কিন্তু মন্থনা পুলিশ কমিশনার জাহাজ শাহানশাহ’কে বন্দর ত্যাগ করার অনুমতি দিলেন না। তাছাড়া অন্যান্য কোনো জাহাজ মন্থনা বন্দর ত্যাগ করতে পারবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হলো। কারণ দস্যু বনহুর যে এখন মন্থনা দ্বীপেই আছে সেটা সুনিশ্চিত। মন্থনা দ্বীপ থেকে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে যানবাহন চলাচলের সুযোগ ছিলোনা, সমুদ্র পথেই জাহাজ বা ষ্টীমারে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না কোনো।
পুলিশ বিভাগ তাই সজাগ হলেন, কোনো জাহাজ বা জলযান এখন মন্থনা বন্দর ত্যাগ করতে পারবে না।
ক্যাপ্টেন জমরুদী চরম অশ্বস্তি বোধ করলেন, মহা বিপদে পড়লেন তিনি। কিন্তু কোনো উপায় নেই, যতদিন দস্যু বনহুর গ্রেফতার না হয়েছে ততদিন তাকে মন্থনাতেই অপেক্ষা করতে হবে।
মিঃ আহাম্মদ এবং মিঃ জাফরী তাদের দলবল নিয়ে দস্যু বনহুরের সন্ধানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এটা কান্দাই শহর বা কোনো সমতল ভূমি পূর্ণ দেশ নয়। এটা দ্বীপ, চারিদিকে সাগর আর মাঝখানে মন্থনা দ্বীপ, কেউ গোপনে এখান থেকে পালিয়ে যাবে, তার সাধ্য নেই।
মিঃ আহম্মদ এবং মিঃ জাফরী শাহানশাহ’ জাহাজে থেকেই তাদের দলবল নিয়ে কাজে নেমে পড়লেন। ক্যাপ্টেন জমরুদীও এ ব্যাপারে পুলিশ বিভাগকে যথাসাধ্য সাহায্য করে যেতে লাগলেন।
মন্থনা দীপে মন্ত্রিকন্যা মীরার অপহরণ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেলো। প্রদীপকে দস্যু বেঁধে রেখে মীরাকে হরণ করে নিয়ে গেছে–এ কম কথা নয়।
মহারাজা জয়কান্ত এবং মহারাণী প্রদীপকে সুস্থ দেহে ফিরে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
*
গভীর রাত।
গাঢ় অন্ধকারে আকাশ আচ্ছন্ন। সন্ধ্যা থেকে আকাশের অবস্থা সচ্ছ নয়। বর্ষণের পূর্বে গভীর। থমথমে ভাব বিরাজ করছে। সাগরবক্ষে শুধুমাত্র জল-কল্লোলের উচ্ছাসিত শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ডেকের উপর খালাসীরা কম্বল মুড়ি দিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। যাত্রীগণ যার যার ক্যাবিনে বা বাইরে ডেকে নিদ্রায় মগ্ন। সমস্ত শাহানশাহ’ নীরব নিঝুম।
মিঃ জাফরী তার ক্যাবিনে বসে একখানা বই পড়ছিলেন। মিঃ আহম্মদের ক্যাবিন অন্ধকার, আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছেন তিনি।
জাহাজের আর একটি ক্যাবিনেও আলো জ্বলছিলো সেটা ক্যাপ্টেন জমরুদীর ক্যাবিন।
এক পাশে টেবিলে ল্যাম্প জ্বলছে বাইরের শার্শী দিয়ে দেখা যাচ্ছে টেবিলের পাশে চেয়ারে বসে আছেন ক্যাপ্টেন জমরুদী। তার পিঠের দিকটাই দেখা যাচ্ছে। ক্যাপটা তার মাথায় আছে। ঝুঁকে বসে আছেন জমরুদী। নিশ্চয়ই তিনি কিছু করছেন, টেবিলে একটা ম্যাপ খোলা।
মিঃ জাফরী হাতঘড়ির দিকে তাকালেন, রাত দুটো বিশ। বই রেখে উঠে দাঁড়ালেন, প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে দেখে নিলেন রিভলভারখানা ঠিক জায়গায় আছে কিনা। তারপর অতি সতর্কতার সঙ্গে বেরিয়ে এলেন ক্যাবিন থেকে। ক্যাবিনের দরজা সন্তর্পণে খুলে এগিয়ে চললেন মিঃ জাফরী।
অন্ধকারে ডেকের পাশ কেটে এগুতে লাগলেন। কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা অগ্রসর হলেন ক্যাপ্টেন জমরুদীর ক্যাবিনের দিকে। দক্ষিণ হস্তে মিঃ জাফরীর গুলীভরা রিভলভার।
জমরুদীর ক্যাবিনের পিছনে শার্শীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন মিঃ জাফরী, উঁকি দিয়ে দেখলেন–টেবিলের পাশে জমরুদী ঝুঁকে বসে একটা কিছু দেখছেন।
জাফরী শার্শির কাঁচে মৃদু আঘাত করলেন।
একবার দু’বার তিনবার –আশ্চর্য! ক্যাপ্টেন জমরুদী একটুও নড়লেন না। যেমন ঝুঁকে বসে কিছু দেখছিলেন তেমনি বসে রইলেন।
মিঃ জাফরী ক্যাবিনের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলেন। তবু ক্যাপ্টেন জমরুদী তেমনি টেবিলের পাশে বসেই রইলেন একচুল তিনি নড়লেন না।
মিঃ জাফরী সন্তর্পণে মিঃ জমরুদীর পিছন দিকে তাঁর হস্তস্থিত রিভলভারখানা চেপে ধরলেন।
কি আশ্চর্য! তবু জমরুদী নীরব।
মিঃ জাফরী বামহস্তে চেপে ধরলেন ক্যাপ্টেন জমরুদীর কাঁধটা।
সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে হতবাক হলেন, কোথায় ক্যাপ্টেন জমরুদী, একটা কাপড়ের কুন্ডলিকে কোট-টাই পরিয়ে হ্যাট মাথায় দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। মিঃ জাফরী স্তম্ভিত হলেন।
ঠিক্ সেই মুহূর্তে মিঃ জাফরী তার কাঁধে কারো হস্তের স্পর্শ অনুভব করলেন।
চমকে ফিরে তাকাতেই ক্যাপটেন জমরুদী একমুখ হেসে বললেন–থ্যাঙ্ক ইউ মিঃ জাফরী এতো রাতে আপনি আমার কক্ষে আসবেন ভাবতে পারিনি। বসুন।
মিঃ জাফরী ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন–ক্যাপ্টেন, আমার সন্দেহ হয়েছিলো–আপনি—
আমি কোনো সাধারণ মানুষ নই, তাই না?
হাঁ, আপনার কার্যকলাপ আমাকে সন্দিহান করে তুলেছে। বলুন, এতো রাতে আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?
আপনার প্রশ্নের জবাব আজ দেবো না, দেব পরে।
জবাব আপনাকে আজই দিতে হবে ক্যাপ্টেন।
আপনি কি মনে করেন আমিই দস্যু বনহুর?
আপনাকে গ্রেপ্তার করার পর সে জবাব পাবেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন মিঃ জাফরী।
হাঃ হাঃ হাঃ! হেসে উঠলেন ক্যাপ্টেন জমরুদী–বেশ, আমাকে আপনি গ্রেপ্তার করুন।
বলুন, এতো রাতে আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?
আবার সেইপ্রশ্ন! যদি সঠিক জবাব না দেই?
আপনার কথাতেই আমি বুঝতে পারবো আপনার জবাব সত্য না মিথ্যা।
বেশ, তাহলে বসুন আমি বলছি।
বসতে হবে না, বলুন?
আমিও আপনার মতই দস্যু বনহুরের সন্ধানে মন্থনায় প্রবেশ করেছিলাম।
হেসে উঠলেন মিঃ জাফরী–ছেলে ভুলানো কথা অন্য জায়গায় বলবেন আসল কথা বলুন?
বেশ, আমি আসল কথা বলছি, শুনুন। ক্যাপ্টেন জমরুদী ক্যাবিনের মেঝের একস্থানে পা দিয়ে চাপ দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে মেঝেটা ফাঁক হয়ে গেলো, মিঃ জাফরী পড়ে গেলেন একটা গর্তের মধ্যে। মিঃ জাফরী শুনতে পেলেন মুহূর্তের জন্য ক্যাপ্টেন জমরুদীর হাসির শব্দ।
