জজ সাহেব তিনখানা চিঠি পাশাপাশি মেলে ধরে নিপুণ দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগলেন, তারপর গুরু-গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–হাঁ, আপনার অনুমান সত্য। এই তিনখানা চিঠি একই হস্তের লিখা। প্ৰথমখানা লিখা হয়েছে আমাকে, দ্বিতীয়খানা মিঃ আহম্মদকে, আর তৃতীয়খানা এক বছর পূর্বে মিঃ জাফরীকে।
বিচারকক্ষ নীরব নিস্পন্দ। প্রত্যেকেই বিপুল আগ্রহে তাকিয়ে আছে জজ সাহেবের মুখে। দস্যু বনহুরের মৃত্যুদন্ডাদেশের পর হঠাৎ এই অভিনব চিঠির উদ্ভব!
জজ সাহেব প্রথম চিঠিখানা হাতে তুলে নিয়ে উচ্চকণ্ঠে বললেন–এই চিঠিখানা দস্যু বনহুর আমাকে লিখেছে। আমি পড়ে শোনাচ্ছি। চিঠিখানা পড়তে শুরু করলেন–
“সম্মানিত বিচারপতি আপনি সুদক্ষ বিচারক হয়ে এত বড় ভুল করে গেছেন যা অতি অসত্য। যাকে। আপনি দস্যু বনহুর ভ্রমে মৃত্যুদন্ডাদেশ। দিয়েছেন সে দস্যু বনহুর বা তার কোনো অনুচর নয়। কাজেই তাকে। পুনরায় ভালভাবে সনাক্ত করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।
আপনাদের মঙ্গলপ্রার্থী
–দস্যু বনহুর।“
প্রথম চিঠিখানা পড়া শেষ হলে ভাঁজ করে রেখে দ্বিতীয় চিঠিখানা তুলে নিলেন জজ সাহেব হাতে।
বিচারকক্ষ মধ্যে একটা গুঞ্জনধ্বনি উঠেছে, সকলেই বিস্ময়ভরা কণ্ঠে একে অপরকে বলছেন, “দস্যু বনহুর তাহলে মুক্ত আছে!” বহু লোকের মিলিত কণ্ঠে কক্ষটা গম গম করে উঠলো।
জজ সাহেব টেবিলে আঘাত করে সবাইকে চুপ হবার জন্য নির্দেশ দিলেন।
আবার বিচারকক্ষ নীরব হলো।
জজ সাহেব এবার দ্বিতীয় চিঠিখানা সম্মুখে মেলে ধরে বললেন–এটা লিখা হয়েছে পুলিশ সুপার মিঃ আহম্মদের নিকটে। আমি পড়ছি–
“মিঃ আহম্মদ, আপনি অভিজ্ঞ পুলিশ হয়ে এতো বড় একটা সাংঘাতিক ভুল করেছেন। ভাবতেও আমার হাসি পায়। দস্যু বনহুরকে আপনি বহুবার দেখা সত্বেও এমন ভুল করা আপনার মত বিজ্ঞজনের শোভা পায় না। যাকে আপনি মন্থনা দ্বীপের পূর্ব দক্ষিণ বনাঞ্চলে গ্রেপ্তার করেছেন সে দস্যু বনহুর নয়। একজন নিরপরাধী, দস্যু বনহুর ভ্রমে মৃত্যু বরণ করলে আমি তা সহ্য করতে পারবো না। কাজেই সাবধান”… –
দস্যু বনহুর”
চিঠি দু’খানা পড়া শেষ করে তাকালেন জজ সাহেব দন্ডায়মান মিঃ জাফরীর মুখে, তারপর বললেন–যতদূর সম্ভব মনে হচ্ছে দস্যু বনহুর এখনও মুক্ত রয়েছে। এ চিঠি দু’টি যে দস্যু। বনহুরের হস্তের লিখা তা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে।
মিঃ জাফরী বললেন–মাইলড়, আমারও সেই রকম মনে হচ্ছে। তাছাড়া বন্দীব্যক্তি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সব সময় নিজকে দস্যু বনহুর বলে অস্বীকার করে এসেছে।
জজ সাহেব পুনরায় বললেন আমার মতে যে ব্যক্তি দস্যু বনহুরকে ভালভাবে চেনেন তিনি। সনাক্ত করবেন।
বিচারকক্ষে আবার গন্ডগোল হলো।
জজ সাহেব আবার টেবিলে রোলারের আঘাত করে থামিয়ে দিলেন।
সেদিনের মত বিচারসভা ভঙ্গ হলো।
জজ সাহেব তার গাড়িতে গিয়ে বসলেন।
ড্রাইভার গাড়ি ছাড়লো।
মিঃ আহম্মদ, মিঃ জাফরী ও আরও দু’চারজন অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসার দস্যু বনহুরের কারাকক্ষের দরজায় উপস্থিত হলেন।
মিঃ আহম্মদ মিঃ জাফরীকে লক্ষ্য করে বললেন–মিঃ জাফরী, আপনিই আমার চেয়ে বেশি দস্যু বনহুরকে চেনেন, কাজেই আপনি সনাক্ত করবেন।
ইয়েস স্যার, আমি তাকে ভালভাবে লক্ষ্য করলেই চিনতে পারবো। বললেন জাফরী।
দস্যু বনহুরের কক্ষের দরজা মুক্ত করা হলো। কক্ষে প্রবেশ করলেন মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী। পুলিশ অফিসারদ্বয় কারাকক্ষে প্রবেশ করতেই করাকক্ষের লৌহদরজা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেলো। মিঃ আহম্মদ এবং মিঃ জাফরী উন্মুক্ত রিভলভার হস্তে বন্দী যুবকের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন।
বন্দী যুবক তখন মেঝেতে এক পাশে দেয়ালে ঠেশ দিয়ে বসে আছে, মুখমন্ডল মলিন বিবর্ণ ফ্যাকাশে, চোখ দুটো বসে গেছে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি জন্মেছে। চুলগুলো এলোমেলো তৈলহীন। তবুও যুবকের চেহারা সুন্দর সুঠাম দৃষ্টিতে এক মোহময় চাহনী। প্রশস্ত ললাট দ্বীপ্ত উজ্জ্বল। দস্যু বনহুরের চেরারার সঙ্গে হুবহু মিল যুবকের।
মিঃ জাফরী এবং মিঃ আহম্মদ রিভলভার ঠিক রেখে তার পাশে দাঁড়ালেন।
বন্দী যুবক উঠে দাঁড়ালো।
মিঃ আহম্মদ বললেন–দস্যু, আর দু’দিন পর তোমার মৃত্যু।
ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালো যুবক মিঃ আহম্মদের দিকে, কিছু বলতে চাইলো কিন্তু পারলোনা।
মিঃ আহম্মদ আবার বললেন–মৃত্যুর পূর্বে তুমি কাকে দেখতে চাও? বলো শেষবারের মত তাকে আমরা তোমার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেবো।
মিঃ আহম্মদ যখন বন্দীকে পর পর প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন তখন মিঃ জাফরী তীক্ষ্ণভাবে বন্দীর মুখোভাব লক্ষ্য করছিলেন। তিনি আরও কয়েকবার বনহুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলাপ করবার সুযোগ পেয়েছেন, কাজেই আজ তিনি বন্দীর মুখোভাবে তাকে সনাক্ত করার চেষ্টা করছিলেন। মিঃ। জাফরী জানেন– দস্যু বনহুর কোনো সময় ভীতভাব প্রকাশ করতে জানেনা। যত বিপদই আসুক তার চোখেমুখে এক হিংস্র ভাব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।
মিঃ আহম্মদের প্রশ্নে বন্দী ঢোক গিলে বললো–আমি দস্যু বনহুর নই। তাকে আমি কোনোদিন চোখে দেখিনি। বিনা অপরাধে আমার মৃত্যুদন্ড হলে আমি ঈশ্বরের নিকটে অভিযোগ করবো। আমাকে আপনারা যা খুশি করুন, চাইনে আমি কাউকে দেখতে বা কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।
এবার মিঃ জাফরী বললেন–স্যার, ওদিকে চলুন।
