*
হঠাৎ একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো, মীরা চোখ মেলে তাকাতেই বিস্ময়ে আড়ষ্ট হলো। এ কি! সে স্বপ্ন দেখছে না জেগে আছে, একটি নয় দু’টি প্রদীপ কুমার দাঁড়িয়ে তার শিয়রে।
বিছানায় উঠে বসলো মীরা, দু’চোখে তার বিস্ময়। অস্ফুট কন্ঠে বললো–আমি কি স্বপ্ন দেখছি।
হেসে বললো দস্যু বনহুর–মীরা, স্বপ্ন নয় বাস্তব। তুমি না একজন প্রদীপকে হারিয়েছিলে, তাই দু’জন প্রদীপকে তুমি ফিরে পেলে। কিন্তু একজন আসল অপরজন নকল। কে আসল, তুমি বেছে নাও।
২.০৭ আফ্রিকার জঙ্গলে দস্যু বনহুর
মীরা থ’ মেরে গেছে, কি আনন্দে অধীর হবে তা নয়, আড়ষ্ট হয়ে গেছে সে। আশ্চর্য নয়নে তাকাচ্ছে ওদের দু’জনার মুখে।
কিন্তু প্রদীপ কুমার আর নিশ্চুপ থাকতে পারলো না। ছুটে গেলো সে, আবেগ ভরা কণ্ঠে ডাকলো– মীরা!
মীরা কোনো জবাব দিতে পারেনা, সে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
বনহুর শান্ত-মিষ্টি কণ্ঠে বলে–মীরা, তোমার সম্মুখে যে দাঁড়িয়ে, সে-ই তোমার আসল প্রদীপ কুমার; আর আমি নকল। আমার পরিচয় জানতে পারবে তোমার প্রদীপের মুখে। মীরা, আশীর্বাদ করি, তোমরা সুখী হও– কথা শেষ করেই পাশের মুক্ত জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেলো দস্যু বনহুর।
মীরার মুখে কোনো কথা নেই, সে তাকিয়ে আছে যে পথে প্রদীপ কুমার অদৃশ্য হয়েছে।
প্রদীপ কুমার মীরাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে বললো–মীরা, যে চলে গেলো সে তোমার প্রদীপ নয়–
কে তবে?
বিশ্ববিখ্যাত দস্যু বনহুর।
দস্যু বনহুর!
হা মীরা, এতোদিন দস্যু বনহুর নাম শুনলে ঘৃণায় নাসিকা কুঞ্চিত করতাম কিন্তু আজ আমার অন্তর ভরে তাকে শ্রদ্ধা করি। দস্যু বনহুর শুধু আমার রক্ষক নয়– আমার প্রাণদাতা।
মীরা অবাক হয়ে প্রদীপের কথাগুলো শুনছিলো, বললো এবার প্রদীপ, তুমি রাতের অন্ধকারে আমাকে না বলে কোথায় পালিয়ে গিয়েছিলে?
আমি রাতের অন্ধকারে কোথাও যাইনি বা পালাইনি। যাকে তোমরা প্রদীপ বলে এতোদিন আঁকড়ে ধরে রেখেছিলে সে আমি নইদস্যু বনহুর।
তুমি নও?
না।
কিন্তু?
আমি সব শুনেছি। দস্যু বনহুর আমাকে সব বলেছে। মীরা, তুমি পবিত্র, তুমি নিষ্পাপ– নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে প্রদীপ মীরাকে।
মীরা প্রদীপের বাহুবন্ধনে নিজেকে বিলিয়ে দেয়। অসীম আনন্দে আপ্লুত হয়ে যায় ওরা।
*
জাহাজের ডেকে রেলিংএ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দস্যু বনহুর। চোখে তার পুরু কালো চশমা, ঠোঁটের ফাঁকে ধূমায়িত সিগারেট। আনমনে তাকিয়ে আছে সে সম্মুখের সীমাহীন জলরাশির দিকে।
বনহুর কান্দাই এর পথে ফিরে চলেছে।
আগের চেয়ে আজ তার মন অনেকটা হাল্কা। মন্থনার রাজ কুমার প্রদীপকে সদ্য-মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে সে, এ আনন্দ তার কম নয়। প্রদীপ কুমারকেও শুধু সে মৃত্যুর কবল থেকেই রক্ষা করেনি, মীরার পাশে তাকে ফিরিয়ে এনে দিতে পেরেছে। বনহুরের হাসি পেলো শেষ পর্যন্ত তাকে বিচারকের ভূমিকাও পালন করতে হলো। কিন্তু সবচেয়ে বনহুর বেশি আশ্চর্য হয়েছে প্রদীপের সঙ্গে তার নিজের চেহারার হুবহু মিল দেখে। মীরার কি অপরাধ আর তার নিজেরই বা দোষ কি! মীরা তাকে সচ্ছ মন নিয়ে গ্রহণ করেছিলো, নিজেকে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলো তার প্রদীপের মধ্যে। বনহুর নিজেও জানতোনা তার নিজের পরিচয়। মীরার ভালবাস তাকে মোহগ্রস্ত করে ফেলেছিলো। মীরার সান্নিধ্য তার সমস্ত হৃদয়কে করে ফেলেছিলো আচ্ছাদিত। নিজের অজান্তে বনহুর কখন যে মীরাকে ভালবেসে ফেলেছিলো, নিজেই বুঝতে পারেনি। কিন্তু বনহুর সংযত রেখেছিলো নিজেকে, মীরার পবিত্রতা সে নষ্ট করেনি কোনোদিন। আজ মীরা ফিরে পেয়েছে তার আসল প্রদীপ কুমারকে, আর বনহুর সরে এসেছে দূরে।–কিন্তু মনের কোণে একটা ব্যথার ছোঁয়া খচ্ খচ করছিলো তার।
হঠাৎ বনহুরের চিন্তাধারায় ব্যাঘাত ঘটলো, সুমিষ্ট একটি কণ্ঠস্বর– আপনি কোথায় যাবেন?
ফিরে তাকালো বনহুর, কালো চশমার ফাঁকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। একটু আশ্চর্য হলো সে। সুন্দরী একটি যুবতী তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। এক নজরে দেখে নিলো বনহুর যুবতীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত। আধুনিক সাজে সজ্জিত যুবতী, হাতে কুমীরের চামড়ার ভ্যানিটী। পায়ে লম্বা হিলওয়ালা লেডিস সু। খোঁপাটা মাথার উপরে উঁচু করে বাঁধা। চোখে কাজলের রেখা, ললাটে কুমকুমের টিপ্। সরু দু’খানা ঠোঁটে পুরু করে লিপষ্টিক লাগানো। গাড়ির রঙ বনহুরের চোখে ধরা পড়লো না কারণ তার চোখে সবই গভীর নীলাভ দেখাচ্ছে। একটু হাসবার চেষ্টা করে বললো বনহুর কান্দাই যাবো।
মেয়েটি যেন খুশি হলো বনহুরের কথায়, বললো– যাক, ভালই হলো, শেষ অবধি আপনি আমাদের সঙ্গেই রয়েছেন। আমরাও কান্দাই যাবো।
বনহুর যুবতীর সচ্ছভাব লক্ষ্য করে একটু অবাক হলো। সাধারণতঃ বাঙালি মেয়েরা হঠাৎ কোনো পুরুষের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে পারেনা। বনহুর হস্তস্থিত সিগারেটটা সাগরবক্ষে নিক্ষেপ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
যুবতী আবার বললো আমার আব্বা কান্দাই পুলিশ বিভাগে কাজ করেন। আমি ছোট ভাইয়ের সঙ্গে মন্থনা দ্বীপে মামা বাড়ি বেড়াতে এসেছিলাম। আমার মামাও মন্থনার পুলিশ ইন্সপেক্টার।
কালো চশমার আড়ালে দস্যু বনহুরের চোখ দুটো জ্বলে উঠলো বিপুল আগ্রহে। একটু হেসে বললো বনহুর–কান্দাই যাচ্ছেন, বেশতো। আমিও পুলিশ বিভাগে কাজ করি, আপনার আব্বার নামটা জানতে পারলে হয়তো চিনতে–
