ভোরে শয্যা ত্যাগ করে মিঃ আহম্মদ অন্যান্য দিনের মত বেড টি পান করছিলেন এমন সময় পুলিশ ইনস্পেক্টার মিঃ হোসেন ব্যস্তসমস্ত হয়ে কক্ষে প্রবেশ করলেন–গুড মর্নিং স্যার।
গম্ভীর গলায় মিঃ আহম্মদ উচ্চারণ করলেন–গুড মর্নিং।
মিঃ হোসেন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন এবার–স্যার, মিঃ জাফরীকে তাঁর ক্যাবিনে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
মিঃ জাফরী! তা ব্যস্ত হবার কি আছে, নিশ্চয়ই দস্যু বনহুরের সন্ধানে মন্থনা দ্বীপে গেছেন।
না স্যার, তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ সব যেমন তেমনি আছে। নাইট ড্রেস তাঁর শরীরে ছিলো।
গম্ভীর গলায় বললেন মিঃ আহম্মদ। তাহলে নাইট ড্রেস পরে তিনি কোথায় গেলেন? নিশ্চয়ই জাহাজে কোথাও আছেন।
সমস্ত জাহাজ খোঁজা হয়েছে কিন্তু তিনি কোথাও নেই।
বলেন কি মিঃ হোসেন?
হাঁ স্যার।
মিঃ আহম্মদের মুখমন্ডল গম্ভীর ভাবাপন্ন হলো, তিনি তাড়াতাড়ি শয্যা ত্যাগ করে বললেন– চলুন ক্যাপ্টেনকে শীঘ্র সংবাদটা দেওয়া যাক্।
ক্যাপ্টেন জমরুদী সবেমাত্র শয্যা ত্যাগ করে ডেকের ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। ঠোঁটের ফাঁকে তার দামী চুরুট। মিঃ আহম্মদকে দেখেই হেসে বললেন–গুড মনিং পুলিশ সুপার। তারপর খবর কি? রাতে আকাশে মেঘ থাকায় গরমটা অত্যন্ত বেশি ছিলো, কাজেই ঘুম হয়নি বুঝি?
মিঃ আহম্মদ ব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন বড় দুঃসংবাদ ক্যাপ্টেন বড় দুঃসংবাদ।
দুঃসংবাদ!
হাঁ, মিঃ জাফরীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
হয়তো দস্যু বনহুরের সন্ধানে কোথাও ডুব মেরেছেন।
আমিও প্রথমে সেই রকম মনে করেছিলাম কিন্তু তিনি নাইট ড্রেস পরেই—
নাইট ড্রেস পরে!
হাঁ স্যার, নাইট ড্রেসটাই শুধু তাঁর ক্যাবিনে নেই, তা ছাড়া অন্যান্য জামা-কাপড়-টাই সব আছে। কথাগুলো বললেন ইনস্পেক্টর মিঃ হোসেন।
ক্যাপ্টেন জমরুদীর ললাটে চিন্তারেখা ফুটে উঠলো তিনি বললেন–নাইট ড্রেস পরে তিনি গেলেন কোথায়?
অল্পক্ষণের জন্য স্থানটায় নীরবতা বিরাজ করলো।
বললেন আবার ক্যাপ্টেন জমরুদী–পুলিশের লোক, হয়তো কোনো ছদ্মবেশে কোথাও গিয়ে থাকবেন। দেখুন অপেক্ষা করে ফিরে আসেন কিনা।
কিন্তু গোটা দিনটা চলে গেলো মিঃ জাফরী আর ফিরে এলেন না।
পুলিশ মহলে আবার নুতন এক আতঙ্ক দেখা দিলো।
মন্থনার আশে পাশে জলে-স্থলে-জঙ্গলে সব জায়গায় পুলিশ ছুটাছুটি করে ফিরতে লাগলো।
মিঃ আহম্মদ স্বয়ং কয়েকজন পুলিশ অফিসার সহ চষে ফিরতে লাগলেন মন্থনা দ্বীপটা– কোথায় মিঃ জাফরীকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এটাও যে দস্যু বনহুরের কাজ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর একবার মিঃ জাফরী দস্যু বনহুরের হস্তে বন্দী হয়েছিলেন, তারপর থেকে তিনি সব সময় দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু আবার মিঃ জাফরী বন্দী হলেন দস্যু বনহুরের হস্তে।
সমস্ত পুলিশ মহল ক্ষেপে উঠলো ভীষণভাবে। দস্যু বনহুর চরম আকার ধারণ করেছে, তাকে গ্রেপ্তার না করা অবধিস্বস্তি নেই কারো।
শুধু মন্থনা দ্বীপেই নয়, দেশ হতে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়লো দস্যু বনহুরের এই দুর্দান্ত অভিযান-সংবাদ।
পত্রিকায় পত্রিকায় প্রকাশ পেলো, দস্যু বনহুর নবোদ্দমে আবার আত্মপ্রকাশ করেছে।
কান্দাই শহরে মনিরা এ সংবাদ পাঠ করে চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লো। মা মরিয়ম বেগমও দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়লেন–না জানি তার মনির কখন কোন্ বিপদে পড়বে কখন কোথায় আহত বা নিহত হবে।
মনিরা পুত্র নূরকে বুকে চেপে ধরে স্বামীর স্মৃতি স্মরণ করতে লাগলো। একমাত্র খোদার কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া কোনো উপায় রইলো না তাদের।
রহমান মাঝে মাঝে এসে সংবাদ নিতো, বেশ কিছুদিন হলো সেও আর আসে না। বড় অস্বস্তি বোধ করে মনিরা। চিরজীবন সে কেঁদে এসেছে; এখন চোখেও আর পানি আসে না। মনিরা স্বামীর জন্য সব ত্যাগ করেছে, জীবনের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়েছে।
প্রতিদিন মনিরা স্বামীর অপেক্ষায় প্রহর গুণে, না জানি কখন এসে দাঁড়াবে তার সম্মুখে। কিন্তু দিন যায় রাত আসে, গোটা রাত বিছানায় ছটফট করে কাটায়। ঘুমন্ত নূরকে বুকে চেপে ধরে আকুল হয়ে কাঁদে। এক সময় ভোর হয়ে যায়। মনিরার অবশ চোখের পাতা মুদে আসে।
নূর আজকাল নিয়মিত স্কুলে যায়।
সরকার সাহেব যান তার সঙ্গে। রোজ ড্রাইভার গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে আসে, আবার নিয়ে আসে তাকে। পড়াশোনায় স্কুলে প্রথম স্থান দখল করে নিয়েছে নূর। তার সুন্দর চেহারায় সবাই মুগ্ধ।
স্কুল মাষ্টারগণ নূরকে অত্যন্ত স্নেহ করে, ভালবাসে।
কিন্তু স্কুলের মাষ্টারগণ জানে না–এটা কারে সন্তান!
বৃদ্ধ সরকার সাহেবই নূরের অভিভাবক হিসাবে থাকেন।
নূর সরকার সাহেবকে দাদু বলে ডাকে। সর্দা-সর্বদা সরকার সাহেবের নিকটেই যত কিছু আবদার করে, কখনও কোলে, কখনও কাঁধে চেপে নানারকম প্রশ্নে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে।
নূরকে নিয়ে ভুলে থাকে চৌধুরী বাড়ির লোকজন তাদের অন্তরের গোপন ব্যথা।
*
আজ কদিন হলো প্রদীপ যেন একটু অন্যরকম হয়ে উঠেছে। ডাক্তার বলেছেন–আর কিছুদিনের মধ্যেই প্রদীপ তার স্বাভাবিক জ্ঞান লাভ করবে।
প্রদীপ আগে ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে থাকতো কেউ কোনো প্রশ্ন করলে সহজে জবাব দিতোনা। কথা বলতো কিন্তু অত্যন্ত কম। খেতো–কিন্তু যেন তাকে জোর করে খাওয়ানো হচ্ছে।
