তারপর আমি ধীরে ধীরে নৌকাখানার উপরে ঢলে পড়লাম আর মনে নেই।
মীরা, দস্যু তোকে অজ্ঞান করেছিলো?
হাঁ মা, তারপর যখন জ্ঞান হলো চেয়ে দেখি সুন্দর সুসজ্জিত একটি কক্ষে সজ্জিত বিছানায় শুয়ে আছি। বিছানায় উঠে বসতেই একটি বৃদ্ধলোক আমাকে দুধ আর ফলমূল খেতে দিলো। আমি অবাক কণ্ঠে বললাম, এখন আমি কোথায়? বৃদ্ধলোকটি বললো, তুমি ভাল জায়গায় আছো এ সব খেয়ে বিশ্রাম করো। আমি কাঁদাকাটা শুরু করলাম, যখন কিছু মুখে দিলাম না, তখন এক সময় সেই লোকটি এলো, যার মুখমণ্ডল আমি কোনো সময় দেখতে পাইনি। কালো আবরণে তার মুখ ঢাকা ছিলো। সে বললো, তোমাকে আমি কিছুদিন এখানে আটকে রাখবো তারপর আবার তুমি ফিরে যাবে তোমার প্রিয় রাজকুমারের পাশে। আমি তার কথা বিশ্বাস করিনি, কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, সে যা বলেছে সব সত্য।
তোকে সে নিজেই রেখে গেছে?
না মা, আমি রাতে আমার সেই কক্ষে ঘুমিয়েছিলাম। ভোরে জেগে দেখি আমি এখানে–
চন্দ্রনাথ বিজ্ঞেরমত মাথা দুলিয়ে বললেন–দস্যু বনহুর ছাড়া এটা অন্য কারো কাজ নয়। শুনেছি দস্যু বনহুর নাকি শুধু মহৎই নয় তার অন্তর অত্যন্ত উঁচু।
মা, প্রদীপ কেমন আছে?
আগের চেয়ে অনেকটা সুস্থ হয়েছে সে।
আমি তার সঙ্গে দেখা করে আসি।
যাও মা, যাও–বললেন চন্দ্রনাথ।
মীরা ছুটে গেলো চঞ্চল হরিণীর মত।
প্রাতঃভ্রমণ করছিলো প্রদীপ তাদের বাগানের মধ্যে। পায়চারী করছিলো আর গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছিলো।
মীরা ছুটে এলো, প্রদীপকে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার বুকে–প্রদীপ!
প্রদীপ নীরব, পাথরের মূর্তির মত স্থির।
মীরা ব্যাকুল কণ্ঠে বললো–প্রদীপ, তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছোনা? কথা বলো, কথা বলো প্রদীপ?
প্রদীপ তবুও নিরুত্তর।
মীরা প্রদীপের জামার আস্তিন ধরে ঝাঁকুনি দেয়–কথা বলছেনা কেনো? তুমি কোনেদিন আমাকে অবিশ্বাস করবে না, করতে পারবেনা। প্রদীপ, আমি যে তোমার–তোমারই আছি।
মীরা।
বলো? বলো কি বলতে চাও?
আমি কে মীরা?
একি কথা বলছো প্রদীপ? তুমি আমার প্রদীপ।
না না মীরা, আমি প্রদীপ নই। আমি প্রদীপ নই—
চুপ করো, চুপ করো প্রদীপ। আশ্চর্য তুমি মানুষ। কতদিন পর ফিরে এলাম অথচ তুমি আমাকে কোনো কথা জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করলে না। দস্যু আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে আমি কেমন ছিলাম তাও তুমি জানতে চাইলে না? প্রদীপ এ কদিন আমি শুধু তোকেই ধ্যান করেছি, তোমার ঐ মুখখানা আমি মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারিনি। প্রদীপ, চলো প্রাসাদে যাই, তোমার বাবা মা আমাকে সচ্ছ মনে গ্রহণ করবেন কিনা জানিনে। যদি তারা আমাকে সন্দেহ করে তাহলে কি হবে প্রদীপ?
আমি তো তোমাকে গ্রহণ করেছি মীরা।
প্রদীপের কথায় মীরার চোখদুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠে, বলে সেই আজ আমার কি আনন্দ! কি আনন্দ প্রদীপ! কেমন করে তোমাকে বোঝারো! মীরা প্রদীপের বুকে মাথা রাখে।
প্রদীপ ওকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করতে যায় সঙ্গে সঙ্গে মীরাকে মুক্ত করে দিয়ে বলে না না মীরা, তুমি যাও। তুমি যাও মীরা।
কেনো তুমি অমন করছো?
প্রদীপ দক্ষিণ হাতের আংগুলে নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে থাকে, অধর দংশন করে বার বার।
মীরা লক্ষ্য করলো, প্রদীপের মুখমন্ডল কেমন যেন বিবর্ণ লাগছে।
মীরা বললো–প্রদীপ, তুমি কি অসুস্থ বোধ করছো?
হাঁ, আমি বড় অসুস্থ বোধ করছি। মীরা আমাকে একা থাকতে দাও। আমাকে একা থাকতে দাও–
প্রদীপ! প্র
দীপ তখন বসে পড়েছে বাগানস্থ পাথরাসনে।
মীরা বসে ওর চুলে-পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। মীরার মুখেও দুশ্চিন্তার ছাপ ভেসে উঠেছে।
যে প্রদীপ তার সঙ্গ ছাড়া একমুহূর্ত বাঁচতো না, আজ সেই প্রদীপ তাকে চলে যাবার জন্য। বলতে পারছে! মীরার অন্তরে একটা ব্যাথার খোঁচা লাগে। কিন্তু সে প্রদীপের কথা মত চলে গেলো না; মীরা জানে প্রদীপ মাথায় আঘাত পাওয়ার দরুণ তার স্মৃতি বিস্মৃতি ঘটেছে। মীরা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো, প্রদীপের পিঠে মাথা রেখে বললো–প্রদীপ, তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিতে পারবে না। আমি যে তোমার। তুমি ছাড়া মীরা বাঁচতে পারে না।
প্রদীপ কোনো জবাব দেয়না, ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় মীরার দিকে।
মীরা এগিয়ে আসে প্রদীপের পাশে, মুখটা তুলে ধরে তার চোখের সম্মুখে, বলে মীরা–অমন করে আমার মুখে তাকিয়ে কি দেখছো প্রদীপ?
কিছু না মীরা। কিছু না!
প্রদীপ, তুমি যেন আগের সেই প্রদীপ নেই, কেমন যেন হয়ে গেছে। কোনোদিন কি তুমি আমাকে আগের মত করে বুকে টেনে নিতে পারবে না? সেই আবেগ মধুর কন্ঠে ডাকতে পারবে না মীরা বলে! কেন কেন তুমি আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছো?
জানি না।
প্রদীপ, ডাক্তার বলেছিলো তোমার স্মৃতি বিস্মৃতি ঘটেছে।
হয়তো তাই হবে।
আগের কথা তুমি স্মরণ করতে চেষ্টা করো?
পারছি না। পারছি না কোনো কথা স্মরণ করতে।
আমি কে আমাকে তুমি আজও চিনতে পারোনি?
না।
উঃ! মীরা দু’হাতে বুক চেপে ধরলো, তারপর ছুটে চলে গেলো সেখান থেকে!
প্রদীপ মীরার অদ্ভুত আচরণে আশ্চর্য হলোনা। ওর চলে যাওয়া পাথর দিকে তাকিয়ে কি যেন। গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলো।
*
মিঃ আহম্মদ কয়েকজন পুলিশ অফিসার ও সশস্ত্র পুলিশ মন্থনা গিয়ে দ্বীপের আশে পাশে পাহাড়ে জঙ্গলে সন্ধান করে চললেন।
গহন জঙ্গল।
দ্বীপের মধ্যে একজন একটা জঙ্গল থাকতে পারে প্রথমে ভাবতেই পারেনি মিঃ আহম্মদ। তিনি দলবল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন। জঙ্গলের এদিকটা মানুষ প্রবেশে সক্ষম নয়। তবু অনেক কষ্টে মিঃ আহম্মদ চলেছেন সাথীদের নিয়ে।
