আরাকানে?
হাঁ, সেখানে আমার…মানে আমার স্ত্রীর কাছে থাকতো। কাজেই আমার স্ত্রীকে সে মাম্মী বলে ডাকতো…আমার স্ত্রী নূরকে মনি বলে ডাকতো। ওরা উভয়ে উভয়কে নিবিড়ভাবে মা ও সন্তানের মত ভালবেসে ফেলেছিলো…রহমান কথাগুলো বেশ থেমে থেমে বললো–দস্য হলেও মিথ্যাবাদী নয় সে, মিথ্যা বলতে তার কণ্ঠ রোধ হয়ে আসছিলো।
মনিরা রহমানকে বিশ্বাস করতো, কাজেই রহমানের কথা সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলো।
রহমান এতোবড় একটা মিথ্যা কথা বলে আর দাঁড়াতে পারছিলোনা তাদের বৌরাণীর সম্মুখে, তখনকার মত বিদায় নিলো সে।
এতোদিন স্বামীর প্রতি একটা সন্দেহের দোলা লাগছিলো মনিরার মনে। রহমানের কথায় তার মনের আকাশ সচ্ছ হয়ে আসে। স্বামীর উপর যা অভিমান ছিলো সব নিঃশেষ হয়ে গেলো আজ।
*
আগের চেয়ে প্রদীপ অনেকটা এখন ভাল।
মীরার সান্নিধ্য প্রদীপকে করে তুলেছে আরও সুষমামন্ডিত। মীরা সব সময় প্রদীপকে ঘিরে থাকে আবেষ্টনীর মত। মহারাজ জয়কান্ত বলেছেন আর এক সপ্তাহ পর প্রদীপ আর মীরার বিয়ে হবে।
মন্থনার ঘরে ঘরে আনন্দ উৎসব বয়ে চলেছে। সমস্ত মন্থনা দ্বীপ আলোকমালায় সজ্জিত করা হচ্ছে। নগরের সৌধ চূড়ায় এখন থেকেই বেড়ে চলেছে নহবতের সুমিষ্ট সুর। নারী-পুরুষ সকলে মুখেই আনন্দ উচ্ছ্বাস। মীরা আর প্রদীপকে কেন্দ্র করে মহানগরীর বুকে বয়ে চলেছে খুশির ফোয়ারা। মন্থনার ধনী-দরিদ্র সবাই মেতে উঠেছে–আনন্দে আত্মহারা সবাই।
মীরা প্রদীপকে নিয়ে স্বপ্নসৌধ গড়ে। হাসি-গানে সব সময় ওকে মাতিয়ে রাখে সে।
মন্থনা দ্বীপের সব বিপদ কেটে গেছে। এখানের প্রতিটি মানুষ আজ মুক্তির নিশ্বাস ফেলে বেঁচেছে। দস্যু বনহুরের ভয়ে আজ তারা আর আতঙ্কগ্রস্ত নয়। কারণ দস্যু বনহুর হাঙ্গেরী কারাগারে বন্দী। ৭ই জুন রাত্রিতে তাকে হাঙ্গেরী কারাগারে ফাঁসী দিয়ে হত্যা করা হবে।
এ সংবাদ সুদূর মন্থনা দ্বীপেও পৌঁছে গেছে।
শুধু পুলিশ মহলেই নয়, সমস্ত নগরবাসীর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে কথাটা, ৭ই জুন। রাত্রিতে হাঙ্গেরী কারাকক্ষে দস্যু বনহুরকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে।
মহারাজ পুত্রবধূ মীরাকে বহু মূল্যবান অলঙ্কারে ভূষিত করবেন। বিনা দ্বিধায় আজ তিনি ঘোষণা করেছেন, মীরার অলঙ্কারের মূল্যের পরিমাণ। মীরা আজ উচ্ছল আনন্দে আত্মহারা, প্রদীপের পাশে ছুটে গেলো খুশির আবেগে। সুডোল বাহু যুগল দিয়ে জড়িয়ে ধরলো প্রদীপের কণ্ঠ, ডাকলো–প্রদীপ!
উ।
এখনও তোমার মধ্যে দ্বিধা?
উ হু।
আজও তুমি আমাকে নিজের করে নিতে পারলেনা?
প্রদীপ তার বলিষ্ঠ বাহু দুটি দিয়ে দৃঢ়ভাবে আকর্ষণ করলো মীরাকে, কিন্তু পর মুহূর্তে শিথিল হয়ে এলো তার হাত দুখানা।
মীরা বললো–কি হলো তোমার?
কিছু না। চলো মীরা, ঘরে ফিরে যাই।
কেন, এই মনোরম সুন্দর ফুলে ফুলে ভরা বাগান, লতা-গুল্মে ঘেরা কুঞ্জবন ভাল লাগছেনা তোমার কাছে?
না।
কেন? ওঃ ভয় হচ্ছে বুঝি তোমার? আবার যদি দস্যু বনহুর হানা দিয়ে বসে…
অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো প্রদীপ–দস্যু বনহুর! প্রথম যেন তার কানে প্রবেশ করলো শব্দটা।
মীরা বললো আবার–তুমি শোননি প্রদীপ, দস্যু বনহুর আজ কান্দাই হাঙ্গেরী কারাগারে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে!
প্রদীপের চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে মীরার মুখে।
মীরা বলে চলেছে–আর সে আসতে পারবেনা মন্থনা দ্বীপে। কাজেই ভয় নেই তোমার।
প্রদীপ তখনও এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে, মীরার মুখে কিসের যেন সন্ধান করে ফিরছে। প্রদীপের মুখভাব গম্ভীর হয়ে উঠলো।
মীরা ব্যস্ত কণ্ঠে বললো–কি হলো তোমার?
প্রদীপ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিলো, আবার তাকালো মীরার দিকে।
সে দৃষ্টি যেন প্রদীপের নয়। চমকে উঠলো মীরা, কম্পিত গলায় বললো–অমন করে কি দেখছো আমার মুখে?
প্রদীপ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো, গম্ভীর গলায় বললো–দস্যু বনহুর বন্দী হয়েছে, এ কথা তুমি জান কি করে?
এবার মীরা হেসে উঠলো–সমস্ত পৃথিবীর লোক জানে আর আমি জানবোনা। দস্যু বনহুর যা উপদ্রব শুরু করেছিলো, দেখলে তো তোমার উপর কিভাবে সে অন্যায় আচরণ করলো? তোমাকে বেঁধে রেখে আমাকে নিয়ে কিভাবে উধাও হয়েছিলো। তুমি যাই বলো প্রদীপ, দস্যুটাকে লোকে যতই বদ বলুক, আমি কিন্তু তাকে সমীহ করি…
আবার তাকালো প্রদীপ মীরার মুখে।
মীরা বলে চলেছে–আমাকে বন্দী করে নিয়ে যাবার পর সে এতোটুকু কোনো অন্যায় আচরণ করেনি আমার সঙ্গে।
প্রদীপ এততক্ষণে কথা বললো–দস্যু বনহুরকে তুমি দেখেছো নিশ্চয়ই?
এবার মীরা ভাবাপন্ন হলো প্রদীপ, দস্যু বনহুর আমাকে হরণ করে নিয়ে গেলেও আমি তাকে দেখবার সৌভাগ্য লাভ করিনি।
কারণ?
কারণ তার মুখ সব সময় মুখোসে ঢাকা থাকতো।
প্রদীপ কুঞ্চিত করে কিছু চিন্তা করতে লাগলো।
মীরা বললো–কি ভাবছো প্রদীপ?
উ!
কি ভাবছো তুমি?
উঠে দাঁড়ায় প্রদীপ,চলো প্রাসাদে যাই, রাত অনেক হলো।
মীরা অনেক দিন পর আজ প্রথম শুনলো প্রদীপের গলার স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর। আনন্দে আপ্লুত হলো তার হৃদয়। বললো মীরা–চলো যাই।
প্রদীপ আর মীরা পায়ে পায়ে এগুচ্ছে, প্রতিদিনের মত প্রদীপের বাম হস্তখানা মীরার দক্ষিণ হস্তের মুঠায় ধরা রয়েছে।
প্রদীপ বললো–মীরা তোমার সঙ্গে আমার কয়েকটা কথা আছে।
বেশ তো বলো?
এখানে নয়, রাজপ্রাসাদে চলো।
আচ্ছা প্রদীপ, তুমি একদিন আমার ওখানে না গেলে বাঁচতে না। অস্থির হয়ে পড়তে, নানা ছলনায় তুমি হাজির হতে আমার কক্ষে। তারপর মনে পড়ে–তুমি আর আমি কোন্ অসীমে মিশে যেতাম? কত কথা, কত হাসি রাত ভোর হয়ে আসতো, তবু তুমি যেতে চাইতে না…
