এ জঙ্গলটা মন্থনার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে। বড় বড় শাল আর সেগুন গাছে জঙ্গলটা ঘন হয়ে উঠেছে। বন্য জীবজন্তুর অভাব নেই। সাবধানে চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলেছেন মিঃ আহম্মদ তাঁর দলবল নিয়ে।
একটা ব্যাপারে আহম্মদ সাহেব আজ অনেকটা আশ্বস্ত হতে পেরেছেন গত কয়েকদিন পূর্বে মন্ত্রিকন্যা মীরা ফিরে এসেছে। মীরার জবানবন্দীতে জানতে পেরেছেন–দস্যু তাকে হরণ করে নিয়ে গেলেও সে তার উপর কোনোরকম খারাপ আচরণ করেনি। মীরার মুখে আরও জেনেছেন–দস্যুর যে বর্ণনা সে দিয়েছে তাতে বোঝা যায়, দস্যু বনহুরেরই এ কাজ। তাতে মিঃ আহম্মদ বদ্ধপরিকর হয়েছেন, মন্থনায় বসে দস্যু বনহুর তার কার্য সমাধা করে চলেছে; এবং মিঃ জাফরীকেও সে-ই বন্দী করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মিঃ আহম্মদ বিপুল বিক্রমে তাই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মিঃ মুখার্জী মন্থনার পুলিশ বাহিনী নিয়ে তাঁকে সর্বান্তকরণে সাহায্য করে চলেছেন। এটা তাঁরও কর্তব্য।
আজ মন্থনা দ্বীপের শেষ প্রান্তে তারা এসে পৌঁছেছেন, মন্থনা শহর ছেড়ে প্রায় একশত মাইল। দূরে এ জঙ্গল।
মিঃ জাফরী এবং মিঃ মুখার্জী তাদের পুলিশ বাহিনী নিয়ে জঙ্গলটা চষে বেড়াচ্ছেন তাঁদের ধারণা–এ জঙ্গলেই কোথাও দস্যু বনহুর তার আস্তানা গেড়েছে।
সমস্ত বনে সন্ধান চালাতে পুরো তিন দিন কেটে গেলো। পুলিশ অফিসার গণ কেউ কেউ বাঘ এবং হরিণ শিকার করলেন। মস্ত বড় একটা অজগর সাপ শিকার করলেন মিঃ আহম্মদ তৃতীয় দিনে!
অজগর সাপটা মারলেন তাঁরা জঙ্গলের উত্তর-দক্ষিণ অঞ্চলের শেষ প্রান্তে। বিরাট অজগর, একটা গাছের গুঁড়ির মত গড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছিলো, হয়তো বা শিকারের সন্ধানে সর্পরাজ চলেছিলেন মন্থর গমনে।
অজগর সাপটাকে নিহত করার পর পুলিশ বাহিনী সাপটাকে ঘিরে ধরে দেখছিলেন এমন সময় হঠাৎ একজনের দৃষ্টি চলে গেলো দূরে অনেক দূরে একটা নদীর তীরে। ঝোপ-জঙ্গলের ফাঁকে দেখা যাচ্ছে একটি জমকালো পোশাক-পরা লোক নদী-তীরে এগিয়ে যাচ্ছে। পিঠের সঙ্গে লোকটার রাইফেল বা বন্দুক জাতীয় কিছু বাঁধা রয়েছে। লোকটি দৃষ্টি আকর্ষণ করলো মিঃ আহম্মদের।
মিঃ আহম্মদ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটা বের করে চোখে লাগিয়ে দেখলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি চাপা কণ্ঠে বললেন–পেয়েছি, আমরা যাকে সন্ধান করে ফিরছি সেই দুর্দান্ত দস্যু বনহুর। দূরবীক্ষণে চোখ লাগিয়ে স্পষ্ট দেখলেন–জমকালো পোশাক-পরা মাথায় পাগড়ি লোকটা নদীর ধরে হাটু গেড়ে বসে দু’হাতে পানি পান করছে।
মিঃ আহম্মদ ইংগিৎ করলেন সমস্ত পুলিশ বাহিনীকে প্রস্তুত হয়ে নিতে। তাঁর চোখ দুটো আগুনের গোলার মত জ্বলজ্বল করে জ্বলছে যেন।
মুহূর্তে সমস্ত পুলিশ বাহিনী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তৈরি হয়ে পড়লো। তারপর দ্রুত অগ্রসর হলো ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে।
মিঃ আহম্মদ দলবল নিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলো তাদের নির্দিষ্ট স্থানে।
নদীতীরে পানি পান করে একটা বৃক্ষতলে এসে কেবলমাত্র বসেছে দস্যু বনহুর।
চারিদিক থেকে অস্ত্র উদ্যত করে পুলিশ বাহিনী তাকে ঘিরে ধরলো। মিঃ আহম্মদ কঠিন বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে বললেন–খবরদার নড়োনা। এক চুল নড়লেই মরবে।
মিঃ আহম্মদের রিভলভার দস্যু বনহুরের বুক লক্ষ্য করে উদ্যত রয়েছে–চারিদিকে অসংখ্য রাইফেল আর পিস্তল।
বনহুর উঠে দাঁড়ালো হঠাৎ এভাবে আক্রমণের জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিলোনা।
মিঃ আহম্মদ তার দলবলকে ইংগিৎ করলেন।
সঙ্গে সঙ্গে মিঃ মুখার্জী স্বহস্তে দস্যু বনহুর হস্তে হাত কড়া পরিয়ে দিলেন। দস্যু বনহুরকে একটি শব্দও উচ্চারণ করবার সময় না দিয়ে তাকে মজবুত করে বেঁধে ফেলা হলো।
*
দস্যু বনহুর বন্দী হওয়ায় মন্থনা দ্বীপে এক মহা আনন্দ স্রোত বয়ে চললো। নগরের সৌধচূড়ায় বড় বড় অক্ষরে লেখা “দস্যু বনহুরের কবল থেকে মন্থনা দ্বীপের মুক্তি।
আবার মন্থনায় ফিরে এলো স্বাভাবিক স্বস্তি। দ্বীপবাসী নিশ্বাস ফেলে বাঁচলো এবার।
বহুদিন ধরে যে সব জলযান মন্থনা বন্দরে অবস্থান করছিলো সবগুলিকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলো।
শাহানশাহ’ জাহাজ ঘটা করে মন্থনা বন্দর ত্যাগ করলো। মিঃ আহম্মদ এবং অন্যান্য পুলিশ বাহিনী দস্যু বনহুরকে বন্দী করে জাহাজ রকেটে কান্দাই অভিমুখে রওয়ানা দিলো।
‘রকেট অতি দ্রুতগামী মজবুত জাহাজ। দস্যু বনহুরের জন্য এই জাহাজেরই প্রয়োজন।
মিঃ আহম্মদ পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ জাফরীর জন্য অত্যন্ত ব্যথা অনুভব করলেন, কিন্তু তিনি আর মন্থনায় বিলম্ব করতে পারলেন না। দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করেছেন, সে এখন তাদের হাতে বন্দী, এ অবস্থায় আর দেরী করা উচিৎ নয়। কান্দাই-এ হাঙ্গেরী কারাগার ছাড়া বনহুরকে আটকে রাখার মত আর কেনো কারাগার ছিলো না।
কিন্তু মিঃ আহম্মদ যে মুহূর্তে মন্থনা দ্বীপ ত্যাগ করবেন ঠিক সেই মুহূর্তে কান্দাই থেকে মিঃ আহম্মদের নিকটে তারাবার্তা এলো। আশ্চর্য হলেন তিনি তারবার্তা পেয়ে। কান্দাই থেকে মিঃ জাফরী তাঁকে এ তার পাঠিয়েছেন, জাহাজ ‘শাহান শাহ’কে আটক করার জন্য তিনি। জানিয়েছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপ্টেন জমরুদীকে যেন বন্দী করা হয়।
মিঃ আহম্মদ যখন কান্দাই থেকে মিঃ জাফরীর তারবার্তা পেলেন তখন শাহনশাহ’ মাঝ দরিয়ায়।
