তারপর মীরা, তারপর? ব্যাকুল আগ্রহে প্রশ্ন করলো প্রদীপ।
আমি তোমাকে জোর করে তাড়িয়ে দিতাম, তুমি বলতে–মীরা, তোমাকে ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকতে ইচ্ছা হয় না মনে হয়, তোমাকে সব সময় বাহুবন্ধনে বেঁধে রাখি…
মীরা!
হাঁ, সব তুমি ভুলে গেছো প্রদীপ?
তারপর মীরা?
চলো আমার ঘরে বসে সব বলবো। যাবে আজ আমার ওখানে?
চলো, যাবো।
প্রদীপ আর মীরা মন্ত্রি-প্রাসাদের দিকে অগ্রসর হলো, এক্কা ঘোড়ার গাড়িতে চেপে রওনা দিলো ওরা।
প্রদীপ আর মীরা বসে আছে পাশাপাশি। মীরার ওড়নার আঁচলখানা বাতাসে উড়ে উড়ে পড়ছিলো প্রদীপের চোখে-মুখে।
প্রদীপ নিশ্চুপ বসেছিলো পথের দিকে তাকিয়ে, কিছু যেন সে গভীরভাবে চিন্তা করছে! ললাটে ফুটে উঠেছে গভীর চিন্তার ছাপ।
মীরা প্রদীপের হাতখানা নিজের হাতের মুঠায় টেনে নিয়ে বলে–প্রদীপ, কি ভাবছো?
কিছু না।
প্রদীপ, তুমি কিন্তু আগের চেয়ে অনেক গম্ভীর হয়ে গেছে, কই আগে তো তুমি অমন ছিলে না? কত দুষ্ট ছিলে তুমি! আমাকে অস্থির করে তুলতে, এক মুহূর্ত তুমি আমাকে চুপ থাকতে দিতে না। একটু গম্ভীর হলেই বলতে, আমার উপর রাগ করেছে মীরা? যতক্ষণ না হাসতাম ততক্ষণ তুমি যেন স্বস্তিই পেতে না। আর এখন তুমি যেন কেমন হয়ে গেছো? প্রদীপ, জানি শিকারে গিয়ে তুমি মাথায় আঘাত পেয়েছিলে?
শিকারে?
হাঁ, মনে নেই তোমার? তা থাকবে কি করে! ডাক্তার বলেছিলেন–তোমার স্বাভাবিক জ্ঞান ফিরতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে।
প্রদীপের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠে, বিপুল আগ্রহে বলে সে–মীরা, আমি সব জানতে চাই তোমার কাছে।
চলো, সব বলবো। তবু যদি স্মরণ হয় তোমার! আবার যদি তোমাকে আগের মত করে ফিরে পাই!
তুমি বলো মীরা, আমি আর ধৈর্য ধরতে পারছি না।
প্রদীপ, যেদিন তুমি শিকারে যাও তখন আমি অসুস্থ ছিলাম—
হাঁ, মনে পড়েছে একটু একটু…
সত্যি?
হা মীরা।
বার বার শিকারে যাওয়া কালে আমি তোমার সঙ্গে যেতাম, মনে আছে তোমার?
প্রদীপ গভীরভাবে চিন্তা করে বলে–হাঁ, এবার ঠিক স্মরণ হচ্ছে। আমি যখন শিকারে। যেতাম, তুমি থাকতে আমার পাশে।
প্রদীপের মুখে পূর্ব কথা শুনে মীরার আঁখি দুটি আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠে, বলে চলে মীরা আমি সেবার অসুস্থ থাকার জন্য তোমার সঙ্গে যেতে পারলাম না। বিদায় কালে আমার হাত ধরে তুমি বলেছিলে–শিকারে গেলাম মীরা কিন্তু আমার প্রাণ পড়ে রইল এখানে…
মীরা!
প্রদীপ, তারপর শিকার থেকে সবাই ফিরে এলো, শুধু এলেনা তুমি। সবাই এসে বললো ঝড়-তুফানে কোথায় তুমি হারিয়ে গেছে। প্রাণে বেঁচে আছে কিনা তাও কেউ বলতে পারলো না। তোমার অভাবে মন্থনা দ্বীপে এক মহাশোকের ছায়া নেমে এলো। মহারাজ আর মহারাণী একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে বিশ্বকে অন্ধকার দেখলেন। মন্থনার আনন্দ-হাসি-গান চিরতরে মুছে গেলো, মুছে গেলো সবার খুশি। আমার মনের অবস্থা তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারবো না প্রদীপ…
গলা ধরে আসে মীরার।
প্রদীপ তন্ময় হয়ে শোনে।
বলে আবার মীরা…মন্থনা দ্বীপবাসী যখন শোকে মূহ্যমান, মহারাজ মহারাণী যখন কেঁদে কেঁদে অন্ধ হবার জোগাড়, তখন হঠাৎ তোমাকে পাওয়া গেল মন্থনার হসপিটালে তিন নম্বর বেডে। জানা গেলো, কোন্ জেলে নৌকায় তোমাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করেছে সারথী নদীবক্ষ থেকে।
সারথী নদী! অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করলো প্রদীপ।
হাঁ, সারথী নদী থেকেই তোমাকে জেলেরা উদ্ধার করে মন্থনা হসপিটালে দিয়েছিলো। সার্জন বলেছিলেন তখন তোমার যা অবস্থা ছিলো, অতি আশঙ্কাজনক। মাথায় ভীষণ আঘাত পেয়ে তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। সম্পূর্ণ তিন সপ্তাহ পর ফিরে এলো বটে, কিন্তু স্বাভাবিক জ্ঞান তুমি লাভ করলে না। তুমি তোমার আত্মীয়-স্বজন, এমন কি তোমার পিতা-মাতাকে চিনতে পারলে না, আমাকেও না…প্রদীপ, বলো এখনও কি তুমি আমাকে চিনতে ভুল করছো?
না, মীরা।
তবে তুমি ঠিক আগের মত করে আমাকে গ্রহণ করতে পারছে না কেন?
মীরা…
বলো?
না, থাক বলবো পরে।
মীরা বললো–এই তো এসে গেছি।
ঘোড়াগাড়ি থেমে পড়লো, প্রদীপ আর মীরা নেমে দাঁড়ালো।
প্রদীপ নতুন দৃষ্টি নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
মীরা হেসে বললো–আজ কি তুমি নতুন এলে প্রদীপ? অমন করে কি দেখছো?
কিছু না, চলো।
মীরাকে অনুসরণ করে প্রদীপ।
মীরা অন্তপুরে প্রবেশ করে ডাকে–মা মা, দেখে যাও কে এসেছে।
কন্যার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বরে মন্ত্রিপত্নী লতারাণী এগিয়ে আসেন, মীরার সঙ্গে রাজকুমার প্রদীপকে বহুদিন পর তার বাড়িতে আসতে দেখে উচ্ছল খুশিভরা কণ্ঠে বলেন–প্রদীপ, বাবা তুমি এসেছো?
প্রদীপ কোনো জবাব দিতে পারে না, থ’ মেরে দাঁড়িয়ে থাকে।
মীরা হেসে বলে–কই মাকে প্রণাম করছে না যে?
ও! প্রদীপ কেমন যেন বিব্রত বোধ করে। মীরার কানে মুখ দিয়ে বলে–কেমন করে প্রণাম করতে হয় শিখিয়ে দাও মীরা?
হেসে উঠে মীরা–প্রণাম করাটাও ভুলে গেছো? মীরা মায়ের পায়ের কাছে বসে প্রণাম করে প্রদীপকে শিখিয়ে দেয়।
প্রদীপ মীরার অনুসরণে লতাদেবীকে প্রণাম করে।
*
মীরার কক্ষে প্রবেশ করতেই প্রদীপ থমকে দাঁড়ালো, বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে অগ্রসর হলো প্রদীপ ওপাশের দেয়ালে টাঙ্গানো প্রদীপ আর মীরার বড় ছবিখানার দিকে।
ছবিখানার নিচে এসে দাঁড়ালো প্রদীপ, স্থির অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। ছবিখানা যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে, মীরা আর প্রদীপ দাঁড়িয়ে রয়েছে পাশাপাশি। উভয়ের হাতের মুঠায় হাত, শরীরে শিকারীর ড্রেস। দু’জনার পিঠের সঙ্গেই রাইফেল বাধা রয়েছে। হাসছে ওরা আপন মনে।
