রহমান ভাই, তুমিই তাহলে—
হাঁ, এসব আমারই কাজ। সেই কারণেই আমাকে ক্যাপ্টেন জমরুদীকে আটক রেখেছিলাম এবং সে এখনও ‘রকেটের একটি গুপ্ত ক্যাবিনে বন্দী রয়েছে। আমার কিছু মালও আছে জাহাজটিতে।
কায়েস বলে উঠলো এবার–রহমান ভাই, সর্দার বন্দী হলেন কি করে?এবার বলো –পুলিশের কবল থেকে তার উদ্ধারের কি উপায় আছে?
উদ্ধারের উপায় একটা করতেই হবে। কিন্তু–কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো রহমান।
কায়েস তাকিয়ে দেখলো, রহমানের মুখভাব গম্ভীর চিন্তাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ মৌন থেকে কিছু ভেবে নিলো রহমান, তারপর বললো কায়েস,রকেট এক সপ্তাহ কান্দাইয়ে অপেক্ষা করবে। এই কদিনের মধ্যে ক্যাপ্টেন জমরুদীকে মুক্তি দিতে হবে, তারপর আমার মালগুলিও নামিয়ে নেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু কি করে এ সব সম্ভব হবে, রহমান?
সব সম্ভব হবে। আমার মালগুলি জাহাজের খোলসের মধ্যে রয়েছে তেলের ড্রামের মধ্যে। খালাসীরা আমার মাল নামিয়ে দেবে, তুমি মহাজনের ছদ্মবেশে ড্রামগুলি গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে আসবে। আর আমি ক্যাপ্টেন জমরুদীর মুক্তির ব্যবস্থা করবো।
এবার বনহুরকে হাঙ্গেরী কারাকক্ষেই ফাসী দিয়ে হত্যা করা হবে। তাকে আর দুনিয়ার। আলো দেখতে দেওয়া হবে না। কি করে এবার সে পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে হাঙ্গেরী কারাকক্ষ থেকে পলায়ন করতে সক্ষম হয় দেখা যাবে।
৭ই জুন রাত্রি ১টায় দস্যু বনহুরকে হাঙ্গেরী কারাকক্ষে ফাঁসী দেওয়া হবে।
সংবাদটা পুলিশ মহল গোপন রাখতে চেষ্টা করলেও সুচতুর রহমানের কাছে গোপন রইলো না।
রহমানের মুখেই বনহুরের আস্তানার লোক জেনে ফেললো এ কথা। সমস্ত আস্তানা জুড়ে একটা দুশ্চিন্তার ঘনঘটা নেমে এলো। রহমান কিন্তু নীরব নিশ্চুপ, তার মুখে কোনো কথা নেই।
নাসরিন কেঁদে-কেটে আকুল হলো, এবার তাদের সর্দারের নিস্তার নেই। হাঙ্গেরী কারাগারে। মৃত্যু তার সুনিশ্চিত।
আস্তানার সবাই যখন বনহুরের মৃত্যুদন্ডাদেশ শ্রবণ করে মুষড়ে পড়েছে তখন রহমান এক সময় হাজির হলো চৌধুরী বাড়িতে।
অনেকদিন পর রহমানকে দেখে মনিরা প্রথমে নিজকে সংযত রাখতে পারলোনা। তার অন্তরের ব্যথা অশ্রু হয়ে নেমে এলো দু’নয়নে। বাস্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো মনিরা–রহমান, তোমাদের সর্দার কোথায়?
প্রথমে রহমান মনিরার কথায় কোনো জবাব দিতে পারলো না, কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে বললো–সর্দারের সন্ধান আমি জানিনা বৌরাণী।
মিথ্যে কথা বলতে তোমার এতোটুকু বাঁধলো না রহমান? তোমাদের সর্দার হাঙ্গেরী কারাকক্ষে বন্দী, একথা তুমি গোপন করতে চাও?
না।
তবে বলছিলে জানোনা?
এখনও বলছি আমি জানি না বৌরাণী।
রহমান, আমার কাছে মিথ্যে কথা! তোমাদের সর্দার মন্থনা দ্বীপে বন্দী হয়ে হাঙ্গেরী কারাকক্ষে মৃত্যুর জন্য প্রহর গুণছে, এ কথা তুমি অস্বীকার করতে চাও?
বৌরাণী! বৌরাণী…আমি জানিনা…আমি জানিনা।
আমি পাষাণ হয়ে গেছি রহমান। তুমি ভেবেছো, আমি তার বন্দী হবার কথা শুনে ভেঙে পড়বো, কিন্তু আর মুষড়ে পড়বো না। যাকে কোনোদিন বেঁধে রাখতে পারবো না, বৃথা তার মায়া…গলা ধরে আসে মনিরার।
রহমান বলে উঠলো–বৌরাণী, আজ আপনাকে একটা অনুরোধ করবো।
আঁচলে চোখ মুছে বললো মনিরা–বলো?
হাঙ্গেরী কারাগারে আপনাকে যেতে হবে।
কেন?
সর্দারের সঙ্গে আপনি সাক্ষাৎ করবেন।
কি করে তা সম্ভব রহমান?
আমি তার ব্যবস্থা করবো।
কান্দাই শহরে হাঙ্গেরী কারাগারে দস্যু বনহুর আবদ্ধ। তার মৃত্যুদন্ডের আদেশ প্রচার করা হয়েছে। এমতাবস্থায় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা যে অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার তাতে সন্দেহ নেই।
রহমান মনিরার সঙ্গে আরও কিছু সময় আলাপ আলোচনা করার পর নূরকে দেখতে চাইলো।
মনিরা নূরকে ডেকে পাঠালো, অল্পক্ষণেই সরকার সাহেবের সঙ্গে নূর এসে পৌঁছে গেলো।
রহমান ছদ্মবেশে এলেও নূর তাকে চিনে নিলো, লাফিয়ে কোলে চেপে গলা জড়িয়ে ধরলো–কাক্কু, আমার বাপি কই? আমার মাম্মী?
তোমার বাপি অনেক দূরে আছে নূর। আর তোমার মাম্মীতে এই তোমার সামনে।
না ও আমার মাম্মী নয়, আমার মা। বলোনা কাকু, মাম্মী আর আসেনা কেন?
আর সে কোনোদিন আসবে না। তুমি মার কাছে থাকো নূর।
মনিরা একটু গম্ভীর হলো, নূরকে লক্ষ্য করে বললো–যাও এবার নূর।
সরকার সাহেব হাত বাড়ালেন।
নূর রহমানের কোল থেকে সরকার সাহেবের কোলে লাফিয়ে পড়লো, তারপর হেসে বললো–কাক্কু টা টা…
সরকার সাহেব নূরকে নিয়ে চলে গেলেন।
রহমান নূরের দিকে তাকিয়েছিলো, কি যেন চিন্তা করছিলো সে গভীরভাবে। হয়তো বা সর্দারের স্মৃতি স্মরণ হচ্ছিলো তার মনে।
মনিরা বললো রহমান!
বলুন বৌরাণী?
একটা কথা আজ আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করবো, সঠিক জবাব দেবে তো?
নিশ্চয়ই দেবো। নিশ্চয়ই দেবো বৌরাণী, বলুন?
রহমান, নূরের কথা-বার্তা ও আচরণে আমি বেশ বুঝতে পারি নূর তোমাদের আস্তানাতেই ছিলো, এবং তোমাদের সর্দার এমন কাউকে তার মাম্মীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো যাকে সে আজও ভুলতে পারছে না।
রহমান মনিরার কথাগুলো নিশ্চুপ শুনে চললো।
মনিরা বলেই চলেছে রহমান, তুমি ঠিক জবাব দাও কে সে নারী এবং তোমাদের সর্দারের সঙ্গে কি তার সম্বন্ধ?
রহমান দস্যু বনহুরের সহকারী শ্রেষ্ঠ অনুচর। আজ সে একটা নারীর কাছে কাবু হয়ে গেলো। কি জবাব দেবে চট করে ভেবে উঠতে পারলোনা। ঢোক গিলে বললোহ, নূর আমাদের আস্তানাতেই ছিলো, কিন্তু কিছুদিন হলো সে আরাকানে আমার সঙ্গে গিয়েছিলো।
