মিঃ আহম্মদ, মিঃ জাফরী এবং জেলার সাহেব সহ মনিরা অগ্রসর হলো হাঙ্গেরী কারাকক্ষের দিকে। মনিরার দু’চোখে বিস্ময়, এতোদিন হাঙ্গেরী কারাকক্ষের নাম সে শুনে এসেছে আজ স্বামীর কল্যাণে স্বচক্ষে দেখবার সৌভাগ্যলাভ তার ঘটলো। মনিরার অন্তরে আলোড়ন চলেছে, তার স্বামী আজ মৃত্যুপথের যাত্রী। আজ ৫ই জুন, ৭ই জুনে তার স্বামীর ফাঁসী হবে এই হাঙ্গেরী কারাকক্ষের এক নিভৃত কক্ষে।
মনিরার বুক ফেটে গেলেও সে মুখোভাবে বেদনা বয়ে আনলোনা। অতি কষ্টে নিজকে সংযত রেখে এগুতে লাগলো পুলিশ অফিসারত্রয়ের সঙ্গে।
পরপর অনেকগুলি ফটক পেরিয়ে এগিয়ে চললো তারা। প্রত্যেকটা ফটকে চারজন করে রাইফেলধারী পুলিশ দন্ডায়মান। চারিদিক শুধু পুলিশ আর পুলিশ। প্রত্যেক পুলিশের হস্তে আগ্নেয় অস্ত্র।
প্রায় বারোটি তালাযুক্ত কক্ষ পেরিয়ে একটি লৌহদরজা বিশিষ্ট কক্ষের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন জেলার সাহেব, মিঃ আহাম্মদ ও মিঃ জাফরীও দাঁড়ালেন পাশাপাশি।
মনিরাও তাদের সম্মুখে রয়েছে।
জেলার সাহেব স্বয়ং কারাকক্ষের দরজা মুক্ত করলেন।
মনিরার বুকটা তখন ধক ধক করছিলো। তার মনে হচ্ছিলো–নাজানি কি অবস্থায় আজ স্বামীকে সে দেখবে। মনিরা অতি কষ্টে নিজকে সংযত রেখে পুলিশ অফিসারত্রয়ের পিছনে কারাকক্ষে প্রবেশ করলো। পা দু’খানা যেন পাথরের মত ভারী মনে হচ্ছিলো তার। স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে কিন্তু মনে এতোটুকু শান্তি পাচ্ছে না সে। সম্মুখে তাকাতে সাহস হচ্ছিলো না মনিরার। কারাগারে বন্দী অবস্থায় তাকে কেমন দেখায় কোনোদিন দেখেনি, ভয় হচ্ছিলো–যদি সে স্বামীকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়ে, কিছুতেই যদি নিজকে সংযত রাখতে না পারে তখন কি হবে। সে একজন সাধারণ বন্দীর স্ত্রীর মত আকুল হয়ে কাঁদবে! না না তা হয় না, নিজকে মনিরা কঠিন করে নিলো।
মিঃ জাফরীর কথায় চোখ তুললো মনিরা।
মিঃ জাফরী মনিরাকে লক্ষ্য করছিলেন, বললেন–চোখ তুলুন মিসেস মনিরা।
মনিরা চোখ তুললো, সম্মুখে দৃষ্টি পড়তেই দু’পা এগিয়ে গেলো, কিন্তু পরমুহূর্তেই থেমে। পড়লো সে।
মিঃ জাফরী মিঃ আহম্মদ এবং জেলার সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন।
বন্দী যুবক মনিরার দিকে অপরিচিত দৃষ্টি নিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে। মনিরাও নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে, তার চোখে যেন রাজ্যের বিস্ময়।
কিছুক্ষণ কেটে গেলো, কারো মুখে কোনো কথা নেই।
এবার মিঃ জাফরী বললেন মিসেস মনিরা, আপনার স্বামীকে চিনতে কষ্ট হচ্ছে আপনার?
মনিরার দৃষ্টি এবার ফিরে গেলো মিঃ জাফরীর মুখে, স্থির কণ্ঠে বললো মনিরা আমি জানতাম আমার স্বামী কোনদিন মৃত্যুকালে তার পরম জনকে দেখতে চাইবেন না। যাকে আমার স্বামী বলে আপনারা মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেছেন সে আমার স্বামী নয়।
এক সঙ্গে সবাই তাকালো বন্দী যুবকের দিকে, তারপর মনিরার দীপ্ত উজ্জ্বল মুখের দিকে।
মনিরা বললো–বিনা দোষে আপনারা এক নিরপরাধ জনকে হত্যা করতে যাচ্ছিলেন, আশ্চর্য আপনাদের দৃষ্টিবল। আজ এই যুবকের চেহারা যদিও হুবহু আমার স্বামী দস্যু বনহুরের মত, কিন্তু তার কি ললাটের পাশে কোনো তিল ছিলো?
এতোক্ষণে মিঃ আহম্মদ এবং মিঃ জাফরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালেন বন্দী যুবকের ললাটে। তাই তো বন্দীর ললাটের বামপাশে একটি তিল আছে, বনহুরের এমন কোনো তিল ছিলো না।
মনিরা বললো আবার–এ যুবক আমার স্বামী নয়। আমার স্বামীর দক্ষিণ বাহুতে একটি বড় জট চিহ্ন আছে।
সঙ্গে সঙ্গে মিঃ জাফরী বন্দী যুবকের দেহ থেকে জামাটা খুলে ফেলার জন্য বললেন।
যুবক কথামত জামা খুলে ফেললো তার দেহ থেকে। শুধু মনিরাই নয়, আর সবাইও দেখলো–তার দক্ষিণ বাহুতে কোনো রকম জট চিহ্ন বা ঐ ধরনের কোনো কিছু নেই।
মনিরার মুখোভাব আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, বন্দী যুবক তার স্বামী নয়। তার স্বামী তাহলে গ্রেপ্তার হয়নি। বললো মনিরা–এবার যেতে পারি?
হাঁ চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। মিঃ জাফরী বললেন।
মনিরা বেরিয়ে এলো কারাগার কক্ষ হতে।
অদূরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন সরকার সাহেব।
মনিরা দীপ্ত উজ্জ্বল আনন্দভরা মুখে গাড়ির দিকে অগ্রসর হলো।
*
পরদিন।
আদালত কক্ষের বাইরে আজ লোকে লোকারণ্য। এতোটুকু তিলমাত্র স্থান নেই সম্মুখস্থ। ময়দানটায়। কক্ষমধ্যেও তেমনি ভীড়।
জজ সাহেব আসনে উপবিষ্ট।
ডায়াসের পাশে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সেই বন্দী যুবক, যাকে মিঃ আহম্মদ দস্যু বনহুর ভ্রমে গ্রেপ্তার করেছিলেন। ৭ই জুন যার মৃত্যুদন্ডাদেশ ঘোষণা হয়েছিলো। মন্থনার রাজকুমার প্রদীপ আজ কান্দাই বিচারালয়ে আসামীর কাঠগড়ায় দন্ডায়মান।
বিচারকক্ষে প্রতিটি লোক তাকিয়ে আছে আসামীর দিকে। সকলেরই চোখে মুখে বিস্ময়, দস্যু বনহুর এ নয় কিন্তু তাকে দস্যু বনহুর ভ্রমে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো।
বিচারকক্ষ নীরব।
সম্মুখস্থ আসনগুলিতে বসে আছে শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ। মিঃ আহম্মদ, মিঃ জাফরী এবং অন্যান্য পুলিশ অফিসারগণ।
কক্ষমধ্যে একটা থমথমে ভাব বিরাজ করছে।
জজ সাহেব এবার গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন-আদালত বন্ধ থাকায় আমি দু’দিন কান্দাই এর বাইরে গিয়েছিলাম কোনো এক জরুরি কাজে। আজ ফিরে এসে জানতে পারলাম মিঃ আহম্মদ এবং মিঃ জাফরী তাদের বন্দী আসামী সম্বন্ধে সনাক্ত কাজ শেষ করেছেন। কারণ আসামী দস্যু বনহুর নয়।
