রহমান ছিলো–সেও ডুব মেরেছে কোথায় কে জানে! সর্দারের নিরুদ্দেশের পর রহমানও একদিন কোথায় চলে গেছে কাউকে কিছু না জানিয়ে।
উপস্থিত আস্তানার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলো কায়েস। আর নাসরিন যোগাতো তাতে উৎসাহ।
বনহুরের অনুচরগণ ছিলো অত্যন্ত কর্তব্যপরায়ণ। বনহুর এদের তৈরি করে নিয়েছিলো নিজ মনের মত করে। যেমন দুর্দান্ত সাহসী ছিলো ওরা তেমনি ছিলো নিষ্ঠাবান। সর্দারের বিনা। অনুমতিতে তারা সামান্য কোনো দস্যুতাও কখনও করতো না। সর্দারের অভাবে তারা বাধ্য হতো রহমানের আদেশ পালন করতে।
সর্দার নেই, রহমান নেই, কাজেই অনুচরগণ সবাই নীরবে দিন যাপন করছিলো। তাই বলে কেউ বসে থাকতো না, যার যা কাজ করে যেতে মনোযোগ সহকারে। সর্দার ফিরে এলে তাদের ক্রটি যেন ধরতে না পারে।
হঠাৎ এমন দিনে সর্দারের গ্রেপ্তার-সংবাদ আস্তানার সবাইকে ভাবিয়ে তুললো। সমস্ত অনুচরগণ একত্রিত হয়ে যুক্তি-পরামর্শ করে চললো। নাসরিনও যোগ দিলো সকলের সঙ্গে।
সেদিন দরবার কক্ষে দস্যু বনহুরের অনুচরদের মধ্যে একটা আলোচনা সভা বসেছিলো।
কায়েস সর্দারের সুউচ্চ আসনের পাশে দাঁড়িয়ে বলছিলো–ভাইসব, আজ যে সংবাদ আমরা শুনলাম তাতে আমাদের মুষড়ে পড়ার কিছু নেই। আমরা জানি, আমাদের সর্দারকে কোনো কারাগার আটকে রাখতে সক্ষম হবে না। তবু আমাদের উপায় খুজতে হবে–কিভাবে আমরা তাকে মুক্ত করে আনতে পারি বা পারব। সব চেয়ে বড় আফসোস আজ রহমান ভাই নেই, সে থাকলে এ ব্যাপারে আমরা তার কাছে যথেষ্ট পরামর্শ পেতাম…
কায়েসের কথা শেষ হয় না, রহমান কক্ষে প্রবেশ করে। সঙ্গে সঙ্গে বনহুরের সমস্ত অনুচর আনন্দধ্বনি করে উঠে। কায়েস উচ্চস্থান হতে নেমে এসে রহমানকে কুর্ণিশ করে দাঁড়ায়, বলে সে–রহমান ভাই, তুমিও সর্দারের সঙ্গে এমন করে কোথায় ডুব মেরেছিলে বলোতো? এসেছো ভালোই হলো, সর্দারের গ্রেপ্তার-সংবাদ শুনে আমরা বড় অস্থির হয়ে পড়েছি।
রহমান মৃদু হেসে বললো–নিশ্চিন্ত থাকো ভাই সব, সর্দার বন্দী হয়েছে, তাতে অস্থির হবার কি আছে। তাকে আটকে রাখে, এমন শক্তি পৃথিবীর কারো নেই।
দরবার কক্ষস্থ সকলে জয়ধ্বনি করে উঠলো।
রহমান আসন গ্রহণ করে বললো-কায়েস, তোমাকে একটি কাজ করতে হবে।
বলো রহমান ভাই।
জাহাজ ‘রকেটে আমার অনেক মাল আছে।
মাল! বললো কায়েস।
হাঁ,সোনা-দানা-মনি-মুক্তা অনেক কিছু–
কিন্তু সংবাদে জানতে পারলাম রকেটেই নাকি সর্দারকে বন্দী করে কান্দাই আনা হয়েছে।
হাঁ, আমিও সেই জাহাজে ছিলাম। আর শোন, ঐ জাহাজেই একটি গোপনকক্ষে বন্দী আছে ‘শাহানশাহ জাহাজের ক্যাপ্টেন জমরুদী!
ক্যাপ্টেন জমরুদী’রকেটে বন্দী আছে! বলো কি রহমান ভাই?
রহমান এবার বললো–চলো বিশ্রামকক্ষে যাই, অনেক কথা আছে।
তখনকার মত দুবারকক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে এলো রহমান আর কায়েস।
অন্যান্য অনুচরগণ যে যার কাজে চলে গেলো।
রহমান তার নিজের বিশ্রামকক্ষে এসে বসলো। কায়েসকে বসার জন্য ইঙ্গিত করলো সে।
কায়েস আসন গ্রহণ করে বললো–রহমান ভাই, আমার কাছে সব যেন কেমন ঘোরালো লাগছে!
ঘোরালোর চেয়েও ঘোরালো ব্যাপার। সব শোনে কায়েস।
বলো রহমান ভাই।
হ কি বলছিলাম, জাহাজ ‘রকেটে একটি চোরা ক্যাবিনে বন্দী আছে ‘শাহানশাহের আসল। ক্যাপ্টেন জমরুদী। আর জমরুদীর বেশে শাহানশাহ’র ক্যাপ্টেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম আমি।
তুমি?
হাঁ, শুধু ক্যাপ্টেন জমরুদীর ভূমিকায় অভিনয়ই করিনি, দস্যু বনহুরের ভূমিকাও অবশ্য করেছিলাম।
বলো কি রহমান ভাই!
বন্ধাই-এর গভর্ণর মিঃ রাজেন্দ্র ভৌমের কন্যা মিস এরুণকে হরণ করে লুকিয়ে রেখেছিলাম। মিঃ ভৌমের যথাসর্বস্ব আমি কেড়ে নিয়েছিলাম, শুধু তার আচরণে আমি ক্রুদ্ধ হয়ে এ কাজ করেছি।
তার অপরাধ?
গভর্ণর হয়ে তিনি গোপনে চোরা চালানিদের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এটা শুধু তার অপরাধ নয়–তার চরম পাপ। মিস এরুণাকে হরণ করার পিছনে আমার কোনো উদ্দেশ্য ছিলো না, কিন্ত তাকে বন্দী করে রেখে মিঃ ভৌমকে আরও ভাবিয়ে তোলাই ছিলো আমার উদ্দেশ্য।
মিস এরুণা এখন কোথায়?
তাকে বন্ধাই তার পিতার কাছে ফেরৎ পাঠিয়ে দিয়েছি।
তার অসৎ উপায়ের অর্থ?
সেগুলো আমার কাছে আছে। শুধু সেগুলোই নয়, মন্থনার পুলিশ সুপার মিঃ মুখার্জীর প্রচুর সম্পদ আমি চুরি করে নিয়েছি। সেগুলো তাকে ফেরৎ দেওয়া সমীচীন মনে করিনি।
কারণ মন্থনা দ্বীপবাসীদের যা অবস্থা, সে সম্পদগুলি আমি মন্থনা দ্বীপবাসীদের মধ্যে বিলিয়ে দেবো মনস্থ করেছি।
তাহলে রহমান ভাই, তুমিই–
হ কায়েস, যদিও এটা আমার চরম অপরাধ হয়েছে।
সর্দারের বেশ ধারণ করে আমিই দস্যু বনহুরের ভূমিকা অবলম্বন করেছিলাম। কান্দাই থেকে মন্থনা দ্বীপ, মন্থনা দ্বীপ থেকে বন্ধাই পর্যন্ত আমি প্রচন্ড এক ঝড় বইয়ে দিয়েছে। কিন্তু কেনো। জানো? গলাটা কেমন যেন ভার হয়ে এসেছে রহমানের।
কায়েস একটু অবাক হয়ে তাকালো রহমানের মুখের দিকে।
রহমান আবার বলে চললো–সর্দারের সন্ধানে আমি বাধ্য হয়েছিলাম তার বেশ ধারণ করতে। জানতাম তার নাম নিয়ে কেউ যদি জঘন্য কুকর্ম শুরু করে তিনি তা সহ্য করবেন না, যেখানেই থাক বেরিয়ে পড়বেন, কুকর্মকারীকে শায়েস্তা না করে তিনি স্বস্তি পাবেন না। কায়েস, শুধুমাত্র সর্দারের আত্মপ্রকাশ কারণেই আমি এ কাজ করেছি, শুধু দস্যুতাই নয়–আমি মনের বিরুদ্ধে নারীহরণ পর্যন্ত করেছি।
