আপনিও পুলিশের লোক, যা নিশ্চিন্ত হলাম। আমার আব্বার নাম বললে নিশ্চয় তাকে চিনতে পারবেন– পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ জাফরী।
বনহুর হো হো করে হেসে উঠলো– মিঃ জাফরীর কন্যা আপনি! তিনি আমার অত্যন্ত বন্ধু লোক।
সত্যি, আপনাকে আমাদের সঙ্গে পেয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা রইলো না।
কেন, দুশ্চিন্তা কিসের?
আপনি পুলিশ বিভাগে কাজ করেন অথচ বলছেন দুশ্চিন্তা কিসের? দস্যু বনহুরের অত্যাচারে দেশের কোনো শান্তি আছে নাকি? এই যে জাহাজে চলেছি, সব সময় মনে হচ্ছে–কখন না জানি দস্যু বনহুর–
হামলা করে বসে, তাই না? যুবতীর মুখ থেকে কথাটা কেড়ে নিয়ে বললো বনহুর।
এমন সময় একটি পনেরো-ষোল বছরের বালক দূর থেকে যুবতীটিকে দেখতে পেয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে– বড় আপা, ওখানে কি করছো?
যুবতী হাত তুলে ডাকে– চলে আয় মঞ্জুর।
বনহুর সিগারেট কেস বের করে একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে।
মঞ্জুর একরকম প্রায় ছুটেই আসে– তুমি এখানে, আর আমি তোমাকে খুঁজে ফিরছি সমস্ত জাহাজময়। আচ্ছা মেয়ে তুমি, একটু যদি ভয় থাকতো তোমার হৃদয়ে।
কেনরে কিসের ভয়?
দস্যু বনহুরের।
দস্যু বনহুর– দস্যু বনহুর, বলি এ জাহাজে সে আসবে কি করতে! শোন ভয় পাবার কিছু নেই; ইনিও পুলিশের লোক আমাদের সঙ্গেই কান্দাই পর্যন্ত যাবেন, তাছাড়া আব্বার বন্ধু-জন।
বালকটি হাস্যউজ্জ্বল মুখে তাকালো বনহুরের দিকে, আদাব দিয়ে বললো– যাহোক, আপামনিকে ধন্যবাদ, এতোবড় জাহাজটায় বেছে বেছে পুলিশের লোককে আবিষ্কার করে নিতে পেরেছেন।
বনহুর বালকটিকে লক্ষ্য করে বললো– তোমার নাম মঞ্জুর, ওর মুখে ডাক শুনেই জেনে নিতে সক্ষম হয়েছি। এবার বলোতো মঞ্জুর, তোমার আপামনির নামটা কি?
ওঃ, এতোক্ষণ শুধু আলাপই হচ্ছিলো, আসল ব্যাপারটা এখনও বাকি আছে। হাঁ শুনুন, আমার আপামনির নাম মিস সুইটি। বড়ড় মিষ্টি কিন্তু আমার আপামনি, দেখবেন আবার খেয়ে ফেলবেন না যেন।
বনহুর ছেলেটির কথা-বার্তায় বুঝতে পারলো, যেমন সুচতুর বাবা তেমনি তাঁর সন্তান। হাসলো বনহুর– তোমার আপা যেমন মিষ্টি, তুমি কিন্তু তেমনি টক–
এক সঙ্গে ওরা তিনজন হেসে উঠলো।
প্রথম পরিচয়েই এতো অল্পসময়ের মধ্যেই মিস সুইটি ও মঞ্জুরের সঙ্গে দস্যু বনহুরের ঘনিষ্ঠতা বেড়ে গেলো।
সুইটি বললো– যদিও বয়সে আপনি আমাদের চেয়ে অনেক বড় তবু একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো, মনে কিছু করবেন না নিশ্চয়ই?
মোটেই করবোনা, বলুন? বললো বনহুর।
আপনার নামটা–
ওঃ বলতে ভুলেই গেছি– তোমরা জিজ্ঞাসা করবার পূর্বেই আমার বলা উচিৎ ছিলো। আমার নাম আলমগীর চৌধুরী।
হাঁ, আমি আব্বার মুখে আপনার নাম অনেক বার শুনেছি। বিজ্ঞের মত বললো মঞ্জুর, সত্যিই যেন সে তার পিতার মুখে এ নাম অনেক বার শুনেছে।
মিঃ আলমগীর চৌধুরীকে পেয়ে মিস সুইটি ও মঞ্জুর খুশি হলো অনেক। যাহোক একটা ভরসা। পেলো ওরা মনে। পুলিশের লোক জেনে সাহসটা ওদের দশগুণ বেড়ে গেছে।
বনহুরের অবস্থাও তাই সে অবশ্য ভয়ে নয়, এই বিরাট জাহাজটায় প্রায় এক সপ্তাহকাল নিঃসঙ্গ একা কাটাতে হতো, একদিনেই মনটা কেমন হাঁপিয়ে উঠেছিলো মিস সুইটি আর মঞ্জুরকে পেয়ে ভালো হলো, তবু গল্পে-সল্প সময় কাটবে।
বনহুর প্রথমেই যুবতীর কথা-বার্তায় আশ্চর্য হয়েছিলো, কারণ যুবতী তার সঙ্গে যেভাবে আলাপ করছে তাতে মনে হচ্ছে সে যেন তার কত পরিচিত।
এবার বনহুরকে আরও অবাক করে দিয়ে বললো মিস সুইটি আজ আমাদের ক্যাবিনে আপনার চায়ের দাওয়াত রইলো।
বনহুর প্রথমে আপত্তি তুলতে যাচ্ছিলো কিন্তু মঞ্জুর বনহুরের হাত চেপে ধরলো আপনাকে ছাড়ছিনে।
বিপদে ফেললে দেখছি তোমরা। বরং আমার ক্যাবিনে তোমাদের দু’জনার দাওয়াত রইলো, বয়কে বলে দিচ্ছি।
হেসে বললো মঞ্জুর–বয়ের হাতে চা খাওয়ার চেয়ে আমার আপামনির হাতে একবার টেষ্ট করে দেখবেন। একবার যদি খান তবে আবার আপনা-আপনি দাওয়াত চেয়ে নেবেন।
তাই নাকি! বেশ, দাওয়াত কবুল করলাম। কিন্তু এখন নয়, বিকেলে।
কারণ? বললো মঞ্জুর।
বনহুর এতোটুকু বালকের কাছেও কথায় যেন টিকে উঠতে পারছিলোনা, মৃদু হেসে বললো– চা নাস্তা পর্ব শেষ করে তবেই এখানে এসে দাঁড়িয়েছি।
তখনকার মত আর বেশি কথাবার্তা হলোনা, বনহুর ওদের দুটি ভাই-বোনের কাছে বিদায় নিয়ে ফিরে এলো নিজ ক্যাবিনে।
ক্যাবিনেও কোনো কাজ নেই।
অলস দেহটা ক্যাবিনের সোফায় এলিয়ে দিয়ে টেবিল থেকে পত্রিকাখানা হাতে তুলে নিলো বনহুর। অনিচ্ছা সত্বেও দেখতে লাগলো পাতাগুলো নেড়েচেড়ে। হঠাৎ মীরা ও প্রদীপের ছবিতে নজর . পড়তেই চমকে উঠলো সে। দৃষ্টি তার স্থির হলো নীচে লেখা রয়েছে–
মন্থনার রাজ কুমার প্রদীপ গত
রাতে মন্থনায় ফিরে এসেছেন।
আগামী পূর্ণিমায় প্রদীপ কুমারের
সঙ্গে মীরা দেবীর বিয়ে সুসম্পন্ন হবে।
বনহুর ধীরে ধীরে আনমনা হয়ে যায়, প্রদীপ ফিরে পেলো তার মীরাকে, মীরা পেলো প্রদীপকে– আর বনহুর কি কোনোদিন ফিরে পাবে তার বনকন্যা নূরীকে! মৃত্যুর অসীমে যে বিলীন হয়ে গেছে, আর কি কোনোদিন পাবে সে তার সন্ধান! কোনোদিন বনহুর আর নূরীকে ফিরে পাবেনা। হাতের পত্রিকাখানা টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ক্যাবিনের মুক্ত গবাক্ষে এসে দাঁড়ালো, সেখান থেকে সম্পূর্ণ সাগরবক্ষ দেখা যাচ্ছে। শুধু জল আর জল– এতোটুকু সবুজের চিহ্ন কোথাও নেই। এমন কি আকাশে কোনো উড়ন্ত পাখিও নজরে পড়ছেনা, কারণ সাগরবক্ষ থেকে তীর কত দূরে কে জানে।
