ঐদিকে?
হ।
পাহারাদার অপর দিকে চলে গেলো।
বনহুর ঘোড়াশালের দিকে এগিয়ে গেলো, সহিসদের একজন ঘোড়াশালের পাশে ঘুমিয়েছিলো লোকটা হঠাৎ জেগে উঠলো–কে?
বনহুর ব্যস্তকণ্ঠে বললো–রাজকুমার প্রদীপ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছে, রাজপ্রাসাদে খবর দিতে হবে, একটা ভাল অশ্ব বেছে দাও।
আচ্ছা হুজুর, দিচ্ছি।
সহিস ঘোড়াশালে প্রবেশ করে একটা বলিষ্ঠ অশ্ব নিয়ে ফিরে এলো।
বনহুর আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে চেপে বসলো অশ্বপৃষ্ঠে।
মন্থনার পথঘাট বনহুরের পরিচিত নয়, কাজেই কোন্ দিকে যাবে; বনহুরের উদ্দেশ্য বন্দরে পৌঁছে কান্দাইগামী জাহাজে সে ফিরে যাবে। যেমন করে হোক উদ্ধার করবে সে প্রদীপ কুমারকে।
কিন্তু কোনদিকে বন্দর জানা নেই দস্যু বনহুরের। একটি টাঙ্গীওয়ালা পথের ধরে টাঙ্গী রেখে তার উপর নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছিলো।
বনহুর অশ্ব থেকে নেমে পড়লো, এক ধাক্কায় টাঙ্গীওয়ালাকে জাগিয়ে দিয়ে বললো–এই, রাজার হুকুম, তোকে আমার সঙ্গে বন্দরে যেতে হবে টাঙ্গী নিয়ে।
টাঙ্গী ওয়ালা চোখ মেলে তাকাতেই দেখতে পেলো–রাজমন্ত্ৰী-চিহ্নযুক্ত পোশাক পরিহিত পাহারাদার তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে। বুকটা কেঁপে উঠলো টাঙ্গী চালকের, বিনীত কণ্ঠে বললো– হুজুর, এতো রাতে বন্দরে যেতে হবে কেনো?
রাজ-আত্নীয় আসবেন, তাই তাকে আনতে।
আর কোনো কথা বলতে সাহসী হলোনা টাঙ্গীচালক।
বনহুর অশ্ব সংযত করে টাঙ্গীর পিছনে অগ্রসর হলো।
বন্দরে পৌঁছতে বহু সময় লাগলো তার।
টাঙ্গী চালকের জিম্মায় অর্শ্ব রেখে বনহুর বন্দরের দিকে চলে গেলো। বলে গেলো বনহুর– আমার ফিরতে যদি খুব বিলম্ব হয় তবে তুমি ফিরে যেও, এবং অশ্বটি মন্ত্রি-বাড়িতে পৌঁছে দিও।
আচ্ছা হুজুর, তাই করবো। বললো টাঙ্গীচালক।
বনহুর বন্দরে প্রবেশ করতেই সবাই রাজপাহারাদার দেখে সম্মানে পথ ছেড়ে দিলো।
বাৎ ভাল বলতে হবে, বনহুর বন্দরে পৌঁছতেই শুনতে পেলো–একটি জাহাজ এই দন্ডে কান্দাই অভিমুখে রওয়ানা দিবে।
বনহুর রাজপাহারাদারের বেশেই জাহাজে উঠে বসলো, জাহাজের ক্যাপ্টেন তার সুখ সুবিধামত ব্যবস্থা করে দিলো।
মন্থনা দ্বীপের রাজপাহারাদার হিসাবে বনহুর জাহাজে যথেষ্ট সম্মান পেতে লাগলো।
*
দুইদিন দুই রাত্রি জাহাজে কাটানোর পর বনহুর কান্দাই বন্দরে অবতরণ করলো।
নতুন জীবন লাভ করার পর বনহুরের এই প্রথম কান্দাই আগমন। বনহুর কান্দাই পৌঁছে। একটা হোটেলে আশ্রয় নিলো। কান্দাই এর পুলিশ মহলের অনকেই দস্যু বনহুরের আসল রূপ চেনেন, কাজেই স্বাভাবিক ড্রেসে বনহুর এ শহরে প্রবেশ করলে বিপদের সম্ভাবনা আছে। বনহুরের মনে পড়লো আস্তানার কথা, মনে পড়লো স্ত্রী মনিরার কথা আর পুত্র নূর। কিন্তু সব মুছে ফেললো সে মন থেকে, সব কাজের প্রথম তাকে উদ্ধার করতে হবে মন্থনার রাজকুমার প্রদীপকে। কান্দাই পৌঁছেই সে জানতে পেরেছে–আর তিন দিন মাত্র বাকি আছে দস্যু বনহুরকে ফাঁসীমঞ্চে ঝোলাবার। ৭ই জুন এগিয়ে আসছে দ্রুতগতিতে; তার পূর্বে প্রদীপ কুমারকে মুক্ত করে আনতে হবে।
বনহুর হোটেলের কামরায় পায়চারী করছে আর গভীরভাবে চিন্তা করছে, সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলেছে সে।
কান্দাই পৌঁছেই বনহুর তার ড্রেস পরিবর্তন করে নিয়েছিলো। শুধু পাজামা আর পাঞ্জাবী শোভা পাচ্ছিলো তার শরীরে। হোটেলের বয় বনহুরের অর্ডারমত খাবার দিয়ে গেলো।
বনহুর তখন পিছন দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
বয় চলে যাচ্ছিলো, বনহুর বললো–বাথরুমে পানি আসছেনা কেনো দেখোতো? টাঙ্কিতে কি পানি নেই?
স্যার, পানি থাকবেনা কেন, সমস্ত হোটেলের জন্য প্রচুর পানি মজুত আছে টাঙ্কিতে। আচ্ছা আমি দেখছি…
বয় বাথরুমে প্রবেশ করতেই বনহুর প্রবেশ করলো তার পিছনে।
তারপর বনহুর যখন বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো তখন তার সম্পূর্ণ রূপ পাল্টে গেছে। কেউ দেখলে তাকে চিনতেই পারবে না; হোটেলের বয় বলেই মনে হচ্ছে তাকে সম্পূর্ণভাবে।
বনহুর ট্রে আর প্লেট হস্তে বেরিয়ে এলো। তারপর আলমারী খুলে সব চেয়ে মূল্যবান ভাল মিষ্টি সাজিয়ে নিলো একটা টিফিন ক্যারিয়ারে। আবার ফিরে গেলো সে নিজের ক্যাবিনে।
হোটেলের অন্যান্য লোকজন সবাই মনে করলো–সাতাশ নম্বর ক্যাবিনের ভদ্রলোক বুঝি। মিষ্টির অর্ডার দিয়েছে।
নিজের কক্ষে প্রবেশ করে বনহুর দ্রুত হস্তে বয়ের ড্রেস খুলে পরে নিলো নিজের পাজামা আর পাঞ্জাবী; তার পর খচ খচ করে দুটো চিঠি লিখে নিয়ে পকেটে রাখলো। টিফিন ক্যারিয়ার হস্তে বেরিয়ে এলো সকলের অলক্ষ্যে ফুটপাতে।
অদূরে একটা ভাড়াটে ট্যাক্সি যাত্রী নামিয়ে দিয়ে ষ্টার্ট নিচ্ছিলো, বনহুর দ্রুত এগিয়ে উঠে। বসে বলে–চলো পুলিশ অফিসে, আর শোন, একটা চিঠি পোষ্ট করবো, পথে কোনো পোষ্ট বক্স দেখলে এক মিনিটের জন্য গাড়ি রাখবে।
আচ্ছা স্যার। ড্রাইভার গাড়ি ছাড়লো।
কয়েক মিনিট চলার পর একটা পোষ্ট বক্স দেখে গাড়ি রাখলো ড্রাইভার, বললো–দিন স্যার, আমি দিয়ে আসি।
বনহুর চিঠিখানা বের করে ড্রাইভারের হাতে দিলো, ড্রাইভার নেমে গেলো গাড়ি থেকে।
বনহুর লক্ষ্য করছে–ড্রাইভার চিঠিখানা পোষ্ট বক্সে ছেড়ে দিতেই, সে চট করে ড্রাইভ আসনে বসে হ্যান্ডেল চেপে ধরে ষ্টার্ট দিলো।
ড্রাইভার প্রথমে একটু থতমত খেয়ে গেলো, তারপর দ্রুত দৌড়ে এলো কিন্তু গাড়ীখানা নিকটে পৌঁছাবার পূর্বেই তার সম্মুখ দিয়ে সাঁ করে চলে গেলো গাড়িখানা।
