সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ মহল জানতে পেরেছে যে জাহাজখানা গত প্রভাতে মন্থনা বন্দর ত্যাগ করে কান্দাই অভিমুখে রওয়ানা দিয়েছে সে জাহাজেই দস্যু বনহুর মন্থনার রাজকুমার প্রদীপকে পৌঁছে দিয়ে ফিরে যাচ্ছে এবং তৎক্ষণাৎ রেডিও-খবরে ব্যাপারটা জানানো হয়েছে সমস্ত দেশ হতে দেশান্তরে। এমন কি সর্বপ্রথম জাহাজখানা যে বন্দরে নোঙ্গর করবে, সেই আরাকান বন্দরেও জানানো হয়েছে সংবাদটা ওয়্যারলেসে।
মীরা জানতো না ব্যাপারটা এতোদূর গড়াবে। “দেওয়ালেরও কান আছে” কথাটা আজ মর্মে মর্মে অনুভব করে মীরা, কেন সে ভাল ভেবে কথাটা বলেছিলো তার বান্ধবীর কাছে? কেন সে এতোবড় একটা ভুল করেছিলো? দস্যু বনহুর তার কত বড় মঙ্গল সাধন করেছে, আর তারই কিনা সর্বনাশ হবে! মন্থনায় বসে ভাবে মীরা তার নকল প্রদীপের কথা– নিশ্চয়ই সে এখন ফিরে যাচ্ছে, হয়তো বা। রেডিও-সংবাদ তার কানেও পৌঁছে গেছে। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। কি ভয়ঙ্কর, কি অশোভনীয় ব্যাপার! মীরা নিজের ভুলের জন্য বিদগ্ধ হয়।
*
মীরা যখন তার নকল প্রদীপকে নিয়ে চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছে, তখন মডেল’ জাহাজের একটি ক্যাবিনে দস্যু বনহুর পায়চারী করছে আর ভাবছে আরাকানে জাহাজ পৌঁছবার পূর্বে তাকে গা ঢাকা দিতে হবে। কিন্তু জাহাজে অবস্থান করা কিছুতেই সমীচীন হবে না। আরাকান পুলিশ সমস্ত জাহাজ তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখবে, তাছাড়া তাকে সনাক্ত করার উদ্দেশ্যে কান্দাই থেকে হয়তো কয়েকজন বিশিষ্ট পুলিশ-বন্ধু প্লেনযোগে এসে হাজির হয়েছেন, তারা তাকে সাদর অভিনন্দন জানাবার জন্য আরাকান বন্দরে পুষ্পমাল্যের পরিবর্তে লৌহ-শিকল নিয়ে অপেক্ষা করছে। কাজেই আরাকান পর্যন্ত এ জাহাজে টিকে থাকা আর কিছুতেই সম্ভব হবে না।
বনহুর সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চললো। তাদের জাহাজ মডেল’ এখন আফ্রিকা জঙ্গলের প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আরাকানে পৌঁছতে এখন এক রাত্রি ও একটি দিন লাগবে। আজ রাতেই তাকে সরে পড়তে হবে জাহাজ থেকে। বনহুর মনে মনে স্থির করে নিলো, এবার তার ভাগ্য পরীক্ষা হবে আফ্রিকার জঙ্গলে। তাদের জাহাজ এখন সম্পূর্ণ আফ্রিকার জঙ্গল এরিয়ার পাশ দিয়ে চলেছে।
সমস্ত জাহাজময় একটা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে, দস্যু বনহুর এ জাহাজেই কোথাও আত্মগোপন করে আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যাত্রীদের মধ্যে একটা ভীতিকর ভাব জেগে উঠেছে। সবাই কেমন যেন নিশ্চুপ বনে গেছে, ভালোয় ভালোয় আরাকানে পৌঁছতে পারলে হয়।
যতই বেলা শেষ হয়ে আসতে লাগলো ততই জাহাজে একটা ভীতিভাব মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে লাগলো। সবার হৃদয় দুরু দুরু করে কাঁপছে। না জানি রাতের অন্ধকারে দস্যু বনহুর কার না কার উপর হামলা করে বসবে।
‘মডেলে’ বিভিন্ন জাতীয় যাত্রী ছিলো– সবাই নিজ নিজ স্বজাতীর সঙ্গে একত্র হয়ে নিজেদের অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে তৈরি হয়ে রইলো।
মিস সুইটি ও মঞ্জুর ধরে বসলো বনহুরকে, তাদের ওখানে রাত্রে থাকতেই হবে।
বনহুর শেষ পর্যন্ত রাজি না হয়ে পারলো না।
গভীর রাত।
বনহুর শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো, পাশে মঞ্জুর ঘুমাচ্ছে; ওদিকের শয্যায় মিস সুইটি নিদ্রায় মগ্ন। দস্যু বনহুরের ভয়ে দুটি ভাই-বোন কুঁকড়ে গেছে যেন। মায়া হলো বনহুরের, সত্যি ওরা বড় অসহায়। ইচ্ছা করলে মিঃ জাফরীর প্রতিশোধ নিতে পারে সে এই দুটি তরুণ-তরুণীর উপর। কিন্তু সে এতো বড় নিঃসংশয় হৃদয়হীন নয়। দস্যু বনহুর কোনো দিন অসহায়ের প্রতি অবিচার করে না।
বনহুর অতি সন্তর্পণে মিস সুইটির বিছানার দিকে অগ্রসর হলো। তাকিয়ে আছে সে তার ঘুমন্ত মুখের দিকে। হঠাৎ টি-পয়ে ধাক্কা লেগে এ্যাসট্রেটা পড়ে গেলো মেঝেতে।
সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেলো মিস সুইটি ও মজুরের। মঞ্জুর ভয়বিহ্বল কণ্ঠে বলে উঠলো– মিঃ আলমগীর সাহেব, উঠুন উঠুন, দস্যু বনহুর এসেছে, দস্যু বনহুর এসেছে!
মিস সুইটি আর্তনাদ করে উঠলো–মিঃ চৌধুরী– উঠুন– উঠুন
বনহুর সুইচ টিপে আলো জ্বাললো।
মিস সুইটি বলে উঠলো– আপনি!
হাঁ, আমি দেখছিলাম বাইরে কাউকে, মানে দস্যু বনহুরকে দেখা যায় কিনা। কারণ বাইরে কারো পদশব্দ আমি শুনতে পেয়েছি।
সর্বনাশ, ভাগ্যিস আপনি জেগেছিলেন, নাহলে দস্যু বনহুর আমাদের সব লুট করে নিতো। জিনিসপত্র নিক ক্ষতি নেই কিন্তু আমার যত ভয় আপামনির জন্য–
কেন? দস্যু বনহুর তোমার আপামনির কি ক্ষতি করবে বা করতে পারে?
মিঃ আলমগীর সাহেব, আপনি জানেন না, দস্যু বনহুর যদি কোনো মেয়েকে দেখে, তাকে যেমন করে হোক চুরি করে তবে ক্ষান্ত হয়।
এ কথা কে বললো তোমাকে? দস্যু বনহুর মেয়ে দেখলেই তাকে চুরি করে নিয়ে যায়?
আব্বার মুখে আমরা শুনেছি। বললো মিস সুইটি।
তাই নাকি! তাহলে এই জাহাজে দস্যু বনহুর আছে তবুও আপনি এখনও দিব্যি আরামে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছেন, কই সে তো আপনাকে কোনো রকম উপদ্রব করছেনা?
মঞ্জুর বলে উঠলো আপনি দেখছি পুলিশের লোক হয়েও দস্যু বনহুরের সম্বন্ধে গুড় আইডিয়া পোষণ করেন।
না করে যে পারিনে, সত্যিই দস্যু বনহুর অতোখানি হৃদয়হীন নয়। যাক, আপনারা শুয়ে পড়েন, আমি যতক্ষণ রয়েছি, দস্যু বনহুর আপনাদের কিছু করতে পারবেনা।
