ডাক্তারের কথায় মহারাজ জয়কান্তের মনে খুশির বান বয়ে যায়। মহারাণী কালীমন্দিরে জোড়া বলি দেবেন মানত করেন।
শুধু শান্তি নেই মন্ত্রি চন্দ্রনাথের মনে। একমাত্র মীরাকে হারিয়ে তিনি সংসার অন্ধকারময় দেখছেন। কোনো কাজে তিনি মনোযোগ দিতে পারছেন না, অশান্তি আর বেদনায় হৃদয়টা যেন তাঁর বিষিয়ে উঠেছে।
বৃদ্ধ মন্ত্রির এই অবস্থায় রাজপরিবারেও শান্তি নেই, ভাবী পুত্রবধু মীরার অন্তর্ধানে রাজবাড়ি কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। যেমন ফুল বিহনে বাগান অন্ধকার তেমনি। মন্ত্রিকন্যা হলেও মীরা সব সময় যেতো রাজবাড়িতে; প্রদীপ ছাড়া মীরা এক দন্ড থাকতে পারতোনা। প্রদীপও তেমনি ভালবাসতো মীরাকে।
প্রদীপ আর মীরার প্রেমানন্দে মুখর হয়ে উঠেছিলো সমস্ত মন্থনা দ্বীপ।
হঠাৎ আলো নিভে গেলে কক্ষ যেমন অন্ধকারময় হয়ে উঠে তেমনি প্রদীপ আর মীরার জীবন আকাশের ঘনঘটা নিরানন্দে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে সমস্ত দ্বীপবাসীর অন্তর।
শুধু তাই নয়, প্রদীপ আর মীরার মধ্যে যখন একটা মহাঝঞ্ঝা বয়ে চলেছে, এমন দিনে। আবির্ভাব হলো দস্যু বনহুরের। শুধু দস্যুতা করেই ক্ষান্ত হলোনা সে, হরণ করলো মন্ত্রিকন্যা মীরাকে। দুর্দান্ত দস্যুর এ অমানুষিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো মন্থনা দ্বীপবাসী। সবাই স্ত্রী কন্যা-ভগ্নি নিয়ে আতঙ্কে দিন যাপন করতে লাগলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ জাফরীর নিরুদ্দেশ। একা মহা আশঙ্কার সৃষ্টি করলো। অহরহ পুলিশ মন্থনা দ্বীপকে আচ্ছন্ন করে রাখলো।
মন্থনার কোনো লোকের মনে শান্তি নেই। অশান্তির বহ্নিজ্বালা তাদের নিষ্পেষিত করে চলেছে। সবাই দস্যু বনহুরের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত।
*
মীরা চোখ মেলে তাকালো, বিস্ময়ে আরষ্ট হয়ে গেলো সে। বিছানায় উঠে বসলো, সে কি স্বপ্ন দেখছে! চোখ মেলতেই মীরা দেখতে পেলো প্রদীপের ছবিখানা। এযে তার নিজের কক্ষ।
মীরা নিজের শরীর চিটি কেটে বুঝতে পারলো সে স্বপ্ন দেখছেনা।
শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো।
পাশের মুক্ত জানালা খুলে দিতেই এক হাল্কা ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া তার শরীরে মধুর পরশ বুলিয়ে গেলো। মীরা বুঝতে পারলো, ভোর হয়েছে।
দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো, তখনও বাড়ির কেউ জেগে উঠেনি। মীরা আনন্দে উচ্ছল হয়ে ছুটে গেলো, পিতা মাতার বন্ধ দরজায় আঘাত করে ডাকালো–বাবা, বাবা, মা, মাগো– মা, মা আমি এসেছি–
কন্যার কণ্ঠস্বর কানে যেতেই ধড়মড় করে শয্যায় উঠে বসেন মন্ত্রি চন্দ্রনাথ, স্ত্রীকে ডেকে বলেন–কে ডাকে দেখোত! ঠিক মীরার গলা বলে মনে হচ্ছে যে?
মীরা! আমার মীরা ফিরে এসেছে! তাড়াতাড়ি মন্ত্রিপত্নী লতারাণী দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে। কন্যাকে সুস্থ দেহে সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যাকুল কণ্ঠে ডাকেন–মীরা!
মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ের বুকে–মা, মাগো।
ততক্ষণে মন্ত্রি চন্দ্রনাথ এসে দাঁড়িয়েছেন কন্যা এবং স্ত্রীর পাশে।
মন্ত্রি চন্দ্রনাথ বলেন–মীরা কি করে ফিরে এলি মা?
বাবা, সব বলছি, চলো।
চল্ মা, চল্ কিন্তু দস্যু তোকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো, প্রদীপকি আর তোকে ফিরে নেবে?
বাবা, তোমরা শুনে আশ্চর্য হবে, দস্যু আমাকে হরণ করে নিয়ে গিয়েছিলো সত্য, কিন্তু আমাকে সে স্পর্শ করেনি বাবা। দস্যু হলেও তার মত মহৎ আমি দেখিনি। তুমি বিশ্বাস করো বাবা, আমি সেখানে এতটুকু কষ্ট পাইনি। আমাকে সেখানে রাজকন্যার মত রাখা হয়েছিলো।
তাহলে তোকে চুরি করে নিয়ে যাবার কারণ কি ছিলো দস্যুর?
জানিনে বাবা। কিন্তু এইটুকুই জানি, দস্যু অতি মহৎ প্রাণ। আমার যে অলঙ্কারগুলি নিয়েছিলো সব ফেরৎ দিয়েছে।
সত্য বলছিস মীরা? বললেন লতা দেবী।
মীরা তার শরীরের দিকে তাকিয়ে সব অলঙ্কার দেখালো।
মন্ত্রি চন্দ্রনাথের চোখে মুখে বিস্ময়!
লতাদেবীর খুশিতে মুখমন্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বললেন তিনি–মা মীরা তোকে ফিরে পাবো সে আশা আমার ছিলোনা। আমি অবাক হচ্ছি দস্যু তোর গহনাগুলো কেড়ে নেয়নি।
মা, আমিও প্রথম ভেবেছিলাম দস্যু আমার উপর না জানি কত উপদ্রব করবে কিন্তু–কিন্তু আমাকে সে বোনের মত দেখেছে।
সব ঘটনা খুলে বল্ মা, আমি যে সব শুনতে চাই? বললেন চন্দ্রনাথ। মীরা পিতামাতা সহ কক্ষে গিয়ে বসলো।
মীরা বললো–বাবা, প্রদীপকে বেঁধে রেখে দস্যু যখন আমাকে কাঁধে উঠিয়ে নিলো তখন আমি হাত-পা ছুঁড়ে নিজকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু দস্যুর বলিষ্ঠ বাহু থেকে আমি মুক্তি পেলাম না।
মীরা বলে চললো মন্ত্রি এবং মন্ত্রিপত্নী সব মনোযোগ সহকারে শুনতে লাগলেন।
মীরা বলে চলেছে–একটা ছিপনৌকায় আমাকে নামিয়ে রেখে দস্যু গম্ভীর গলায় বললো, খবরদার নড়বে না, নড়লেই পড়ে যাবে নদীতে। আমি তোমাকে কিছু বলবোনা, তুমি চুপ করে বসে থাকো। আমি দস্যুর কথায় চোখ তুলে তাকালাম দেখলাম লোকটার শরীরে কালো পরিচ্ছদ মুখে কালো মুখোস–কিছু দেখা যাচ্ছে না। কেমন দেখতে লোকটা তাও দেখতে পেলাম না। কিন্তু আমি আশ্বস্ত হলাম তার কথায়। নদীতে ঝাঁপিয়ে না পড়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম তার পরবর্তী কার্যের জন্য। কিন্তু আমি অবাক হলাম একটা মিষ্টি গন্ধ আমার নাকে লাগলো ঠিক কোনো অজানা ফুলের সুরভীর মত।
তারপর? বললেন চন্দ্রনাথ।
