নিশ্চয়ই করবো, কিন্তু আমার জাহাজের যাত্রীগণ এতে মত করবে কিনা সন্দেহ।
মিঃ জাফরী বললেন–আমি সে দায়িত্বভার গ্রহণ করলাম। যাত্রীদের কাছে আমি আমাদের অসুবিধার কারণ জানিয়ে দেবো।
ধন্যবাদ, আপনি যদি এমন কোনো ব্যবস্থা করে নিতে পারেন তাহলে আমার কোনো অমত নেই।
মিঃ মুখার্জীকে যতটুকু সম্ভব সান্ত্বনা দিতে লাগলেন সবাই।
মন্থনার পুলিশ মহলে সাড়া পড়ে গেলো।
মিঃ আহম্মদ, মিঃ জাফরী দলবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মন্থনার পুলিশদের সাহায্যে।
মহারাজের মনে শান্তি নেই। সমস্ত মন্থনা দ্বীপের অধিবাসী রাজকুমার প্রদীপের জন্য শোকে মূহ্যমান, এমন দিনে আবির্ভাব হলো সেই দেশে দস্যু বনহুরের। মহারাজ চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
রাজসৈন্যদেরও প্রস্তুত রাখা হলো, কখন কোথায় দস্যু বনহুর আবার হানা দিয়ে বসবে কে জানে।
মন্থনাবাসীদের বুকের রক্ত পানি হতে বসেছে, দস্যু বনহুরের মন্থনায় আগমন–এ যেন মহা ভয়ানক এক দুঃসংবাদ।
মন্থনা দ্বীপ ছোট হলেও খুব ক্ষুদ্র নয়। যে কোনো একটি দেশের মতই এর পরিধি। মন্থনা দ্বীপটি দুই ভাগে বিভক্ত। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সারথী নদী। ছোটখাট নদী নয় এটা খুব বড় নদী। জাহাজ-ষ্টিমার, বড় বড় নৌকা সারথী নদীবক্ষে চলাচল করে থাকে।
মন্থনা বন্দর কিন্তু সারথী নদীর ঠিক বিপরীত দিকে। বন্দর ছেড়ে নদীটা প্রায় হাজার মাইল দূরে। মহারাজ জয়কান্তের রাজপ্রাসাদ এই সারথী নদীর তীরে।
মহারাজ সারথী নদীর ধারে তার সৈন্য পাহারায় নিযুক্ত করলেন। কোনো নৌকা বা ষ্টীমার বিনা অনুমতিতে যেন রাজ্যে প্রবেশ করতে না পারে।
সমস্ত মন্থনা দ্বীপে সতর্ক পাহারা মোতায়েন রইলো, দস্যু বনহুর যেন আবার কোথাও হানা দিতে না পারে।
মন্থনা দ্বীপবাসী যখন দস্যু বনহুরের ভয়ে আতঙ্কিত, তখন হঠাৎ একদিন ফিরে এলো প্রদীপ কুমার।
মন্ত্রি চন্দ্রনাথ তাকে মন্থনা হসপিটালে আবিষ্কার করলেন সম্পূর্ণ জ্ঞানহীন অবস্থায়। মাথায় ভীষণ আঘাত পাওয়ার দরুন প্রদীপ তার স্বাভাবিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
মহারাজ জয়কান্ত খবর পেয়ে ছুটে গেলেন মন্থনা হসপিটালে। পুত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে রোদন করলেন অনেক।
প্রদীপ পিতাকে চিনতে পারলো না।
হসপিটালের সার্জন বললেন–কুমার মাথায় ভীষণ চোট পেয়েছে, অপারেশান হয়েছে একটা কাজেই তার স্বাভাবিক জ্ঞান ফিরে আসতে সময় লাগবে কিছুদিন।
মহারাজ পুত্রকে হসপিটালে রাখা আর উচিৎ মনে করলেন না, তিনি প্রদীপকে নিয়ে এলেন প্রাসাদে।
আবার মন্থনায় আনন্দের স্রোত বইলো কিন্তু স্বাভাবিক শান্তি ফিরলো না, কারণ দস্যু বনহুরের ভয়ে দ্বীপবাসী আতঙ্ক ভরা হৃদয় নিয়ে বসবাস করছে।
একমাত্র রাজকুমারের আগমনবার্তা সর্বত্র প্রচার করা হলো।
মীরা দেবীর মুখে আবার হাসি ফুটলো, সে অসুস্থ শরীর নিয়ে ছুটে এলো রাজপ্রাসাদে!
প্রদীপ তার নিজের ঘরে বসেছিলো মুক্ত বাতায়ন পাশে।
মীরা কক্ষে প্রবেশ করে ছুটে গেলো, উচ্ছাসিত কণ্ঠে ডেকে উঠলো সে–প্রদীপ, তুমি ফিরে এসেছে! সুকোমল বাহু দুটি দিয়ে জড়িয়ে ধরলো ওর গলা–প্রদীপ!
ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালো প্রদীপ মীরার মুখের দিকে।
কোনো কথা সে বললো না, বরং আশ্চর্য হলো মীরার আচরণে।
মীরা ব্যাকুল কণ্ঠে ডাকলো–প্রদীপ! কথা বলছো না কেন? তবু প্রদীপ নিরুত্তর।
মীরা বার বার ডাকলো–প্রদীপ! প্রদীপ…প্রদীপ-কথা বলছো না কেন, বলো? বলো প্রদীপ?এ তুমি কি হয়ে গেছো! মীরা কেঁদে উঠলো ফুঁপিয়ে।
প্রদীপের মুখে চোখে অদ্ভুত একটি ভাব, কিছু যেন স্মরণ করতে চেষ্টা করছে–কিন্তু পারছে না যে! দক্ষিণ হস্তে নিজের চুলগুলি টেনে ধরে উবু হয়ে বসলো।
মীরা ছুটে বেরিয়ে গেলো যেমন এসেছিলো তেমনি করে।
কক্ষের বাইরেই দাঁড়িয়েছিলেন মহারাজ জয়কান্ত এবং মন্ত্রিবর। মীরা পিতার পাশে দাঁড়িয়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো–বাবা, একি হলো, প্রদীপ আমাকে চিনতে পারছে না।
সান্ত্বনা দিয়ে বললেন জয়কান্ত–মা মীরা, প্রদীপ এখন সম্পূর্ণ জ্ঞানহীন। তার মাথায় ভীষণ আঘাত পাওয়ায় সে এই রকম হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন–প্রদীপের স্বাভাবিক জ্ঞান ফিরে আসতে কিছুদিন সময় লাগবে।
কিন্তু সে যদি আমাকে কোনোদিন চিনতে না পারে?
তোমার ভুল ধারণা মীরা, প্রদীপ কোনোদিন তোমাকে চিনতে ভুল করবে না। বললেন চন্দ্রনাথ।
আমারও তাই মনে হয়। কথাটা বললেন জয়কান্ত।
মীরার মনে তখন অশান্তির ঝড় বয়ে চলেছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো মীরা।
পুত্রকে ফিরে পেয়েও মহারাজের মনে শান্তি নেই। মহারাণী কেঁদে কেঁদে অস্থির হয়ে পড়লেন। রাজপ্রাসাদের শান্তি ফিরে এসেও যেন আসেনি। প্রদীপকে ফিরে পেয়েও যেন কোথায় না পাওয়ার ব্যথা।
মীরা তখন বেরিয়ে গেলেও মন তার বেশিক্ষণ প্রদীপকে ছেড়ে থাকতে পারলো না।
আবার এক সময় এসে দাঁড়ালো মীরা প্রদীপের পাশে।
প্রদীপ আপন মনে শুয়েছিলো বিছানায়, পদশব্দে মুখ তুলে তাকালো–কে?
মীরা। আমি তোমার মীরা।
প্রদীপ আবার বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লো।
মীরা বসলো ওর পাশে, পিঠে হাত রাখতেই চমকে উঠলো প্রদীপ।
মীরা গভীর আবেগে ডাকলো–প্রদীপ!
না,আমি প্রদীপ নই। আমি প্রদীপ নই।
প্রদীপ, তুমি আমাকে একবার মীরা বলে ডাকো। লক্ষ্মীটি, তোমার মুখে কতদিন আমি মীরা ডাক শুনিনি। ডাকো–একবার ডাকো মীরা বলে।
