সন্ধ্যার অন্ধকার তখন নববধুর মত ঘোমটা টেনে দিয়েছে।
বজরা সারথী নদীর বুক চিরে অগ্রসর হয়।
প্রদীপের বুকে হেলান দিয়ে বসে আছে মীরা দৃষ্টি তার সম্মুখস্থ জলরাশির দিকে।
মীরা বলে–প্রদীপ, সেই গানটা আজ গাওনা? যে গান তুমি গাইতে।
গান!
হাঁ সেই গান, যে গান ছিলো তোমার অতি প্রিয়।
ধীরে ধীরে মাথা নাড়ালো প্রদীপ–মনে নেই।
আচ্ছা, আমি গাইছি তুমি শোন। মীরা গান গায়।
তন্ময় হয়ে শোনে প্রদীপ, নির্বাক আঁখি মেলে তাকিয়ে থাকে। পূর্ব আকাশে তখন চাঁদ ভেসে উঠেছে। জ্যোছনার স্নিগ্ধ আলোতে ভরে উঠেছে নদীবক্ষ।
মীরা তার শুভ্র কোমল বাহু দুটি দিয়ে প্রদীপের কণ্ঠ বেষ্টন করে তাকিয়ে বলে–প্রদীপ, তুমি তো এমন ছিলেনা?
মীরা লক্ষ্য করে প্রদীপের নিঃশ্বাস দ্রুত বইছে, নিজকে যেন কিছুতেই প্রকৃতিস্থ রাখতে পারছে না, ধীরে ধীরে ওর হাত দু’খানা মীরার দেহ বেষ্টন করে ধরে ফেলে।
মীরা নিজকে এলিয়ে দেয় প্রদীপের বাহুবন্ধনে।
প্রদীপ আরও নিবিড়ভাবে আকর্ষণ করে মীরাকে। মীরার হৃদয়ে অভূতপূর্ব এক অনুভূতি নাড়া দিয়ে যায়। ব্যাকুলভাবে তাকায় প্রদীপের মুখের দিকে।
প্রদীপ ওকে মুক্ত করে দেয়– না না, আমি প্রদীপ নই। আমি প্রদীপ নই– দক্ষিণ হাতখানা দিয়ে নিজের চোখ দুটো চেপে ধরে।
মীরার মুখ মুহূর্তে ব্যথায় বেদনায় ম্লান হয়ে উঠে, করুণ কাতর আঁখি দুটি তুলে ধরে প্রদীপের মুখে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বজরার অদূরে দেখা যায় একখানা ছিপনৌকা তর তর করে এগিয়ে আসছে তাদের বজরার দিকে।
একজন মাঝি ছুটে আসে দিদিমনি, একটি ছিপনৌকা এদিকে আসছে। মনে হচ্ছে কোনো উদ্দেশ্য নিয়েই ছিপনৌকা খানা আসছে।
মীরা আর প্রদীপ উঠে দাঁড়ায়।
মীরা বলে উঠে–আমাদের বজরা দ্রুত চালাও।
কিন্তু মীরার কথামত বজরা দ্রুত চালিয়েও ছিপনৌকার কবল থেকে রক্ষা পেলোনা প্রদীপ আর মীরা।
ছিপ নৌকাখানা অত্যন্ত বেগে আসছিলো, অল্পক্ষণে বজরার নিকটে এসে পড়লো।
বজ্রকঠিন স্বরে ছিপনৌকা থেকে কে যেন বললো–দাঁড়াও নইলে গুলী ছুড়বো।
বজরাখানা থামাতে বাধ্য হলো মাঝিরা।
ছিপনৌকা থেকে একজন জমকালো পোশাক পরিহিত লোক লাফিয়ে নেমে পড়লো বজরার উপর। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা তার হস্তস্থিত রিভলভার উদ্যত করে ধরলো, তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–তোমাদের হাতের অস্ত্র নদীতে নিক্ষেপ করো। বিলম্ব হলে এক্ষুণি মৃত্যু ঘটবে।
বজরার পাহারাদারগণ নিজ নিজ হস্তস্থিত রাইফেল নিক্ষেপ করলো নদীবক্ষে। তারা প্রথম দর্শনেই বুঝতে পারলো দস্যু বনহুর তাদের বজরা আক্রমণ করেছে। এবার আর রক্ষা নেই। তাদের। ভয়ে প্রত্যেকের হৃদকম্প শুরু হলো কে কোন দিকে লুকিয়ে পড়লো তার ঠিক নেই।
বজরার ছাদে বসেছিলো প্রদীপ আর মীরা, তারা বজরার সিঁড়ি বেয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। মীরা ভয়াতুর কণ্ঠে বললো–প্রদীপ, আর রক্ষে নেই, দস্যু বনহুর আমাদের বজরা আক্রমণ করেছে।
প্রদীপ নিরুত্তর নীরব।
একি, তুমি অমন চুপ করে আছো কেনো, দস্যু বনহুর আমাদের বজরা আক্রমণ করেছে।
মীরা বজরার আলো নিভিয়ে দিলো।
দস্যু বনহুরের অসাধ্য কিছু নেই। বজরার মধ্যে প্রবেশ করে রিভলভার উদ্যত করে ধরলো।
মীরা প্রদীপকে আড়াল করে দাঁড়ালো নিজের প্রাণ দিয়ে সে প্রদীপকে রক্ষা করবে। দ্রুত হস্তে নিজের শরীর থেকে অলঙ্কার খুলে এগিয়ে ধরলো–নিয়ে যাও।
হাত বাড়িয়ে মীরার অলঙ্কারের স্তূপ হাতে নিলো দস্যু। তারপর বললো–শুধু অলঙ্কার নিয়েই যাবোনা সুন্দরী, তোমাকেও যেতে হবে আমার সঙ্গে।
মীরা করুণ কণ্ঠে বললো–তুমি আমাকে ক্ষমা করো। যা চাও তাই পাবে, আমাকে রেহাই দাও।
দস্যু মীরার কথায় কান না দিয়ে প্রদীপকে বেঁধে ফেললো। দ্রুত হস্তে, তারপর মীরাকে তুলে নিলো কাঁধে।
বজরার একটি প্রাণীও টু শব্দ করবার সাহসী হলোনা।
প্রদীপকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে রাখলো বজরার মধ্যে।
মীরা-হরণ রহস্য পরদিন মঙ্গলা দ্বীপের অধিবাসীদের মধ্যে ভীষণ এক আতঙ্ক সৃষ্টি করলো। শুধু তাই নয় রাজকুমার প্রদীপকে দস্যু বনহুর বজরার মধ্যে মজবুত করে বেঁধে ফেলে রেখে গেছে। এতবড় সাহস তার!
একি অদ্ভুত কান্ড পর পর ঘটে চলেছে। বন্ধাই-এ গভর্ণর হাউসে হানা দিয়ে দস্যু বনহুর তাঁর সর্বস্ব লুটে নিয়ে গেছে। এমনকি তার কন্যাকেও হরণ করে নিয়ে গেছে সে। আবার মন্থনার পুলিশ সুপার মিঃ মুখার্জীর বাড়ীতে হানা দিয়ে তার কন্যা রীতার বিবাহের মূল্যবান অলঙ্কারাদি সব আত্মসাৎ করেছে। আবার প্রদীপের বজরায় আক্রমণ চালিয়ে প্রদীপকে বন্দী করে, মীরাকে নিয়ে পালিয়েছে।
পুলিশ মহল তো যারপর নাই ব্যস্ত হয়ে উঠলো। চারিদিকে এতো পাহারা থাকা সত্ত্বেও দস্যু বনহুর এই ভীষণ উপদ্রব আরম্ভ করেছে।
মন্থনাবাসীরা একরকম প্রায় আহার-নিদ্রা ত্যাগ করলো। এতো পাহারা পরিবেষ্টিত থাকা অবস্থাতেও যখন মীরা দেবীকে বনহুর হরণ করে নিয়ে গেলো, তখন নগরবাসীদের তো কথাই নেই। কখন কার বাড়িতে হানা পড়বে কে জানে, সুন্দরী স্ত্রী-কন্যা নিয়ে সবাই দুরু দুরু বক্ষে কাল যাপন করতে লাগলো।
*
ক্যাপ্টেন জমরুদী জানিয়ে দিয়েছেন মন্থনায় আর বিলম্ব করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এতে শুধু জাহাজের কর্মচারীদের অসুবিধা হচ্ছেনা, সমস্ত যাত্রীগণ ক্ষেপে উঠেছে। কাজেই অচিরে মন্থনা বন্দর ত্যাগ করতে না পারলে একটা বিভ্রাট দেখা দিতে পারে।
