প্রদীপ অবাক হয়ে দেখছে ছবিখানা।
মীরা এসে দাঁড়ালো তার পাশে, হেসে বললো–অমন আশ্চর্য হয়ে কি দেখছো? ভুলে গেছ বুঝি তোমার আর আমার সেদিনের কথা?
প্রদীপের আঁখি দুটি ছবি থেকে ফিরে এলো মীরার মুখে, প্রদীপের চোখে রাশিকৃত বিস্ময়।
মীরা প্রদীপের হাত ধরে বললো–এসো।
খাটের উপর প্রদীপকে বসিয়ে দিয়ে মীরা ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো, বামহস্ত দিয়ে প্রদীপের কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরে বললো–কতদিন পর আমার ঘরে এলে বলতো?
উ।
কেমন যেন আনমনা হয়ে গেছো তুমি?
প্রদীপ যেন অস্বস্তি বোধ করছে। মীরার হাতখানা ক্রমে আকর্ষণ করছে প্রদীপকে।
মীরা কিসের প্রতিক্ষায় উন্মুখ হয়ে উঠেছে। কোমল পাপড়ির মত আঁখি দুটিতে ভাবময় চাহনি, সরু ওষ্ঠদ্বয়ে মৃদু মৃদু হাসির রেখা, বাহু দুটি তার কণ্ঠ বেষ্টন করে আছে।
প্রদীপ মীরার মুখ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাকায় দেয়ালে ছবির প্রদীপের মুখে।
মীরা অভিমান ভরাকণ্ঠে বলে–প্রদীপ কি দেখছো?
ঐ ছবির চোখ দুটো আমার দিকে কেমন করে তাকাচ্ছে দেখো।
হেসে উঠে মীরা–সে তো তুমি। প্রদীপ, আজ তোমাকে কিছুতেই ছেড়ে দেবো না।
কি করবে তুমি আমাকে নিয়ে?
অনেক কথা জমে আছে, অনেক হাসি-গান সব আজ উজাড় করে শোনাবো তোমাকে।
কিন্তু আমি যে বড় অস্বস্তি বোধ করছি মীরা।
অস্বস্তি! কি হয়েছে তোমার?
বড্ড মাথা ব্যথা। বড্ড মাথা…দুই হাতে প্রদীপ নিজের মাথাটা টিপে ধরে!
খুব কি অসুস্থ বোধ করছো?
খুব।
তাহলে ডাক্তার ডাকি?
না না, ডাক্তারের কোনো দরকার হবে না। মীরা, একটু ঘুমাতে পারলে আমি ঠিক সুস্থ হয়ে যাবো, কিন্তু তোমার ঘরে ঘুমানো তো চলবে না।
কেন?
বিয়ে তো আমাদের এখনও হয়নি, তাই যদি তোমার বাবা মা..
আজ কি তুমি নতুন এসেছো আমার ঘরে? আমার বাবা মা তোমাকে অনেক দিন বরণ করে নিয়েছেন প্রদীপ, আমাদের মনের বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন। লোক দেখানো লৌকিকতাটুকু বাকি আছে মাত্র; একথা তুমিই তো বলেছে আমাকে।
মীরা, সব ভুলে গেছি, সব ভুলে গেছি আমি। আমি নিজকে নিজেই জানিনে–কে আমি!
প্রদীপ!
হা মীরা।
তুমি বড় অসুস্থ, এসো আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ো, আমি তোমার চুলে আংগুল বুলিয়ে দিই।
প্রদীপ মীরার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো।
রাত বেড়ে আসছে।
প্রদীপ ঘুমিয়ে পড়লো এক সময়।
মীরার চোখেও নেমে এলো নিদ্রার পরশ।
প্রদীপের মাথাটা ধীরে ধীরে বালিশে নামিয়ে রেখে নিৰ্ণিমেশ নয়নে তাকিয়ে রইলো ওর নিদ্রিত মুখের দিকে। এক সময় মোহগ্রস্তের মত মীরার মুখখানা ঝুঁকে এলো প্রদীপের মুখে। অপূর্ব এক অনুভূতি নাড়া দিয়ে গেলো মীরার হৃদয়ে।
প্রদীপের বুকের উপর হাত রেখে মীরাও ঘুমিয়ে পড়লো।
নিস্তব্ধ কক্ষে শুধু জেগে রইলো দেয়াল ঘড়িটা। টিক্ টিক্ করে বেজে চলেছে, কালের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে এক এক করে মুহূর্তগুলি।
ঢং ঢং করে দেওয়াল ঘড়িটা রাত দুটো ঘোষণা করলো। আধুনিক মডার্ণ ঘড়ি, একটা সুমিষ্ট সুরের রেশ ঘরময় ছড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণের জন্য।
বুকের উপর থেকে মীরার হাতখানা আস্তে সরিয়ে রেখে উঠে বসলো প্রদীপ, মীরাকে তাকিয়ে দেখে নিলো। এক থোকা রজনীগন্ধার মত মীরার দেহটা এলিয়ে পড়ে আছে তার পাশে। প্রদীপের চোখ দুটো উজ্জ্বল তীব্র হয়ে উঠলো, হাতখানা এগিয়ে গেলো ওর দিকে, কিন্তু পর মুহূর্তে প্রদীপ সরিয়ে নিলো হাতখানা, শয্যা ত্যাগ করে প্রদীপ আর মীরার ছবিখানার পাশে এসে দাঁড়ালো। স্থির নয়ন মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর আবার তাকালো নিদ্রিত মীরার দিকে, আবার তাকালো সে ছবির প্রদীপের মুখে, অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠলো–প্রদীপ, তুমি আজ হাঙ্গেরী কারাগারে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। আর দস্যু বনহুর তোমার আসনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে রাজকুমার প্রদীপ বনে বসে আছে। প্রদীপের মৃত্যু হবে, মন্থনার রাজা হবে দস্যু বনহুর, অপ্সরীর মত সুন্দরী মীরা হবে তার প্রেয়সী…নিয়তির কি পরিহাস! কিন্তু দস্যু বনহুর নিয়তিকেও প্রশ্রয় দেবেনা, এতো বড় একটা নির্মম অন্যায় সে হতে দেবেনা কখনও। রাজ্য-সুখ, নারী-রত্ন। লাভ দস্যু বনহুরের কামনা নয়। নিয়তিকে পরিহার করে বনহুর ফিরিয়ে আনবে প্রদীপকে।
প্রদীপ রূপ মুছে যায়, সেখানে জেগে উঠে এক দূর্দান্ত কঠিন পুরুষ-প্রাণ।
অন্তপুর থেকে বেরিয়ে আসে দস্যু বনহুর।
অদূরে সিংহদ্বারে রাইফেলধারী পাহারাদার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমুচ্ছিলো।
বনহুর সন্তর্পণে পিছন থেকে এগিয়ে যায়, দৃঢ় মুষ্ঠিতে চেপে ধরে পাহারাদারের গলা। একটা গোঙ্গানীর মত শব্দ বেরিয়ে আসে পাহারাদারের কণ্ঠ দিয়ে। বনহুরের হাতের মধ্যে শিথিল হয়ে আসে পাহারাদারের দেহটা, আস্তে করে ভূতলে শুইয়ে দিয়ে ওর শরীর থেকে খুলে নেয় ড্রেসটা।
অল্পক্ষণের মধ্যে পাহারাদারের ড্রেসে সজ্জিত হলো দস্যু বনহুর। রাইফেলটা তুলে নিলো হাতের মুঠায়।
অন্য একজন পাহারাদার বুঝি গোঙ্গানীর শব্দটা শুনতে পেয়েছিলো, তাই লণ্ঠন হাতে এগিয়ে আসছিলো এইদিকে।
বনহুর দ্রুত হস্তে পাহারাদারের জ্ঞানহীন শিথিল দেহটা সিংহদ্বারের আড়ালে সরিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমুতে লাগলো।
পাহারাদারটি লণ্ঠন উঁচু করে এগিয়ে এলো–এদিকে কিসের শব্দ হলো ভাই?
হাঁ, আমিও ঐ রকম শব্দ শুনতে পেয়েছি, কিন্তু এদিকে কেননা–ঐদিকে।
