মোটর-বোটখানা এখন কোন দিকে চলেছে কে জানে। হয়তো বা তীরের দিকে নয়–তীর ছেড়ে আরও মাঝ-সাগরে। বোটের হ্যাণ্ডেল চেপে ধরে বসে আছে বনহুর। চারদিকে গাঢ় অন্ধকার, কিছু দেখা যাচ্ছে না। এতোক্ষণ তবু জাহাজের আলোটার একটা ক্ষীণ রশ্মি তার দৃষ্টি শক্তিকে আকর্ষণ করছিলো, এবার জাহাজখানা সম্পূর্ণ দৃষ্টির আড়ালে অন্তর্হিত হয়েছে।
বনহুর তাকিয়ে আছে সীমাহীন অন্ধকারের দিকে। সাগরবক্ষ শান্ত হলেও একেবারে নীরব নয়। উচ্ছল জলরাশি গর্জন করে ছুটে চলেছে কোন অজানার পথে। বনহুর মোটর-বোটের হ্যাণ্ডেল চেপে ধরে নিশ্চুপ বসে রইলো। যতক্ষণ না ভোরের আলো ফুটেছে ততক্ষণ তাকে ধৈর্য ধরে বসে থাকতেই হবে। কিন্তু বনহুর গভীরভাবে চিন্তা করে ঘাবড়ে গেলো। তীর যদি সীমানার মধ্যে না হয় তাহলে মস্ত বিপদ, সূর্যের জ্বালাময় তীব্র আলো সহ্য করাই হবে মুস্কিল। ক্ষুধা সহ্য করা তার অভ্যাস আছে। যত কষ্ট হোক নীরবে বহন করতে পারবে, কিন্তু প্রখর সূর্যের তাপ কতক্ষণ সহ্য করতে পারবে সে!
যত চিন্তাই করুক বনহুর তাকে নিয়ে বোটখানা, দিকহারা ভাবে একদিকে ছুটে চললো।
বনহুর যখন জাহাজ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসে তখন সে পরিচ্ছদের নিচে তার দস্যুবেশ। লুকিয়ে রেখেছিলো। সূতীক্ষ্ণ-ধার ছোরা, রিভলভার, কিছু গুলী নিয়েছিলো সে চোরা পকেটে। বনহুর জানতো এ অঞ্চল অতি ভয়ঙ্কর স্থান, তাই সে বিপদ মুহূর্তেও কয়েকটি অতি প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়েছিলো সঙ্গে।
এক সময় পূর্ব আকাশ ফর্সা হয়ে এলো। এতোক্ষণে বনহুর দিক নির্ণয় করে নিতে সক্ষম হলো। ভালভাবে সাগরবক্ষে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে লাগলো। শুধু জল আর জল, তীরের কোনো চিহ্ন নেই। বনহুর বোট থামিয়ে ফেললো, কোন দিকে যাবে সে। কোন দিকে এগুলো তীরের দিকে যেতে পারবে কে জানে।
বনহুর ভ্রুকুঞ্চিত করে দেখতে লাগলো। আকাশে কোনো পাখিটি পর্যন্ত নজরে পড়লোনা। বনহুর বুঝতে পারলো– একশত মাইলের মধ্যে তীরের কোনো চিহ্ন নেই।
বনহুর আবার স্টার্ট দিলো তার মোটর-বোটে। যা ভাগ্যে থাকে হবে, চুপ থাকার জন সে নয়। যতক্ষণ বোটের ইঞ্জিনে শক্তি আছে ততক্ষণ তীরের সন্ধানে ছুটবে সে!
কিন্তু বনহুর সমস্ত দিন অবিরাম বোট চালিয়েও তীরের কোনো চিহ্ন দেখতে পেলোনা। আকাশে আজ ভাঙা ভাঙা মেঘের আনাগোনা থাকায় সূর্যের তাপ তেমন প্রখর ছিলোনা, কাজেই খুব কষ্ট তার হয়নি এখনও। তবে ক্ষুধার জ্বালা তাকে বেশ চঞ্চল করে তুলেছিলো– গোটা একটা দিন কেটে গেছে, মুখে কুটো যায়নি। পিপাসায় জিহ্বা শুকিয়ে আসছে, যদিও সে প্রচুর জলরাশির বুকে ভাসছে তবুও এক ফোঁটা জল মুখে দিবার জো নেই, বিষময় লবণাক্ত জল।
বনহুর ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছে, তার দুঃসাহসী প্রাণ আশঙ্কায় দুলে উঠছে, আরও কদিন সে তীরের সন্ধান পাবে না তাই বা কে জানে।
সমস্ত দিন কেটে গেলো, মোটর বোটের ষ্টার্ট ধীরে ধীরে কমে আসছে, কারণ পেট্রোল নিঃশেষ হয়ে এসেছে। বনহুর এবার গভীর চিন্তায় পড়লো। সাগরবক্ষে সন্ধ্যার অন্ধকার জমাট বেঁধে আসছে। আজ দুদিন এতোটুকু ঘুমায়নি সে, বনহুরের চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে আসছিলো।
পেট্রোল নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় মোটর বোটখানা অচল হয়ে পড়েছে। সাগরের ঢেউ-এর টানে আপন মনে ভেসে চলেছে এক দিকে। বনহুর এবার গা থেকে সার্টটা খুলে মাথার নিচে রেখে শুয়ে পড়লো মোটর-বোটের মেঝেতে, পা দুখানা রাখলো বোটের আসনে।
ঘুমিয়ে পড়েছে বনহুর।
আকাশে অসংখ্য তারার মালা, কালো সামিয়ানায় জরির বুটিগুলো যেন চক চক করছে।
সাগরবক্ষ আজ স্থির!
ঝিরঝিরে বাতাসে দোল খেয়ে খেয়ে বোটখানা ভেসে চলেছে। অঘোরে ঘুমাচ্ছে বনহুর, দুদিনের অনিদ্রায় শরীরটা তার ক্লান্তি আর অবসাদে ভরে উঠেছিলো, শোবার সঙ্গে সঙ্গে নিদ্রাদেবী আশ্রয় নিয়েছিলো তার আঁখিদ্বয়ে।
এমন চিন্তাহীন মনে কতদিন বনহুর ঘুমায়নি। আজ সে পরম নিশ্চিন্ত। বাতাসে কোঁকড়ানো চুলগুলো উড়ছে। সুন্দর মুখমণ্ডলে নেই কোনো দুঃচিন্তা বা ক্লান্তির ছাপ। বলিষ্ঠ বাহু দুটি বুকের উপর রয়েছে। বুট পরা পা দুখানা তখনও তোলা হয়েছে বোটের আসনে।
*
এক নিদ্রায় রাত ভোর হয়ে যায়।
সূর্যের আলো চোখে লাগতেই উঠে বসলো বনহুর। একি, তার বোটখানা আর নড়ছে বলে মনে হলোনা! বনহুর ধড়ফড় উঠে দাঁড়ালো, অবাক হয়ে দেখলো একটা ছোট্ট গোলাকার দ্বীপের সঙ্গে তার বোটখানা আটকে গেছে।
আশায়-আনন্দে বনহুরের মনটা নেচে উঠলো। তাহলে এবার মাটির সন্ধান পাওয়া গেলো যা হোক। বনহুর খুশি হয়ে বোট থেকে এক লাফে নেমে পড়লো, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট দ্বীপটা দুলে উঠলো। যেন। বনহুর ভাল করে লক্ষ্য করবার পূর্বেই দ্বীপটা চলতে শুরু করলো, তারপর আস্তে করে তলিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হলো। বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে পুনরায় লাফিয়ে উঠে বসলো নিজের মোটর বোটখানায়। আর একটু হলেই হয়েছিলো আর কি, বনহুরের বোটখানা যে ছোট্ট দ্বীপটায় আটকে পড়েছিলো আদতে সেটা কোনো দ্বীপ বা ঐ ধরনের কিছু নয়–একটা বিরাট কচ্ছপ, তারই পিঠের উপর সে লাফিয়ে নেমে দাঁড়িয়েছিলো।
বনহুর তাকিয়ে দেখলো বিরাট কচ্ছপটা ধীরে ধীরে ডুবে গেলো সাগরের নোনা জলে!
বনহুরের বোট তখন ভেসে চলতে শুরু করেছে।
