আদালতকক্ষ করতালিতে মুখর হয়ে উঠলো।
জজ সাহেব পুনরায় বললেন–আসামী যদিও নিজকো প্রথম থেকেই দস্যু বনহুর বলে অস্বীকার করে এসেছে কিন্তু সে এখনও তার নিজস্ব পরিচয় আদালতের নিকটে পেশ করেনি। আমি আবার তাকে তার নিজস্ব পরিচয় দান করার জন্য বলছি।
প্রদীপ বলে উঠলো–আমি আমার পরিচয় দিতে রাজি নই।
আদালতকক্ষে একটা গুঞ্জনধ্বনি উঠলো। হয়তো সবাই জানতে চাইলো কে এই যুবক।
জজ সাহেব টেবিলে হাতুড়ীর আঘাত করে সবাইকে থামিয়ে দিলেন। তারপর বললেন– যুবক তার পরিচয় দিতে ইচ্ছুক নয়, কাজেই তাকে প্রশ্ন না করাই শ্রেয়। আসামী নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মুক্তি দেওয়া হলো।
আদালতকক্ষ আবার আনন্দ ধ্বনিতে ভরে উঠলো।
মন্থনার রাজকুমার প্রদীপ মুক্তিলাভ করার পর বেরিয়ে এলো মুক্ত আকাশের তলে। কিন্তু কোথায় যাবে সে, কান্দাই এর পথঘাট সব তার অপরিচিত।
জনতার ভীড়ে নিজকে আড়াল করে দিকহীনভাবে অগ্রসর হচ্ছিলো প্রদীপ। হঠাৎ পাশে গাড়ি থামার শব্দে ফিরে তাকালো সে। বিস্মিত হলো, জজ সাহেবের গাড়ি এসে থেমে পড়েছে তার পাশে।
প্রদীপ তাকাতেই স্বয়ং জজ সাহেব তাকে আহ্বান জানালেন–আসুন আমার গাড়িতে।
বিস্ময়ের পর বিস্ময় জাগলো প্রদীপের মনে, জজ সাহেব তাকে আহ্বান জানাচ্ছেন–কিন্তু কেনো? আবার তাকে বন্দী করা হবে?
প্রদীপকে চিন্তা করতে দেখে বললেন জজ সাহেব–চিন্তার কোনো কারণ নেই, আসুন আপনাকে আপনার স্বদেশে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবো।
এবার প্রদীপ কতকটা যেন আশ্বস্ত হলো। ধীরে পদক্ষেপে গাড়ীতে উঠে বসলো।
সেই বাড়ি।
বনহুরের শহরের আস্তানা।
জজ-বেশি দস্যু বনহুর প্রদীপ কুমার সহ বাড়িটার ভিতরে প্রবেশ করলো।
প্রদীপ সহ একেবারে আসল জজ সাহেবের কক্ষে প্রবেশ করলো বনহুর। তার দেহে তখনও জজ সাহেবের ছদ্মবেশ রয়েছে। কক্ষমধ্যে প্রবেশ করতেই জজ সাহেব বিস্ময়ে চমকে উঠলেন। ঠিক তারই মত একজন ব্যক্তিকে তার কক্ষে প্রবেশ করতে দেখে।
জজ সাহেবের বিস্ময় ঘোর কাটেনি বনহুর হেসে বললো- আপনি নিশ্চয়ই এখনও সম্পূর্ণ ব্যাপারখানা বুঝে উঠতে পারেননি। আমি সব বলছি শুনুন।
জজ সাহেব তখনও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন জজ সাহেব-বেশি দস্যু বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর বললো–প্রথম এর পরিচয় আপনার দরকার, এই যুবকই দস্যু বনহুর ভ্রমে গ্রেপ্তার হয়েছিলো এবং বিচারে তার মৃত্যু দন্ডাদেশও প্রদান করা হয়েছিলো কিন্তু সে ভুল আমি কার্যকরী হতে দেইনি। এবার বনহুর তার নিজ মুখ থেকে নকল দাড়ি গোঁফ খুলো টেবিলে রাখলো। তারপর মাথার নকল চুল খুলতে খুলতে বললো–এবং সেই কারণেই আমি বাধ্য হয়েছিলাম আপনাকে কয়েক দিনের জন্য আটকে রাখতে। কাজ সমাধা হয়েছে–এখন আপনি মুক্ত। যাকে আপনি বিচারে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন সে দস্যু বনহুর নয়–দস্যু বনহুর আমি!
এক সঙ্গে চমকে উঠলো জজ সাহেব আর প্রদীপ কুমার।
জজ সাহেব অবাক কণ্ঠে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলেন–তুমি দস্যু বনহুর!
হাঁ, আমিই দস্যু বনহুর।
প্রদীপ তখন বিস্ময় ভরা নয়নে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখে, সত্যিই সে-ও আশ্চর্য হয়ে গেছে ওর চেহারার হুবহু মিল দেখে।
বনহুর জজ সাহেবকে লক্ষ্য করে বললো–কিন্তু একটি কথা আপনি স্মরণ রাখবেন, এই ব্যাপারটা যেন কোনো সময় কাউকে জানাবেন না। মানে, আপনার ছদ্মবেশে আমি আদালতের সামনে উপবিষ্ট হয়ে আপনার কাজ করেছি। এতে আপনার কোন লাভ হবেনা বরং আপনি লোকসমাজে লজ্জিত এবং হেয় পরিগণিত হবেন। আবার আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, এ ব্যাপার নিয়ে নিশ্চুপ থাকাই আপনার মঙ্গল হবে। বনহুর পাশের কক্ষে প্রবেশ করে জজ সাহেবের ড্রেস পরিবর্তন করে ফিরে এলো–নিন, আপনি এবার পাশের ঘরে গিয়ে আপনার ড্রেস পরে নিন। আপনার গাড়ি বাইরে অপেক্ষা করছে, আমার ড্রাইভার আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে। কিন্তু সাবধান আমার ড্রাইভারের কোনো রকম ক্ষতি করার চেষ্টা করবেন না।
না না, তুমি তো আমার কোনো ক্ষতি করনি।
হাঁ, আমি আপনার কোনো ক্ষতি করিনি। নির্দোষ একটি প্রাণ অকালে যাতে নিভে না যায় তাই আমি বাধ্য হয়েছিলাম এ কাজ করতে। যান, পাশের ঘরে গিয়ে আপনি নিজ ড্রেস পরিধান করে নিন।
জজ সাহেব পাশের ঘরে চলে গেলেন।
প্রদীপ কুমার অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে, চোখে তার রাশিকৃত বিস্ময়।
বনহুর এবার ফিরে তাকালো, একটু হেসে বললো–প্রদীপ কুমার, আপনি এখন ওদিকের কুঠরীতে গিয়ে নিজকে পরিস্কার করে নিন। মানে মুখের আবর্জনাগুলো চেঁছে ফেলে, আপনার ইচ্ছামত পরিচ্ছদ পরে নিন। যান ঐ যে দরজা দেখছেন, ওটার মধ্যে সব পাবেন।
প্রদীপ কুমারের বিস্ময় এখনও কাটেনি, তবু সে চলে গেলো পাশের কুঠরীর মধ্যে।
জজ সাহেবকে তার গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এলো বনহুর।
ততক্ষণে প্রদীপ কুমার তার মুখের খোঁচা খোঁচা দাড়ি গোঁফ পরিস্কার করে নিয়ে সম্পূর্ণ কালো ড্রেস পরে ফিরে এলো।
বনহুর আনন্দধ্বনি করে উঠলো। জড়িয়ে ধরলো সে প্রদীপ কুমারকে বুকে।
বনহুর প্রদীপের মত কালো ড্রেস পরে নিলো। আয়নার সম্মুখে দাঁড়ালো ওরা দু’জন। আশ্চর্য হলো বনহুর–প্রদীপের চেহারার সঙ্গে তার চেহারা সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। হাসলো বনহুর, আপন মনেই বললো সে–মীরার কি দোষ!
