বনহুর চাপা কণ্ঠে বললো–আমি কে একটু পরে বলবো!
আমাকে এভাবে তুমি কোথায় নিয়ে চলেছো?
একটু অপেক্ষা করুন, সব টের পাবেন। কিন্তু মনে রাখবেন একটু টু শব্দ করলেই মরবেন। আমি আপনার সাথে কোনো অন্যায় করবো না।
জজ এতোকাল কত শত শত ব্যক্তির ভাগ্য নিয়ে গবেষণা করে এসেছেন, আজ তার নিজের ভাগ্যে এও ছিলো! বুদ্ধিমান জজ সাহেব নিশ্চুপ থাকাই বাঞ্চনীয় মনে করলেন। কারণ চিৎকার করে কোনো ফল হবে না, শেষ পর্যন্ত মৃত্যুও ঘটতে পারে, কাজেই তার আসনে চুপ করে বসে রইলেন।
অল্পক্ষণের মধ্যেই একটি বিরাট বাড়ির সম্মুখে এসে পৌঁছলো তাদের গাড়ি, আশেপাশে কোনো বাড়ি নেই। ড্রাইভারবেশী বনহুর ড্রাইভ আসনে বসেই নিজের মাথার ক্যাপটা খুলে, দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে ইংগিৎ করলো।
দারওয়ান বনহুরকে দেখতে পেয়ে মুহূর্তে চিনে নিলো, এবং সঙ্গে সঙ্গে কুর্ণিশ করে সোজা গিয়ে দাঁড়ালো।
বনহুর গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির দরজা খুলে ধরলো–নেমে আসুন।
জজ সাহেব বাধ্য হলেন নেমে পড়তে।
দারওয়ান ফটক ধরলো, বনহুর আর জজ সাহেব প্রবেশ করলো ভিতরে।
এ বাড়ি দস্যু বনহুরের শহরের আস্তানা।
অনুচরগণ বহুদিন পর প্রভুকে ফিরে আসতে দেখে আনন্দে আপুত হলো। সবাই কুর্নিশ জানিয়ে অভিনন্দন জানাতে লাগলো। সকলের মনেই প্রশ্ন তাদের সর্দার এতদিন কোথায় ছিলেন, কিন্তু কেউ জিজ্ঞাসা করার সাহসী হলো না।
বনহুর জজ সাহেব সব পর পর কয়েকখানা কক্ষ পার হয়ে একটা কক্ষের সম্মুখে এসে, দাঁড়ালো। কক্ষের দরজা ভিতর হতে বন্ধ, বাইরে কোনো তালা-চাবি বা ঐ ধরণের কোনো জিনিস নেই। বনহুর ওদিকে একটা সুইচে হাত রাখতেই দরজা আপনা হতে খুলে গেলো। জজ সাহেবকে লক্ষ্য করে বললো বনহুর–আসুন ভিতরে।
জজ সাহেব দ্বিধা করছিলেন, বনহুর হেসে বললো–ভয় নেই, আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।
জজ সাহেব বনহুরের সঙ্গে কক্ষমধ্যে প্রবেশ করলেন, আশ্চর্য হলেন এবার, কক্ষটা কোনো হলঘর বলে মনে হলো, কক্ষমধ্যে নীলাভ আলো জ্বলে উঠেছে দরজা খুলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে। জজ সাহেব দেখলেন, মেঝেতে সুন্দর দামী গালিচা বিছানো রয়েছে। মূল্যবান সোফাসেট থরে থরে সাজানো। মাঝখানে একটা মার্বেল পাথরের গোল টেবিল। টেবিলে কয়েকটা এ্যাসট্রে। একটা বড় ফুলদানীও রয়েছে টেবিলের মাঝখানে।
দেয়ালে কয়েকখানা ছবি, কিন্তু কোনো ব্যক্তির নয়। সব ক’ খানাই হিংস্র জন্তুর তৈলচিত্র।
জজ সাহেব আরও অবাক হলেন–একটা আসন, ঠিক সিংহের মুখাকৃতি। সিংহের চোখ দুটো ঠিক জীবন্ত সিংহের ন্যায় জ্বলজ্বল করছে।
বনহুর সেই আসনের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর সিংহের দক্ষিণ চোখে আঙ্গুলের চাপ দিলো, সঙ্গে সঙ্গে মেঝের একস্থানে একটা সুড়ঙ্গ পথ বেরিয়ে এলো।
বনহুর বললো–আসুন জজ সাহেব।
জজ সাহেব এবার কথা বললেন–আমাকে তুমি কি করতে চাও?
কিছু না। শুধু দু’চারটে প্রশ্নের জবাব দেবেন, আর দু’চারদিন আমার বিশ্রামকক্ষে বিশ্রাম করবেন–এই যা।
জজ সাহেব বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন তার মুখোভাবেই বোঝা গেলো। যদিও বনহুরের আশ্বাসবাণী তাঁকে কিছুটা আশ্বস্ত করেছে তবু সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হতে পারেননি।
বনহুর বললো–বিলম্ব করবেন না, কারণ এখন প্রতিটি মুহূর্ত আমার অত্যন্ত মূল্যবান। আসুন আমার সঙ্গে।
বনহুর সুড়ঙ্গ মুখের দিকে অগ্রসর হলো।
অল্পক্ষণের মধ্যে বনহুর আর জজ সাহেব বিরাট একটি কক্ষে প্রবেশ করলো।
এ কক্ষটা মাটির নিচে তৈরি। কক্ষে স্বাভাবিক আলো জ্বলছে। দেয়ালটা সম্পূর্ণ পাথরে তৈরি, কোনো রঙের ছোঁয়া পড়েনি দেয়ালে। চারিদিকে অনেকগুলি পাথরে তৈরি ছড়ানো। ওদিকে একটু উঁচু আসন, আসনটা পাথরে তৈরি বলেই মনে হলো। আসনের পাশেই একটা গোলাকৃত উঁচু টেবিল। টেবিলে একখানা ছোরা গাঁথা রয়েছে।
ছোরাখানা যদিও সূতীক্ষ্ণ ধারালো কিন্তু এখন সেটা মরচে ধরে ঘোলাটে হয়ে উঠেছে।
বনহুরের শহুরে দরবারকক্ষ এটা।
বনহুর এ কক্ষে কত দিন পর আজ পা রাখলো তার কোনো সঠিক হিসাব নেই।
পাশাপাশি দু’খানা চেয়ারে বসলো বনহুর আর জজ সাহেব।
জজ সাহেব বার বার উদ্বিগ্নভাবে তাকাচ্ছে ড্রাইভারবেশী দস্যু বনহুরের মুখে। চোখেমুখে। এখন তার ভীতিভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বনহুর একবার নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে-নিলো, তারপর বললো–আপনাকে যা জিজ্ঞাসা করবো, সঠিক জবাব দেবেন তো?
দেবো। বললেন জজ সাহেব।
বনহুর সিগারেট কেস বের করে মেলে ধরলো জজ সাহেবের দিকে নিন। জজ সাহেবের এখন যে অবস্থা তাতে সিগারেট সেবন করাতো দূরের কথা, তিনি কোনোদিন সিগারেট সেবন করেছিলেন কিনা তাও তার স্মরণ নেই। বললেন–মা করো, সিগারেট সেবন করবোনা, বলো–কে তুমি?
আমি কে তা জানতে পারবেন, কিন্তু এখন নয় পরে। আগে আমার প্রশ্নের জবাব দিন, : বলুন–দস্যু বনহুর এখন কোথায়?
দস্যু বনহুর!
হাঁ, বলুন?
এখন সে হাঙ্গেরী কারাকক্ষে বন্দী।
বিচারে তাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে?
হাঁ।
সে দন্ড কি আপনি দিয়েছেন?
হাঁ, তার অপরাধের জন্য তাকে বাধ্য হয়েছি মৃত্যুদন্ড দিতে। ৭ই জুন তাকে হাঙ্গেরী কারাকক্ষে ফাঁসী দিয়ে হত্যা করা হবে।
আর যদি সে দস্যু বনহুর না হয়?
বনহুরের কথায় জজ সাহেব চোখ তুলে তাকান তার মুখে, বলেন–কান্দাই এর পুলিশ সুপার মিঃ আহম্মদ নিজে তাকে গ্রেপ্তার করেছেন এবং দক্ষ পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ জাফরী তাকে সনাক্ত করে দস্যু বনহুর বলে প্রমাণ করেছেন।
