বনহুর শয্যায় এসে শুয়ে পড়লো।
রাত বেড়ে আসছে।
জাহাজের একটানা ঝক ঝক্ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছেনা। সমস্ত জাহাজ নীরব– নিস্তব্ধ।
জাহাজের সার্চলাইট সম্মুখে আলো নিক্ষেপ করে বিরাট জলজন্তুর মত সাগরবক্ষ দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলো।
সবাই নিদ্রায় মগ্ন।
কয়েকজন পাহারাদার গুলীভরা রাইফেল নিয়ে সজাগ পাহারা দিচ্ছিলো।
বনহুর বেরিয়ে আসে ক্যাবিন থেকে, ব্যস্তভাবে এগিয়ে যায় পাহারাদারগণের দিকে।
পাহারাদারগণ জানে, ইনি পুলিশের লোক। তাই বনহুরকে দেখামাত্র সেলুট করে দাঁড়ায়।
বনহুর বললো– দেখো, তোমরা সবাই সম্মুখ-ডেকে গিয়ে সর্তক দৃষ্টি রাখো, সামনের তিন নম্বর ক্যাবিনে যে ভদ্রলোক থাকেন তাকে আমার সন্দেহ হচ্ছে। এ জাহাজে আসার পর তার গতিবিধি আমার ভাল মনে হয়নি।
পাহারাদারদের একজন বললো স্যার, তিন নম্বর ক্যাবিনে পুলিশ ডাক্তার কিবরিয়া থাকেন।
হাঁ, ঐ ভদ্রলোকটির কথাই বলছি, তিনি যে সত্যি ডক্টর কিবরিয়া– তা নাও হতে পারেন। দস্যু বনহুরের চাতুরী বোঝা মুস্কিল, কিবরিয়ার ছদ্মবেশে সেই হয়তো আত্মগোপন করে আছে। তোমরা এই ক্যাবিনের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। আমি নিজে পিছন ডেকে নজর রাখছি। কথা শেষ করে বনহুর দ্রুত চলে যায় পিছন ডেকের দিকে।
পাহারাদারগণ বনহুরের কথামত রাইফেল বাগিয়ে ধরে ডক্টর কিবরিয়ার ক্যাবিন পাহারা দিতে লাগলো।
বনহুর পিছন ডেকে গিয়ে দাঁড়ালো, চারদিকে একবার দেখে নিয়ে ডেকের রেলিং এ ঝুলানো একটি মোটর-বোটের রশি খুলে কৌশলে একাই সে নামিয়ে ফেললো সাগরবক্ষে।
এ সব বোট বিপদকালের জন্য সর্বক্ষণ জাহাজের পিছন ডেকে মজুত করে রাখা হয়ে থাকে।
চলন্ত জাহাজের পিছন অংশে উচ্ছল ঢেউএর বুকে বোটটা যেন আছাড় খাচ্ছিলো। বনহুর টর্চের আলো ফেলে বোটটা একবার ভাল করে দেখে নিলো, তারপর অতি কৌশলে রশি বেয়ে নামতে লাগলো। নিচে। হঠাৎ যদি হাতটা ফসকে যায় তাহলেই ছিটকে গিয়ে পড়বে একেবারে সাগরবক্ষে, তখন রক্ষা থাকবেনা আর। অথৈ জলরাশির বুকে কতক্ষণ সাঁতার কেটে টিকে থাকতে পারবে। হয়তো বা কোনো ভয়ঙ্কর জীবজন্তু নিমিষে তাকে গ্রাস করে ফেলবে।
জাহাজের পিছনে জলরাশি ভীষণভাবে আলোড়িত হচ্ছিলো। দুদিক থেকে ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছিলো মোটর-বোটখানার গায়ে। তরঙ্গের বুকে একটা কুটার মত দুলছিলো বোটখানা। বনহুর রশি বেয়ে অতি সাবধানে নেমে আসছিলো জাহাজ থেকে মোটর-বোটটার দিকে।
থর থর করে কাঁপছে রশিটা। কারণ রশির একটা দিক বাঁধা রয়েছে মোটর-বোটখানার সঙ্গে; অপরদিক রয়েছে জাহাজের রেলিং এ।
বনহুর যখন ঠিক মোটর-বোটখানার অতি নিকটে পৌঁছে গেছে তখন হঠাৎ তার একখানা হাত খসে গেলো রশি থেকে। শিউরে উঠলো বনহুর কিন্তু তার ভাগ্য ভাল বলতে হবে, একেবারে রশি থেকে ছিটকে গিয়ে পড়লো সে মোটর-বোটখানার মধ্যে।
বনহুরকে নিয়ে বোটখানা তরঙ্গের বুকে প্রচণ্ডভাবে আছাড় খেতে লাগলো। নিজেকে সামলে নিতে বেশিক্ষণ লাগলো না বনহুরের। বোটের মাঝখানে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, যদিও তার পা থেকে সমস্ত শরীর ভীষণভাবে দুলছে।
বনহুর কোমরের বেল্ট থেকে ছোরাখানা বের করে নিলো। সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরা, অতি সাবধানে কেটে ফেললো রশিটা। সঙ্গে সঙ্গে একটা ঘুরপাক খেয়ে মোটর-বোটখানা জাহাজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ ষাট হাত দূরে সরে গেলো। বনহুর তাকিয়ে দেখলো তাদের জাহাজ মডেল’ বহুদূরে অন্ধকার একটা কালো পাহাড়ের মত লাগছে। মজবুত হস্তে মোটর-বোটের হ্যাণ্ডেল চেপে ধরলো বনহুর।
জাহাজে মোটর-বোটগুলো সর্বক্ষণের জন্য তৈরিই থাকে। কাজেই কোনো অসুবিধা হলোনা। বনহুর মোটর-বোটে এবার স্টার্ট দিয়ে চালু করে নিলো।
জাহাজের ঝক ঝক শব্দে মোটর-বোটের শব্দ ক্ষীণ শোনালো। বনহুর জাহাজের বিপরীত দিকে মোটর-বোটের মুখ ফিরিয়ে নিলো।
জাহাজের আলো বনহুরের চোখে মোহময় মনে হলো। ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে জাহাজখানা। বনহুর ভাবছে– ঐ জাহাজের একটি ক্যাবিনে এখনও ঘুমিয়ে রয়েছে মিস সুইটি আর মঞ্জুর। ভোরে। ঘুম ভেঙে আর তারা খুঁজে পাবেনা তাদের আলমগীর সাহেবকে! ওরা যাতে ওকে ভুল না বোঝে তাই বনহুর একখানা চিঠি লিখে রেখে এসেছে সুইটির বালিশের নিচে। বনহুর লিখেছে–
“মিস সুইটি, সত্যিকারের আলমগীর সাহেব আমি নই। আপনারা যাকে ভয় করেছিলেন, যার ভয়ে আলমগীর সাহেবকে আপনাদের রক্ষক হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন, আমি সেই লোক। আপনার পিতা মিঃ জাফরীকে আমার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাবেন। শেষ পর্যন্ত আপনাদের সঙ্গে থাকতে পারলাম না, সেজন্য দুঃখিত।” আপনাদের শুভাকাঙ্খী।
—দস্যু বনহুর
ঐ চিঠিখানা রাখতে গিয়েই বনহুরের পায়ে আঘাত লেগে টেবিল থেকে এ্যাসট্রেটা পড়ে গিয়েছিলো, তখনই জেগে উঠেছিলো মিস সুইটি আর মঞ্জুর। চিঠিখানা তখন না রাখতে পারলেও অন্যবার সে সফলকাম হয়েছিলো।
বনহুর ভাবে– মিস সুইটি জেগে উঠে তার সন্ধান করবে। হয়তো বেশ ঘাবড়ে যাবে কিছু সময়ের জন্য। জাহাজে তাকে নিয়ে একটা আলোড়ন শুরু হবে, কিন্তু যখন তার চিঠিখানা পাবে তখন সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। হয়তো আতঙ্কে শিউরে উঠবে তাদের ক্যাবিনেই রাত যাপন করেছে স্বয়ং দস্যু বনহুর!
কিন্তু ঐ সব চিন্তা করার সময় এখন বনহুরের নেই। ফিরে আসে সে নিজের উপস্থিত পরিবেশে। এখন সে মাঝ-সমুদ্রে, বাঁচতে হলে তাকে সংগ্রাম করতে হবে।
