প্রদীপ ধীরে ধীরে ফিরে তাকালো, মীরার মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবার দৃষ্টি নত করে নিলো।
মীরা উন্মুখ হৃদয় নিয়ে বললো–আমাকে চিনতে পারলে না?
প্রদীপ কোনো জবাব দিলো না।
মীরা ওর মাথার চুলে আংগুল বুলিয়ে দিতে দিতে বললো–প্রদীপ, শিকারে যাবার সময় তুমি আমাকে কি বলেছিলে? মনে করে দেখো দেখি? স্মরণ করো আমার হাত ধরে বলেছিলে, মীরা তুমিই যে আমার প্রাণ, প্রাণ রেখে আমি দেহটা বয়ে নিয়ে চললাম…উঃ! সব ভুলে গেছো, সব ভুলে গেছো তুমি!
মীরা আবার উচ্ছাসিত ভাবে কেঁদে উঠে।
প্রদীপ শয্যায় উঠে বসে, বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে মীরার সুন্দর কোমল মুখের দিকে।
মীরা কেঁদে কেঁদে শান্ত হয়, তাকায় প্রদীপের দিকে, অন্তরে অতৃপ্ত বাসনা–বুকে ঝড়ের তান্ডব। প্রদীপ তাকে আজও চিনতে পারলো না।
প্রদীপ সরে যায় মীরার পাশ থেকে দূরে মুক্ত জানালার পাশে, তাকায় সীমাহীন আকাশের দিকে।
মীরা এসে দাঁড়ায়, বলে সে–প্রদীপ, চলো বাইরে যাই। হাত ধরে মীরা প্রদীপের।
প্রদীপ আপত্তি করতে পারে না। মীরার সঙ্গে বেরিয়ে যায়। সুন্দর মনোরম বাগান। নানা বর্ণের ফল-ফুলের গাছে বাগানটি ভরে রয়েছে।
মীরা আর প্রদীপ দাঁড়ায় এসে বাগানের মধ্যস্থ একটি সন্ধ্যারাগ ফুলের গাছের নিচে। সন্ধ্যারাগ ফুলের সুরভী নিয়ে সন্ধ্যার বাতাস তখন মত্ত হয়ে রয়েছে।
মীরা ডাকে–প্রদীপ!
প্রদীপ তাকায় মীরার দিকে, কোনো জবাব দেয় না।
মীরা এক থোকা সন্ধ্যারাগ তুলে নিয়ে প্রদীপের হাতে দেয় নাও। মাথাটা এগিয়ে ধরে খুঁজে দাও আমার খোঁপায়।
প্রদীপ চিত্রার্পিতের ন্যায় ফুলটা গুঁজে দিলো মীরার খোঁপায়।
মীরার চোখেমুখে ফুটে উঠলো একটা খুশির উচ্ছ্বাস। মাথা রাখলো প্রদীপের বুকে।
আকাশে চাঁদ হাসছে।
জোছনায় ভরে উঠে সমস্ত বসুন্ধরা।
সন্ধ্যারাগ ফুলের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে বাগানের চারিদিকে।
মীরা প্রদীপের হাত ধরে বসে পড়ে ঝরনার পাশে।
জোছনার আলোতে ঝরনার পানিগুলি ঝিমিক্ করে উঠে মুক্তবিন্দুর মত। প্রদীপ অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকে সেই দিকে।
মীরা প্রদীপের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে, প্রদীপের হাতখানা হাতের মুঠায় চেপে ধরে ডাকে–প্রদীপ!
প্রদীপের দিক থেকে কোনো সাড়া আসে না।
মীরা উঠে বসে, ব্যস্ত কণ্ঠে বলে–প্রদীপ, এমন করে আর কতদিন আমার ডাকে সাড়া না দিয়ে কাটাবে বলো? আমি যে আর সহ্য করতে পারছিনে।
প্রদীপ তেমনি নিরুত্তর।
মীরা বলে–তুমি কি পাষাণ দেবতা? এমনি করে আর কতদিন আমাকে কাঁদাবে? ওগো একবার ডাকো মীরা বলে। একবার তুমি ডাকো!
প্রদীপ অধর দংশন করে, বুকের মধ্যে যেন ঝড় বইছে ওর। মুখোভাবে ফুটে উঠে একটা অস্থিরতা, কিছু যেন স্মরণ করতে চেষ্টা করছে প্রদীপ। ঠোঁট দুখানা নড়ে উঠে ওর, কিন্তু কিছু বলে না–বলতে পারে না সে।
মীরা ব্যাকুল কণ্ঠে ডাকে–প্রদীপ!
প্রদীপ অস্থিরভাবে নিজের চুলে হাত বুলায়…না, কিছু স্মরণ হচ্ছে না ওর। কে সে? মীরাই বা কে?
অনেক করেও প্রদীপ তার সজ্ঞানে ফিরে এলো না।
মন্থনার ডাক্তর কবিরাজ সব হিমসিম খেয়ে গেলো। রাজারাণী কেঁদেকেটে আকুল হলেন, প্রদীপ আজও তার পিতা-মাতাকে চিনতে পারলো না।
মীরা কাছে এলে প্রদীপ কেমন চমকে উঠে। মীরাকে সে কিছুতেই পূর্বের মত করে গ্রহণ করতে পারে না।
মীরাও বুদ্ধিমতি যুবতী, প্রদীপকে সে নতুন করে ফেরাতে চেষ্টা করে। প্রদীপের হৃদয় সিংহাসনে সে নিজকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
প্রদীপকে নিয়ে কখনও সে বাগানে গিয়ে বসে, হাসি-গানে মুখর করে তুলতে চায়। ফুল তুলে মালা গাঁথে, পরিয়ে দেয় প্রদীপের গলায়। কখনও সারথী নদীতে বজরা ভাসিয়ে দেয়, প্রদীপ থাকে মীরার পাশে।
মীরা তার পূর্বের কার্যকলাপ দিয়ে প্রদীপের স্মরণশক্তি ফেরাতে চেষ্টা করে।
*
সেদিন মীরা প্রদীপসহ সারথী নদীতীরে এসে দাঁড়ালো।
সূর্যাস্তের শেষ রশ্মি তখনও পৃথিবীর বুক থেকে মিলিয়ে যায়নি। সারথী নদীর জল লাল হয়ে উঠেছে। অপূর্ব এক ভাসময় পরিবেশ। অদূরে নদীবক্ষে তাদের বজরা।
মীরা বললো–প্রদীপ, মনে পড়ে সেই আর একদিনের কথা? বজরায় উঠতে গিয়ে পা পিছলে হঠাৎ পড়ে গিয়েছিলাম আমি। তখন তুমি দিশেহারার মত ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে নদীবক্ষে। কত কষ্ট করে সাঁতার কেটে আমাকে তীরে উঠিয়ে নিয়ে এসেছিলে? সেদিন আমি দেখেছিলাম তোমার মধ্যে অপূর্ব এক জ্যোতির্ময় রূপ, যা আজও আমি ভুলতে পারিনি। প্রদীপ কি করে তুমি ভুলে গেলে, বিস্মৃত হল সব? বলো–বলো প্রদীপ–মনে পড়ে কি তোমার সেই সেদিনের কথা?
মাথা নাড়ে প্রদীপ–না!
উঃ! তুমি কি হয়ে গেছো? আমি যে আর সইতে পারছি না। তোমাকে ফিরে পেয়েও আমি আজ তোমাকে যেন সম্পূর্ণভাবে পাইনি। প্রদীপ, প্রদীপ জবাব দাও?
অস্ফুট কণ্ঠে প্রদীপ উচ্চারণ করে–মীরা!
মীরা প্রদীপের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, দুটি আঁখি ওর মুদে আসে, আবেগভরা কণ্ঠে বলে– প্রদীপ!
প্রদীপ নিশ্চল নিশ্চুপ।
মীরা বলে–আবার ডাকো আমাকে মীরা বলে। আমি যে তোমার মুখে মীরা ডাক শুনবার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছি।
প্রদীপ আবার বলে–মীরা।
চলো প্রদীপ বজরায় যাই।
চলো।
মীরার আনন্দ আর ধরেনা, কতদিন পর আজ প্রদীপ তার নাম ধরে ডেকেছে। উচ্ছল আনন্দে আপ্লুত হয়ে উঠে সে।
প্রদীপের হাত ধরে বজরায় উঠে বসে।
