মিঃ আহম্মদ তারবার্তা সম্বন্ধে মিঃ মুখার্জীকে সব খুলে বলেন, এবং একখানা ষ্টীমার নিয়ে শাহানশাহ’কে ফলো করবার জন্য নির্দেশ দিলেন। আরও জানালেন শাহনশাহে’র ক্যাপ্টেন জমরুদীকে যেন বন্দী করা হয়। তিনি নিজেই শাহনশাহ’কে অনুসরণ করতেন, কিন্তু দস্যু বনহুরকে বন্দী করতে পেরেছেন এটাই তার সৌভাগ্য, বিশেষ করে দস্যুকে নিয়ে মন্থনায় আর একটি দিনও অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।
মিঃ আহম্মদ ‘রকেটে’ দস্যু বনহুরকে বন্দী করে নিয়ে কান্দাই-এর পথে রওয়ানা দিলেন।
দস্যু বনহুরকে বন্দী করা কম কথা নয়, সেই দস্যুকে বন্দী করে নিয়ে ফিরে চলেছেন মিঃ আহম্মদ তার দলবল নিয়ে। মজবুত লৌহশিকলে বনহুরের দেহ শৃঙ্খলাবদ্ধ। এবার আহম্মদ সাহেব ভুল করেননি, পা এবং হাত লৌহশিকলে আবদ্ধ করেছেন যেন কোনোরকমে পালাতে। সক্ষম না হয়।
‘রকেটের একটি সুদৃঢ় ক্যাবিনে তাকে আটক করে রাখা হয়েছে। ক্যাবিনের দরজার আশে পাশে সশস্ত্র পুলিশ সদা দন্ডায়মান। এবার যেন কোনো রকম সুযোগ না পায় যে ফাঁকে সে। পালাতে পারে।
মিঃ আহম্মদের মনে আনন্দ–এবার তার যাত্রা সাফল্য মন্ডিত হলো। নিজে তিনি দস্যুসম্রাট বনহুরকে বন্দী করতে সক্ষম হয়েছেন।
পৌঁছানোর পূর্বেই মিঃ আহম্মদ কান্দাই পুলিশ অফিসে খবর পাঠিয়েছেন, দস্যু বনহুরকে নিয়ে তিনি কান্দাই অভিমুখে রওয়ানা দিয়েছেন।
দস্যু বনহুর সহ ‘রকেট’ তার গন্তব্যস্থান কান্দাই বন্দরে পৌঁছে গেলো।
মিঃ আহম্মদ যেন নিশ্বাস ফেলে বাঁচলেন। দস্যু বনহুরকে নিয়ে তিনি ভালোয় ভালোয় কান্দাই এসে পৌঁছতে পেরেছেন।
বন্দরে অবতরণ করতেই দেখলেন মিঃ আহম্মদ মিঃ জাফরী অসংখ্য পুলিশ ফোর্স নিয়ে বন্দরে অপেক্ষা করছেন। মিঃ আহম্মদ জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে আনন্দের আতিশয্যে। কেমন করে তিনি কান্দাই এলেন এবং কি ব্যাপার সব জানতে চাইলেন।
মিঃ জাফরী নিজের কথা বলার পূর্বে ব্যস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন শাহনশাহ’ জাহাজটিকে আটক করা হয়েছে কিনা এবং ক্যাপ্টেন জমরুদীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিনা।
মিঃ আহম্মদ জানালেন, কান্দাই থেকে তারবার্তা পাওয়ার পূর্বেই শাহানশাহ’ মন্থনা বন্দর ত্যাগ করেছিলো, কাজেই মিঃ জাফরীর কথামত কাজ করতে সক্ষম হয়নি তারা। মন্থনার পুলিশ। বাহিনী ষ্টিমার যোগে শাহনশাহ’কে অনুসরণ করেছেন। মিঃ মুখার্জী স্বয়ং এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, নিশ্চয়ই সফলকাম হবেন।
মিঃ জাফরী এ ব্যাপারে কতখানি আশ্বস্ত হলেন তিনিই জানেন। মিঃ জাফরীর মনে একটা সন্দেহ দোলা দিচ্ছিলো, ক্যাপ্টেন জমরুদী যে স্বাভাবিক কোনো মানুষ নয়, সেই যে দস্যু বনহুর এমনি একটা ধারণা তাঁর মনে সুদৃঢ় হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু যখন মিঃ আহম্মদ দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এলেন, অথচ শাহানশাহ’তে ক্যাপ্টেন জমরুদী বন্ধাই অভিমুখে চলেছে। জানতে পারলেন তখন তিনি একটু চিন্তায় পড়লেন তবে ক্যাপ্টেন জমরুদী লোকটা কে?
মিঃ আহম্মদকে তিনি সংক্ষেপে বললেন তার বন্দী হবার কাহিনী। শাহানশাহে’র একটি চোরা কুঠরীতে তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছিলো এবং সেখানেই তিনি বেশ কিছুদিন বন্দী অবস্থায় ছিলেন, তার উপর কোনো রকম অত্যচার বা উৎপীড়ন করা হয়নি।
মিঃ জাফরীর কথা শুনে মিঃ আহম্মদ অবাক হলেন, তাঁরা যে জাহাজে ছিলেন সেই জাহাজেই বন্দী ছিলেন মিঃ জাফরী এ যেন তাদের কল্পনার অতীত।
মিঃ জাফরী আরও বললেন–একদিন আমি নিদ্রাভঙ্গের পর হঠাৎ চোখ মেলে দেখি, আমি কান্দাই-এ আমার কক্ষে ঘুমিয়ে আছি। আশ্চর্য, আমাকে শয়তান কিভাবে ঘুম পাড়িয়ে সুদূর মন্থনা দ্বীপ হতে কান্দাই নিয়ে এসেছিলো, এতটুকু আমি জানতে পারিনি। কিন্তু আমি সন্দেহ করেছিলাম ক্যাপ্টেন জমরুদীই দস্যু বনহুর। তার কার্যকলাপে সেই রকম আমার মনে হয়েছিলো। এখন দেখছি জমরুদী পৃথক জন।
কিন্তু মিঃ জাফরীর সন্দেহ সত্যে পরিণত হলো দস্যু বনহুরকে কারাগারে বন্দী করার পর।
মিঃ মুখার্জী তার পাঠিয়েছেন, শাহানশাহ’ জাহাজটিকে আটক করতে সক্ষম হয়েছি, কিন্তু আশ্চর্য! ক্যাপ্টেন জমরুদী উধাও হয়েছে! জাহাজের দ্বিতীয় ক্যাপ্টেন লোহানী জানিয়েছেন তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় মন্থনা দ্বীপেই রয়ে গেছেন।
মিঃ জাফরী মিঃ মুখার্জীর তারবার্তা পেয়ে বুঝতে পারলেন দস্যু বনহুরই ক্যাপ্টেন জমরুদী এবং জমরুদীই দস্যু বনহুর। দস্যু বনহুর গ্রেপ্তারের মাধ্যমেই লুকানো রয়েছে জমরুদীর অন্তর্ধান।
সমস্ত কান্দাই শহরে দস্যু বনহুর গ্রেপ্তার বাণী বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়লো। রেডিও ঘোষণা করলো, পত্রিকায় প্রকাশ পেলো, টেলিভিশনে জানানো হলো–দস্যু বনহুর মন্থনা দ্বীপের অদূরে ঝাঁম জঙ্গলে গ্রেপ্তার হয়েছে।
মনিরা সংবাদ শোনামাত্র অস্থির হয়ে পড়লো।
মরিয়ম বেগম নীরবে অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলেন। জায়নামাজে খোদার কাছে মোনাজাত করতে শুরু করলেন। তিনি ছাড়া আর কিইবা উপায় আছে তার?
সরকার সাহেবও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন, তাঁর মনেও অশান্তির ঝড় উঠলো।
*
সংবাদটা বনহুরের আস্তানাতেও পৌঁছে গেলো। বনহুরের অনুচরগণ এতোদিন জানতো তাদের সর্দার দূরে কোথাও আত্মগোপন করে তার কাজ করে যাচ্ছে, তবু সান্ত্বনা ছিলো সকলের মনে। হঠাৎ সর্দারের গ্রেপ্তারবাণী শুনে মুষড়ে পড়লো সবাই।
