তাহলে যে ব্যক্তি এখন হাঙ্গেরী কারাগারে আছে সে সুনিশ্চিত দস্যু বনহুর, তাতে কোনো সন্দেহ নেই?
না!
সে যদি দস্যু বনহুর না হয়?
উপযুক্ত প্রমাণ পেলে তাকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু যাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে–সে দস্যু বনহুর।
বেশ, আপনি আমার বিশ্রামকক্ষে কয়েকদিন বিশ্রাম করুন। তারপর আপনি মুক্তি পাবেন। এখানে আপনার কোনো অসুবিধা হবেনা। আসুন, পাশের কক্ষে আপনি থাকবেন,
বনহুর দক্ষিণ পাশের দেয়ালে একটা সুইচ টিপতেই দেয়ালটা ফাঁক হয়ে গেলো। বনহুর ভিতরে প্রবেশ করে আলো জ্বাললো। তারপর ডাকলো সে–আসুন এখানে।
জজ সাহেব বনহুরের কথামত কক্ষমধ্যে প্রবেশ করলেন। সুন্দর সুসজ্জিত বেড রুম, এক পাশে খাট, মাঝখানে টেবিল, পাশে একটা চেয়ার। সেলফে সাজানো নানা রকম বই।
এ কক্ষেই দস্যু বনহুর তার প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের সম্মানে আটকে রাখে।
জজ সাহেবকে আরও কয়েকটা মূল্যবান প্রশ্ন করার পর বনহুর বললো–আপনি এবার আপনার পরিচ্ছদ ত্যাগ করুন, ঐ ধারের আলমারীতে আপনার জন্য বিভিন্ন রকম পোশাক রয়েছে। ইচ্ছামত আপনি যা খুশি ব্যবহার করতে পারেন। একটু থেমে বললো–আপনার এই ড্রেসটা আমার এই মুহূর্তে প্রয়োজন। কিছু মনে না করে যদি খুলে দেন তাহলে আমি উপকৃত হবো।
জজ সাহেব দেখলেন,ওর কথামত কাজ না করে কোনো উপায় নেই। কাজেই তিনি পাশের আলমারী থেকে পাজামা আর পাঞ্জাবী বেছে নিলেন।
বনহুর বললো আবার–ওদিকে ছোট্ট কুঠরী আছে, আপনি ড্রেস পরিবর্তন করে আসুন।
জজ সাহেব দেখলেন, একটা দরজা রয়েছে ওদিকে বাথরুম হবে। তিনি কাপড়গুলি হাতে নিয়ে প্রবেশ করলেন পাশের রুমে, দেখলেন কক্ষটা বাথরুমই বটে! সুন্দরভাবে আলো এবং পানির ব্যবস্থা রয়েছে। দেওয়ালে বেলজিয়াম আয়না, সাবান, তোয়ালে, চিরুণী, সেভের যন্ত্রপাতি–সব আছে তার মধ্যে।
জজ সাহেব তার পরিচ্ছদ ত্যাগ করে পরে নিলেন পাজামা আর পাঞ্জাবী। ঠিক মাপমত না হলেও একটুও অসুবিধা হলোনা।
বনহুর জজ সাহেবের পরিচ্ছদ হস্তে বিদায় গ্রহণ করলো। যাবার সময় বললো–যখন। আপনার যা প্রয়োজন হবে, কলিং বেল টিপূবেন আমার লোক আসবে, তাকে জানাবেন।
বনহুর বড় কক্ষটার পূর্বদিকের দেয়ালের পাশে এসে একটা সুইচে চাপ দিলো, সঙ্গে সঙ্গে এ পাশেও বেরিয়ে এলো ঐরকম একটা দরজা–যেমন দক্ষিণ পাশের দেয়ালে। বনহুর এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো কক্ষমধ্যে। কক্ষটিতে প্রবেশ করতেই আলো জ্বলে উঠলো, তীব্র উজ্জ্বল আলো। বনহুরের ছদ্মবেশ ধারণের কক্ষ এটা। দেয়ালের চারপাশে আয়না, মাঝে মাঝে টেবিল বসানো রয়েছে, প্রত্যেকটা টেবিলে ছদ্মবেশের নানা-রকম আসবাবপত্র।
বনহুর কিছুক্ষণের মধ্যে নিজকে সম্পূর্ণ জজ সাহেবের রূপে সজ্জিত করে নিলো। নিজেই নিজকে দেখে অবাক হলো, এতোটুকু ভুল হয়নি কোথাও। জজ সাহেবের পোশাকটা একটু আটসাট হচ্ছিলো কিন্তু কোনো অসুবিধা হলোনা।
এবার বনহুর ঠিক প্রৌঢ় জজ সাহেব বনে গেছে!
বনহুর কলিং বেলে হাত রাখতেই দরজায় এসে দাঁড়ালো একজন অনুচর, প্রথম তাদের সর্দারকে চিনতে না পেরে ক্রুদ্ধ মূর্তি ধারণ করলো, রাইফেল উদ্যত করে ধরলো সে, দু’চোখে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে।
বনহুর তার দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করে ধরলো।
বনহুরের হস্তে একটি চিহ্নযুক্ত অংগুরী ছিলো। সে যখন ছদ্মবেশ ধারণ করতো তখন তার আংগুলে ঐ চিহ্নযুক্ত অংগুরী পরতো। কারণ সেই অংগুরী দেখামাত্র তার লোক তাকে চিনতে পারতো।
অনুচরটির দৃষ্টি বনহুর হস্তের আংগুলের অংগুরীতে পড়তেই উদ্যত রিভলভার নত করে নিয়ে কুর্ণিশ জানালো। বনহুর বললো তাকে লক্ষ্য করে–কাসেমকে পাঠিয়ে দাও।
চলে গেলো অনুচরটি, অল্পক্ষণেই এলো কাসেম। প্রভুকে তার চিনতে বিলম্ব হলো না, বললো সে–সর্দার, আদেশ করুন?
এই কক্ষে মেঝেতে যে ড্রাইভারের ড্রেস পড়ে রয়েছে সেই ড্রেস দ্রুত পরে নাও, জজকোর্টে যেতে হবে।
কাসেম দ্বিতীয়বার কোনো প্রশ্ন না করে কক্ষমধ্যে প্রবেশ করলো। যদিও কাসেমের কাছে সব আশ্চর্য লাগছিলো তবু নীরবে সর্দারের আদেশ পালন করে গেলো। অল্প সময়ের মধ্যেই। কাসেম ড্রাইভারের ড্রেসে সজ্জিত হয়ে বেরিয়ে এলো।
জজ সাহেবের বেশে দস্যু বনহুর আর ড্রাইভারবেশী কাসেম এসে দাঁড়ালো গাড়িখানার পাশে।
আদালত কক্ষ।
ডায়াসের ওপাশে উচ্চ আসনে জজ সাহেবের বেশে উপবিষ্ট স্বয়ং দস্যু বনহুর। চোখেমুখে তার সুস্পষ্ট বার্ধক্যের ছাপ।
শহরের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ কক্ষমধ্যে নিজ নিজ আসনে বসে আছেন। সকলেরই চোখে মুখে একটা ভয়ঙ্কর উন্মাদনা। বিচারকক্ষ নীরব।
ডায়াসের সম্মুখস্থ আসনে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে উপবিষ্ট মিঃ আহম্মদ এবং আরও কয়েকজন পুলিশ অফিসার। মিঃ জাফরী দন্ডায়মান, তাঁর হস্তে দু’খানা চিঠি। তিনি চিঠি দু’খানা অত্যন্ত মনোযোগে দেখছিলেন।
কক্ষস্থ সকলের দৃষ্টি মিঃ জাফরীর মুখে সীমাবদ্ধ।
মিঃ জাফরী বেশ কিছুক্ষণ চিঠি দু’খানা লক্ষ্য করে বললেন–এ চিঠি দু’খানা একই হাতের লিখা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবার তিনি নিজ পকেট থেকে একখানা ছোট্ট পুরোন চিঠি বের করে মেলে ধরলেন হস্তস্থিত চিঠি দু’খানার পাশে, তারপর বললেন–এক বছর আগে দস্যু বনহুরের লিখা এই চিঠি। মিঃ জাফরী এবার তার হাতের তিনখানা চিঠিই এগিয়ে দিলেন জজ সাহেবের টেবিলে–মাইলর্ড, আমি সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহে বলছি এই তিনখানা চিঠি একই হস্তের লিখা এবং দস্যু বনহুরের হস্তের তাতে কোনো ভুল নেই।
