ড্রাইভার হাবার মত দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য, তারপর চিৎকার করে হই হুল্লোড় শুরু করে দিলো!
এখানে ড্রাইভার যখন চেঁচামেচি করছে, তখন হোটেলের মধ্যেও শুরু হয়েছে এক মহা হই চই কান্ড।
বনহুর সোজা তখন গাড়ি নিয়ে অগ্রসর হলো জজ কোয়ার্টারের দিকে।
জজ সাহেব বিচারালয়ে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে।
বনহুর তার গাড়িখানা নিয়ে পৌঁছে গেলো জজ সাহেবের গাড়ির পাশে। দারওয়ান এসে জিজ্ঞাসা করলো–আপ কাহা ছে আয়া?
বনহুর বললো-জজ সাহাব কো মিঠাই লে আয়া, তুম লে যাও অন্দর মে।
মিঠাই, কোন্ ভেজা?
তুমি লে যাও, জজ সাহাব জানতে সব।
বহুৎ আচ্ছা। চলে যায় দারওয়ান।
ড্রাইভারটা ছাড়া আর কেউ নেই আশেপাশে, বনহুর ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বললো–ভাই, আমার গাড়িখানা হঠাৎ কেমন যেন বেয়াড়া হয়ে পড়েছে, একটু যদি আমাকে সাহায্য করতেন!
ড্রাইভার গর্বিতভাবে বললো–কি রকম?
মানে, ঠিক বুঝতে পারছিনে, একটু চালিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন। হাজার হলেও আপনি ড্রাইভার–গাড়ি সম্বন্ধে আপনাদের তুলনায় আমরা একেবারে অজ্ঞ। মেহেরবানী করে যদি একটু…মানে দু’মিনিট…
ড্রাইভার জানে, সাহেব বেরুতে আরও অর্ধঘন্টা সময় লাগবে। নেমে এলো গাড়ি থেকে।
বনহুর ড্রাইভ আসনের পাশে উঠে বসে দরজা খুলে ধরল–আসুন।
ড্রাইভার বনহুরের ভদ্র ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেছে, কোনোরকম বিলম্ব না করে উঠে পড়লো–স্টার্ট দিয়ে গাড়ি বের করে নিয়ে চললো রাস্তায়।
বনহুর তার সিগারেট কেস থেকে একটা সিগারেট বের করে গুঁজে দিলো ড্রাইভারের ঠোঁটের ফাঁকে, তারপর ম্যাচ জ্বেলে সিগারেট ধরিয়ে দিলো।
বনহুর ঠোঁটের কুঁকে সিগারেট চেপে ধরে এক মুখ ধুয়া ছেড়ে বললো–কিছু বুঝতে পারছেন?
ড্রাইভারের ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট, দাঁতে চেপে ধরে বললো–আছে, খুব একটা দোষ আছে গাড়িখানার। আপনারা তেমন ধরতে পারবেন না, আচ্ছা আমি ঠিক করে দিচ্ছি।
কথায় কথায় বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করে এসেছে তারা। বনহুর বললো–আর একটু চালালেই আরও ভালভাবে অনুভব করবেন।
কিন্তু আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারছিনে, কারণ স্যার বেরিয়ে পড়বেন।
ওদিকের গলির ভিতর দিয়ে চলুন ড্রাইভার সাহেব, মাত্র দু’মিনিট সময় লাগবে।
ঠিক বলেছেন। ড্রাইভার গাড়ি ব্রেক করে গলির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে নিলো। জনহীন গলিপথ।
গলির মাঝপথে গাড়ি আসতেই হঠাৎ পাঁজরে ঠান্ডা কিছু অনুভব করলো ড্রাইভার।
বনহুর কঠিন কণ্ঠে বললো–খবরদার, চিৎকার করবে না! সঙ্গে সঙ্গে মরবে!
ড্রাইভার হঠাৎ চমকে উঠলো, ভাবতেও পারে নি, তার পাজরে একটি আগ্নেয় অস্ত্র ঠেশে ধরা হয়েছে। বনহুরের কণ্ঠস্বরে ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে উঠলো ড্রাইভারের মুখমন্ডল। একটু আড়নয়নে দেখে নিয়ে আবার তাকালো সম্মুখে রাস্তায় জন-হীন নির্জন গলিপথ। ড্রাইভার বুঝতে পারলো যে নিশ্চয়ই কোনো ডাকু বা দস্যু কবলে পড়েছে–উপায় নেই রক্ষার।
বনহুর কঠিন কণ্ঠে বললো–গাড়ি রুখো।
বাধ্য হলো ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিতে।
এবার বনহুর রিভলভার ঠিক রেখে ড্রাইভারকে গাড়ি থেকে নামতে বললো–পাশেই একটি বাড়ি, দরজায় চক মাটি দিয়ে লিখা আছে “বাড়ি ভাড়া দেওয়া হইবে”। বনহুর ডাইভারসহ সেই বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করলো। তখনও ড্রাইভারের পিঠে ঠেকে রয়েছে বনহুরের হস্তের রিভলভারের শক্ত আগাটা।
একটু শব্দ করতে পারলো না ড্রাইভার, মৃত্যুভয় কার না আছে!
বনহুর একটা খালি কক্ষে ড্রাইভারকে বন্দী করে তার শরীর থেকে ড্রাইভারের ড্রেস খুলে নিলো, তারপর দ্রুত পরে নিলো ড্রেসটা। যদিও ঠিকভাবে শরীরে খাপ খাচ্ছিলো না তবু কোনো রকমে চাপিয়ে নিলো।
অতি দ্রুত ড্রেস পরে নিয়ে শিকল টেনে দিলো দরজায়। ভাগ্যিস বাড়ির সদর গেটটা আগলা ছিলো। তাই বেগ পেতে হলো না দস্যু বনহুরকে।
ড্রাইভারের ড্রেসে গাড়ি নিয়ে ছুটলো জজ কোয়ার্টারের দিকে।
কিন্তু বনহুর এবার গাড়ি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো না। গাড়িখানা পথের উপর একধার করে রেখে তাড়াহুড়ো করে ভিতরে প্রবেশ করলো, এবং খুশি হলো–তখনও জজ সাহেব গাড়ির নিকটে এসে উপস্থিত হননি দেখে।
বনহুর ড্রাইভ আসনের পাশে দাঁড়িয়ে রইলো, যেমনভাবে ড্রাইভারগণ দাঁড়িয়ে থাকে।
জজ সাহেবের আজ একটু বিলম্ব হয়ে গেছে, তিনি ব্যস্তভাবে গাড়িতে এসে চেপে বসলেন।
ড্রাইভারও বসলেন তার আসনে।
নতুন ঝকঝকে মডেল পন্টিয়াক গাড়িখানা দস্যু বনহুরের হস্তে উলকা বেগে ছুটলো।
মাত্র কয়েক মিনিট, গাড়ি বড় রাস্তা ছেড়ে গলিপথে প্রবেশ করলো।
জজ সাহেব বললেন–জজকোর্টে যাবার পথ ভুল করলে কি?
পুরোন অভিজ্ঞ ড্রাইভার, কাজেই জজ সাহেব হালকা ভাবেই কথাটা বললেন।
বনহুর সম্মুখে দৃষ্টি রেখে বললো–বিলম্ব হয়ে গেছে, তাই পথ খাটো করে নেবার জন্যে…
বেশ তাই চলো। একটা সিগারেট বের করে সেটিতে অগ্নি সংযোগ করলেন জজ সাহেব।
গাড়িখানা এখন নির্জন গলিপথ ধরে এগুচ্ছে। হঠাৎ ড্রাইভার-বেশি বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো–জজ সাহেব, একটি কথা বলতে চেষ্টা করবেন না। করলেই এই দেখুন…রিভলভারখানা বের করে দেখায় সে এর এক গুলীতে খতম করে দেবো, কাজেই চুপ করে সিগারেট সেবন করুন।
ড্রাইভারের কথায় জজ সাহেবের বুকটা ধক্ করে উঠলো, কম্পিত বক্ষ নিয়ে তাকালেন ড্রাইভারের বাম হস্তে-উদ্যত রিভলভারখানার দিকে, পর মুহূর্তে তাকালেন তার মুখে কে তুমি?
