বনহুর পিছনে হাত রেখে উদাস দৃষ্টি মেলে গভীরভাবে নূরীর কথা স্মরণ করছিলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে ফিরে তাকাতেই, বয় টেবিলে কফি রেখে গেলো।
বনহুর আবার ফিরে এসে টেবিলের পাশে সোফায় বসে পড়লো, বড় নিঃসঙ্গ একা লাগছে। খেয়ালী বনহুরের এমন নিশ্চুপতা বড় অসহ্যনীয়। সময়গুলো যেন আর কাটতে চায়না।
বনহুর সবেমাত্র কফির পেয়ালা হাতে তুলে নিয়েছে–ঠিক ঐ মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করলো মঞ্জুর; পিছনে মিস সুইটি। মঞ্জুরের হস্তে একখানা পত্রিকা।
মিস সুইটি ও মঞ্জুর ক্যাবিনে প্রবেশ করতেই বনহুর অনুমানে বুঝতে পারলো পত্রিকায় প্রদীপের ছবি দেখে ওরা ব্যস্ত হয়ে ছুটে এসেছে। বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো– ব্যাপার কি?
মঞ্জুর পত্রিকাখানা মেলে ধরলো বনহুরের সম্মুখে আপনি আমাদের মিথ্যা পরিচয় দিয়েছেন। আপনি মন্থনার রাজকুমার প্রদীপ।
মিস সুইটি বললো– পাশের মেয়েটি বুঝি আপনার মীরা?
বনহুর হেসে বললো– প্রদীপের সঙ্গে আমার চেহারার হুবহু মিল আছে বটে, কিন্তু আমি মন্থনার রাজকুমার নই।
আপনার চেহারাটা কিন্তু রাজকুমারের মতই দেখতে।
মঞ্জুরের কথায় বললো বনহুর– তাই নাকি?
সত্যি! কথাটা বললো সুইটি।
হাসলো বনহুর।
এ-কথা সে-কথার পর বিদায় গ্রহণ করলো মঞ্জুর আর সুইটি।
বনহুরও উঠে পড়লো দ্বিপ্রহরের গোসলটা সেরে নিতে হবে।
মিস সুইটি আর মঞ্জুর চলে যাবার সময় আবার স্মরণ করিয়ে দিলো বিকেলে চা-পর্বটা তাদের ওখানে সারতে হবে।
*
চায়ের টেবিলে বনহুর, মঞ্জুর আর সুইটি চা পান করতে করতে হাসি-গল্পে মেতে উঠেছে।
পাশের টেবিলে ট্রানজিস্টার রেডিও একটি ইংলিশ গান পরিবেশন করছিলো।
সুইটি নিজ হস্তে চা বানিয়েছে এ নিয়েই গল্প হচ্ছিলো। প্রথম প্রথম একবার নাকি সে তার আব্বার কয়েকজন বন্ধুকে চা তৈরি করে খাওয়াচ্ছিলো। আব্বা খুব প্রশংসা করছিলেন সুইটির, ওর হাতে চা। নাকি অমৃতের চেয়েও সুস্বাদু। সুইটি পিতার মুখে নিজ প্রশংসা শুনে গর্বে স্ফীত হয়ে উঠছিলো। খুশি মনে চা তৈরি করছিলো সে।
বয় ভুল করে চিনির পাত্রটা না এনে এনেছে লবণের বোয়াম। অবশ্য বয়ের কোনো দোষ ছিলোনা, কারণ সুইটির আম্মা কাশ্মীর গিয়ে দুটো কাশ্মীরী পট এনেছিলেন একই রকম দেখতে। সুন্দর পাত্র দুটি–তিনি একটিতে চিনি অপরটিতে লবণ ব্যবহার করতেন। বয় যে সেদিন চিনির পাত্র ভেবে লবণের পাত্রটা এনে হাজির করবে এটা সে কল্পনাও করতে পারেনি। সুইটি খুব আনন্দিত মনে চায়ে চিনির পরিবর্তে লবণ মিশিয়ে এগিয়ে দিয়েছিলো তার আব্বার বন্ধুদের সামনে। আর পরের কাহিনী বলতে গিয়ে মিস সুইটি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিলো, এবার শুরু করলো মঞ্জুর আব্বার বন্ধুগণ খুশি হয়ে মিস সুইটি রাণীর তৈরি চা পান করতে গিয়ে যেমন এক চুমুক মুখে দিয়েছেন অমনি হা- প্রত্যেক জনই থু-থু করে মুখের চা মেঝের গালিচায় ঢেলে ফেললো। আব্বা তো একেবারে থ মেরে গেছেন, ব্যাপার কি!–
আবার একটা হাসির হুল্লোড় উঠলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে রেডিওতে ঘোষণা শুরু হলো, মন্থনা দ্বীপ থেকে যে জাহাজ কান্দাই অভিমুখে রওয়ানা দিয়েছে, সেই জাহাজে ফিরে যাচ্ছে দস্যু বনহুর। যাত্রীদের সবাইকে সাবধান হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সরকার। সম্মুখে আরাকান বন্দরে পুলিশ ফোর্স অপেক্ষা করছে। বনহুর এবার ধরা পড়তে বাধ্য হবে–
ঘোষণাটা প্রচার হবার সঙ্গে সঙ্গে বনহুরের মুখোব পরিবর্তন হলো।
মিস সুইটি আর মঞ্জুরের মুখ কালো হয়ে উঠলো। মুহূর্তে ওদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো। সুইটি ভীতভাবে বললো সর্বনাশ! যে ভয় করেছিলাম, সেই ভয়ই গ্রাস করলো।
মঞ্জুর প্রায় কাদো কাঁদো সুরে বললো– মিঃ চৌধুরী, আপনি কিছুতেই আমাদের ছেড়ে যেতে। পারবেন না। এখানেই থাকতে হবে আপনাকে।
বনহুর বললো– ভয় কি, তোমাদের সঙ্গে পুলিশ তো রয়েছে, আর রয়েছে তাদের রাইফেল।
তবু ভয় হচ্ছে। সত্যি বলতে কি, দস্যু বনহুর যখন এই জাহাজে আছে তখন আর কারো রক্ষা নেই।
বনহুর একটু হাসবার চেষ্টা করে বললো– কেন, সে বাঘ না ভলুক? সেও তো মানুষ তোমার আমার মতই একজন।
হোক সে মানুষ কিন্তু সে সাধারণ মানুষের মত নয়। সে কাউকে হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করে না।
তা হয় তো করে না, তাই বলে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তিকে সে হত্যা করতে যাবে কেন?
সুইটি ধরে বসলো তাদের ক্যাবিনেই থাকতে হবে আলমগীর সাহেবকে; বিশেষ করে মঞ্জুরের বিছানায় শুতে হবে তাকে।
তখনকার মত থাকবে বলে কথা দিয়ে বিদায় গ্রহণ করলো বনহুর।
কিন্তু ক্যাবিনে ফিরে সে পায়চারী শুরু করলো, পুলিশ কি করে সন্ধান পেলো। তাহলে কি প্রদীপ জানিয়ে দিয়েছে ব্যাপারটা? না, সে কিছুতেই একথা কাউকে জানাবে না প্রদীপ প্রাণ রক্ষা পেয়েছে তার জন্য। তবে কি মীরা বলেছে ভাবীস্বামীর মুখে তার পরিচয় জানতে পেরে? বিশ্বাস কি, মীরাই হয়তো ভুল করে কাউকে ব্যাপারটা বলে ফেলেছে। তাই হবে না হলে মন্থনার কোনো প্রাণী জানে না একথা।
বনহুরের চিন্তাধারা একেবারে অমূলক নয়, মীরাই কথাটা বলেছিলো তার এক বান্ধবীর কাছে। মীরা জানতো না– তার বান্ধবী কোনো এক গোয়েন্দা পুলিশ অফিসারের ভগ্নী।
ভগ্নীর মুখে এই রহস্যপূর্ণ কাহিনী শুনে গোয়েন্দা পুলিশ অফিসার নিজেকে আয়ত্বে রাখতে পারেননি, তিনি জানিয়ে দিয়েছেন মন্থনার পুলিশ অফিসে সব কথা।
