিশ ডাক্তার কিবরিয়ার উপর কড়া নজর রেখেছে পাহারাদারগণ।
বিশেষ করে মিস সুইটি আর মঞ্জুর ঘাবড়ে গেলো। ভদ্রলোক তাদের কক্ষেই ছিলো সে রাতে এবং তাদের অনুরোধেই ছিলো। হঠাৎ আলমগীর সাহেবের অন্তর্ধানে একেবারে মুষড়ে পড়লো তারা। মঞ্জুর তো প্রায় কেঁদেই ফেললো, কারণ অত্যন্ত ভদ্রলোক ছিলেন আলমগীর সাহেব, তাছাড়া তিনি একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার।
গোটা জাহাজ অনুসন্ধান চালানো হলো, জাহাজের প্রত্যেকটা জায়গা তন্ন তন্ন করে দেখা হলো– আলমগীর সাহেবের কোন খোঁজই পাওয়া গেলোনা।
সম্পূর্ণ দুটো দিন পর তাদের জাহাজ ‘মডেল’ আরাকান বন্দরে পৌঁছে গেলো।
বন্দরে সশস্ত্র পুলিশ ফোর্স নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মিঃ জাফরী এবং মিঃ হোসেন ও আরও কয়েকজন পুলিশ অফিসার।
জাহাজ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত জাহাজটা পুলিশ ফোর্স ঘিরে ফেললো। মিঃ জাফরী সর্বপ্রথম পুত্র-কন্যার মঙ্গল সংবাদের জন্য ছুটে গেলেন জাহাজে। দস্যু বনহুর তাদের কোনো ক্ষতি সাধন করেছে কিনা এই তার সন্দেহ। কিন্তু তিনি যখন জানতে পারলেন তার পুত্র এবং কন্যা সুস্থ ভাবে জাহাজে অবস্থান করছে তখন তিনি আশ্বস্ত হলেন।
মিস সুইটি এবং সকলের মুখে এক আশ্চর্য খবর তিনি জানতে পারলেন– পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ আলমগীর সাহেব নাকি এ জাহাজে আসছিলেন, কিন্তু পথের মধ্যে তিনি কোথায় জাহাজ থেকে উধাও হয়ে গেছেন। মিঃ জাফরী কথা শুনে অবাক হলেন–কারণ আলমগীর সাহেবকে তিনি সশরীরে কান্দাই পুলিশ অফিসে রেখে এসেছেন।
মিস সুইটি আরও জানালো–আব্বা, মিঃ আলমগীর সাহেব বড় মহৎ এবং ভাল লোক। তিনি সব সময় আমাদের খোঁজ-খবর রাখতেন। আমাদের যাতে কোনো রকম অসুবিধা না হয় সেজন্য তার সতর্ক দৃষ্টি ছিলো। যেদিন রাতে তিনি নিখোঁজ হয়েছেন, সেদিন দস্যু বনহুরের ভয়ে তাকে আমাদের ক্যাবিনেই রেখেছিলাম কিন্তু ভোরে উঠে দেখি তিনি নেই।
মিঃ জাফরী আরও অবাক হলেন যখন ডক্টর কিবরিয়ার ক্যাবিনে গিয়ে দেখলেন, পাহারাদারগণ তাঁকে কড়া পাহারায় রেখেছে, এমনকি ডক্টর কিবরিয়াকে বাইরে পর্যন্ত বের হতে দিচ্ছেন তারা। মিঃ জাফরীকে দেখে তিনি প্রায় কেঁদে ফেললেন– তিনি প্রায় পঁচিশ বছর ধরে পুলিশ হসপিটালে সার্জনের কাজ করছেন, কোনো দিন এমন অপদস্থ হননি আর আজ কিনা বৃদ্ধ বয়সে তিনি হলেন ছদ্মবেশী দস্যু বনহুর!
মিঃ জাফরী হাসবেন কি কাঁদবেন ভেবে পাননা, পাহারাদারগণ এমনভাবে একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে নাজেহাল করে তুলেছে দেখে তিনি ভীষণ রেখে গেলেন।
কিন্তু কি করবেন ওয়্যারলেস সংবাদে দস্যু বনহুর এ জাহাজে আছে জানতে পেরে জাহাজময় যখন একটা ভীষণ আতঙ্ক সৃষ্টি হয় তখন মিঃ আলমগীর তাদের এভাবে ডক্টর কিবরিয়ার উপর কড়া নজর রাখার নির্দেশ দেন, কারণ তার গতিবিধি নাকি সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছিলো।
মিঃ জাফরী সব শুনে গম্ভীর হলেন, তিনি বুঝতে পারলেন- ঐ মিঃ আলমগীর বেশি ব্যক্তিই দস্যু বনহুর। সে জাহাজের লোকের চোখে পুলিশ অফিসার বলে থোকা দিয়ে নিজে আত্মগোপন করেছিলো এবং সুযোগ বুঝে অন্তর্ধান হয়েছে। মিঃ জাফরী এবং মিঃ হোসেন সবার হয়ে ডক্টর কিবরিয়ার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন।
সমস্ত জাহাজ তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান চালালেন পুলিশ বাহিনী, প্রতিটি ব্যক্তিকে সনাক্ত করা হলো কিন্তু দস্যু বনহুরকে পাওয়া গেলোনা।
মিস সুইটির বিছানা উঠাতে গিয়ে চাকর ছোকরা একটি ভাঁজ করা কাগজ হাতে ছুটে এলো– স্যার, আপামনির বিছানায় বালিশের তলায় এটা পেয়েছি।
মিঃ জাফরী চিঠিখানা হাতে নিয়েই বুঝতে পারলেন এ-চিঠি দস্যু বনহুরের ছাড়া কারো নয়। তারপর চিঠি পড়া শেষ করে তিনি আশ্বস্ত হলেন, তার ধারণা অমূলক নয়। যার সন্ধানে প্লেনযোগে তারা আরাকানে এসে হাজির হয়েছেন– সে মাঝ সাগরে উধাও হয়েছে।
মিঃ জাফরী রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়লেন, দস্যু বনহুর তাকে বার বার এমনভাবে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছে। শুধু তাকেই নয়, সমস্ত পুলিশ বাহিনী নাজেহাল হয়ে পড়েছে, দস্যু বনহুরকে কেউ আয়ত্ত্বে আনতে পারছেনা।
দেশব্যাপী শুধু দস্যু বনহুর আর দস্যু বনহুর!
‘মডেলে’ যখন দস্যু বনহুরকে নিয়ে নানা রকম কথার আলোচনা চলছে তখন দস্যু বনহুর তার মোটর-বোটে সাগরবক্ষে ভেসে চলেছে, কোথায় কোন অজানার পথে।
বনহুর ক্ষুধার চেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে প্রখর রৌদ্র যখন অগ্নি বর্ষণ করে। বনহুর শুধু পুরুষই নয় সে লৌহমানুষ। তাই তার সুন্দর দেহ রাঙা হয়ে উঠলেও কালো হয়ে গেলোনা বা অবশ শিথীল হয়ে পড়লোনা।
তৃতীয় দিনে বনহুর দেখলো আকাশের দক্ষিণ কোণে জমাট কালো মেঘ ভেসে উঠেছে। বনহুর জানে এ মেঘ কত ভয়ঙ্কর! বিশেষ করে সাগরবক্ষে অতি মারাত্মক এ মেঘ। সাইক্লোন ঝড়ের পূর্বলক্ষণ।
বনহুর ভীত হলোনা, একটা আশা তার মনকে সবল করে তুললো। সাইক্লোন বা ঝড়-তুফান যা হয় হোক, তাহলে তার বোটখানা নিশ্চয়ই এ ভাবে ধীরে ধীরে অগ্রসর হবেনা। প্রচণ্ড ঝড়ে সাগরবক্ষে জাগবে ভীষণ ঢেউ, বনহুর মোটর-বোটের হাল যদি ঠিকভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হয়, তাহলে হয়তো কোন তীরের দিকে পৌঁছেও যেতে পারবে সে।
