মিঃ আহম্মদ এবং মিঃ জাফরী কারাগারের এক পাশে সরে গিয়ে দাঁড়ালেন।
মিঃ জাফরী বললেন–স্যার, আমার বিশ্বাস–এ ব্যক্তি দস্যু বনহুর নয়। তবে দস্যু বনহুরের সঙ্গে এর চেহারা এবং কণ্ঠস্বরে অদ্ভুত মিল আছে। যার জন্য আমাদের এ ভুল হয়েছে।
মিঃ জাফরীর কথায় মিঃ আহম্মদের জ কুঞ্চিত হলো, তিনি বললেন–মিঃ জাফরী, আপনি জানেন দস্যু বনহুর কত বড় দুর্দান্ত। সে যে কোনো সময় নিজের রূপ পাল্টাতে অদ্বিতীয়। এ ব্যক্তি দস্যু বনহুর নয় প্রমাণ করার পূর্বে তাকে আরও ভালভাবে সনাক্ত করা দরকার।
মিঃ জাফরী কিছু ভাবলেন, তারপর বললেন–স্যার, এখন চলুন, আবার বিকেলে আসবো।
কারাকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন পুলিশ নায়কদ্বয়।
গাড়িতে বসে বললেন মিঃ জাফরী–স্যার, একবার চৌধুরী বাড়ি যেতে হবে।
চৌধুরী বাড়ি, মানে?
দস্যু বনহুরের স্ত্রী মনিরা দ্বারা তার স্বামীকে সনাক্ত করতে হবে।
ঠিক বলেছেন মিঃ জাফরী, অদ্ভুত আপনার বুদ্ধিবল!
কিন্তু প্রকাশ্যে তাকে জানতে দেওয়া হবে না যে তার দ্বারা আমরা তার বন্দী স্বামীকে সনাক্ত করতে নিয়ে যাচ্ছি। তাকে জানানো হবে তার স্বামীর মৃত্যুদন্ডের পূর্বে তাকে শেষবারের মত তার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
অতি উত্তম। বেশ, সেইভাবেই কাজ করা হবে। তাহলেই বোঝা যাবে সব।
হাঁ স্যার, স্ত্রী কোনোদিন স্বামীকে চিনতে ভুল করবে না।
ঠিক বলেছেন, স্ত্রী আর জননী এই দু’জন তাদের আপন স্বামী এবং সন্তানকে কখনও চিনে নিতে ভুল করেননা।
ড্রাইভারকে চৌধুরী বাড়ি যাওয়ার জন্য বললেন মিঃ আহম্মদ।
গাড়িখানা কালাবাগ রোড দিয়ে দ্রুত অগ্রসর হলো জান্নবী রোডের দিকে। হাঙ্গেরী রোড ছেড়ে চলে এসেছে অনেক দূরে।
চৌধুরী বাড়ির গেটে গাড়ি পৌঁছতেই সরকার সাহেব পুলিশ অফিসারদ্বয়কে অভ্যর্থনা করে হলঘরে নিয়ে বসালেন। ভদ্র মহোদয় দু’জনকে বসিয়ে ছুটলেন তিনি উপরে, বেগম সাহেবা আর মনিরাকে জানালেন পুলিশ অফিসারদ্বয়ের আগমনবার্তা।
অফিসারদ্বয়ের আগমন-সংবাদ শুনে আশ্চর্য না হলেও আশঙ্কিত হলেন মরিয়ম বেগম, না জানি আবার কোনো ব্যাপার নিয়ে এসেছেন তারা।
কিন্তু মনিরা নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত স্থির।
সরকার সাহেবকে লক্ষ্য করে বললো মনিরা–চলুন আমি যাচ্ছি।
মরিয়ম বেগম বাধা দিয়ে বললেন–মনিরা, তুমি অপেক্ষা করো, আমি বরং শুনে আসি।
মনিরা বললো–মামীমা, এ তুমি কি বলছো আজ? কোনোদিন তুমি কারো সঙ্গে দেখা করতে যাওনা, আর….।
মা, আবার কি অভিসন্ধি নিয়ে যে তারা এসেছেন কে জানে। আমার কিন্তু ভয় হচ্ছে।
গম্ভীর গলায় বললো মনিরা–কোনো চিন্তা করোনা মামীমা, বিপদের সঙ্গে মোকাবেলা করে আমি শক্ত হয়ে গেছি। আমার স্বামী আজ মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত, ভয় কাকে বলে জানিনে। স্বামীর জন্য আমি সব কিছু করতে প্রস্তুত আছি!
ওঁনারা কেন এসেছে কিছুই তো জানিসনে মা?
জানিনে, তবে জানবার জন্যই যাচ্ছি। চলুন সরকার সাহেব। মনিরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলো, সরকার সাহেব অনুসরণ করলেন তাকে।
মনিরা কক্ষে প্রবেশ করে সোজা মিঃ জাফরী ও মিঃ আহম্মদের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো– বলুন, অসময়ে কি প্রয়োজন আমার কাছে আপনাদের?
মিঃ জাফরী বললেন–বসুন মিসেস মনিরা!
বসতে হবে না, বলুন?
মিসেস মনিরা, আপনি জানেন–আপনার স্বামী হাঙ্গেরী কারাগারে আবদ্ধ। শুধু আবদ্ধই নয় তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণা করা হয়েছে।
শুনেছি, কিন্তু আপনারা কি কষ্ট করে আমাকে ঐ সংবাদ জানাতেই এসেছেন?
শুধু ঐ সংবাদ জানানোর জন্যেই আমরা আসিনি। হাজার হলেও আপনি তার স্ত্রী। দস্য বনহুরকে মৃত্যুদন্ড দেবার পূর্বে তাকে আমরা অনুরোধ করেছিলাম কাউকে সে দেখতে চায় কিনা।
আমার স্বামী তাহলে আমাকেই দেখবেন বলে জানিয়েছেন?
হাঁ, ঐ রকম বাসনা সে করেছে।
বেশ, আমি যাবো। কিন্তু আমি জানি–আমার স্বামী কোনো সময় কাউকে শেষ বারের মত দেখতে চান না। মনিরা এবার সরকার সাহেবকে বললেন ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলুন। চলে গেলো মনিরা। মিঃ আহম্মদ এবং মিঃ জাফরী একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিলেন।
অল্পক্ষণ পর মনিরা তৈরি হয়ে ফিরে এলো, মিঃ জাফরী এবং মিঃ আহম্মদকে লক্ষ্য করে বললো–চলুন।
গাড়ি-বারেন্দায় সরকার সাহেব গাড়ি নিয়ে মনিরার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে পুলিশ কার।
মনিরা এবং পুলিশ অফিসারদ্বয় এসে পৌঁছলেন।
মনিরা গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে ধরলো, মনিরা উঠে বসতেই সরকার সাহেব ড্রাইভ আসনের পাশের সীটে উঠে বসলেন।
অফিসারদ্বয় উঠে বসলেন তাদের পুলিশ কারে।
হাঙ্গেরী কারাগারে পৌঁছতে সম্পূর্ণ দিনটাই লেগে গেলো তাদের। সন্ধ্যার পূর্বে তারা পৌঁছলো হাঙ্গেরী কারাগারের লৌহফটকের মধ্যে। পুলিশ অফিসারদ্বয় থাকায় পুলিশগণ মনিরাদের গাড়িও ছেড়ে দিলো বিনা আপত্তিতে।
হাঙ্গেরীর প্রাচীর ঘেরা ময়দানে গাড়ি রেখে নেমে পড়লেন মিঃ আহম্মদ এবং মিঃ জাফরী। মনিরাকেও নামার জন্য তারা অনুরোধ করলেন।
মনিরা এবং সরকার সাহেব নেমে পড়লেন।
মিঃ জাফরী বললেন–মিসেস মনিরা, শুধু আপনিই যেতে পারবেন।
মনিরা সরকার সাহেবকে লক্ষ্য করে বললো–সরকার চাচা, আপনি অপেক্ষা করুন। চলুন ইন্সপেক্টার সাহেব।
