সত্যি ক্যাপ্টেন, এ যেন কল্পনার অতীত। আমরা যাকে গ্রেপ্তারের জন্য বন্ধাই চলেছি–সে। আমাদের পূর্বেই এসে পড়েছে মন্থনায়।
এটা শুভ সংবাদ মিঃ আহম্মদ।
হাঁ, শুভ সংবাদই বটে। বন্ধাই যাবার আর প্রয়োজন হলো না। কিন্তু বড় আফসোস দস্যু আমার বন্ধু মিঃ মুখার্জীর সব কিছু হরণ করেছে।
মিঃ জাফরী বলে উঠলেন–নরপিশাচ তাঁর কন্যার বিবাহের গহনা চুরি করে নিয়েছে। এতোটুকু মায়া-মমতা যদি থাকতো!
হাঃ হাঃ হাঃ! দস্যুর মায়া-মমতা…অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলেন ক্যাপ্টেন জমরুদী।
মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী অবাক হয়ে তাকালেন ক্যাপ্টেন জমরুদীর মুখের দিকে।
ক্যাপ্টেন জমরুদী বললেন–আমি আগামীকল্য জাহাজ মন্থনা দ্বীপ ত্যাগ করবার আদেশ দেবো।
মিঃ আহম্মদ বললেন–ক্যাপ্টেন, আমার অনুরোধ আর কয়েকটা দিন আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।
সম্ভব নয় মিঃ আহম্মদ, কারণ আরোহীরা এতে বিগড়ে যাবে। তাছাড়া মন্থনায় দস্যু বনহুরের আবির্ভাব-সংবাদ প্রচার হবার সঙ্গে সঙ্গে শাহানশাহের’ যাত্রীদের মধ্যে বেশ একটা আতঙ্ক ভাব। দেখা দিয়েছে।
মিঃ জাফরী গম্ভীরভাবে কিছু চিন্তা করছিলেন, তিনি বললেন ক্যাপ্টেন, আপনি দস্যু বনহুরের ভয়ে জাহাজ নিয়ে পালাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন, কিন্তু দস্যু বনহুর যদি আপনার জাহাজেই আপনাকে অনুসরণ করে?
মিঃ জাফরীর কথায় কক্ষমধ্যে ক্ষণিকের জন্য একটা নিস্তব্ধতা বিরাজ করে।
মিঃ জাফরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ক্যাপ্টেন জমরুদীর মুখে।
ক্যাপ্টেন জমরুদীর মুখোভাব মুহূর্তের জন্য পরিবর্তন হয়, পরক্ষণেই নিজকে সামলে নিয়ে হেসে বলেন–সে কথা অবশ্য মিথ্যা নয় ইন্সপেক্টার। দস্যু বনহুরের অসাধ্য কিছু নেই, সে যে কোনো দন্ডে যে কোনো স্থানে আগমন করতে পারে।
মিঃ জাফরীর ভূ কুঞ্চিত হলো, তিনি বললেন–ঠিকই বলেছেন ক্যাপ্টেন, দস্যু বনহুরের অসাধ্য কিছু নেই, সে এই মুহূর্তে এখানেও উপস্থিত হতে পারে।
এমন সময় মিঃ মুখার্জী এবং মন্থনার কয়েকজন পুলিশ অফিসার ক্যাবিনে প্রবেশ করলেন।
মিঃ আহম্মদ এবং মিঃ জাফরী তাঁদের অভ্যর্থনা জানালেন। মিঃ মুখার্জীর বিবর্ণ মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যথিত হলেন তারা। এক রাত্রির ব্যবধান–মিঃ মুখার্জীর বয়স যেন আরও দশ বছর বেড়ে গেছে। চোখমুখ বসে গেছে দুশ্চিন্তায়, ললাটে ফুটে উঠেছে গভীর চিন্তারেখা।
মিঃ আহম্মদ নিজের শোফার পাশের শোফায় বসালেন মিঃ মুখার্জীকে, তিনি ঘটনাটা বিস্তারিত জানতে চাইলেন।
মিঃ জাফরী আগ্রহান্বিতভাবে তাকালেন মিঃ মুখার্জীর দিকে।
অন্যান্য অফিসারগণ নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। ক্যাপ্টেন জমরুদী ক্যাবিন ত্যাগ করে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, মিঃ আহম্মদ তাঁকে থাকার জন্য অনুরোধ জানালেন।
জমরুদী কতকটা বাধ্য হয়েই বসলেন ওদিকের শোফায়।
মিঃ আহম্মদ জিজ্ঞাসা করলেন মিঃ মুখার্জীকে–আপনি বলুন দেখি ঘটনাটা?
মিঃ মুখার্জী যতদূর সম্ভব নিজকে সংযত রেখে বললেন–আহম্মদ, আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। দস্যু আমাকে জীবনে না মারলেও আমাকে নিঃশেষ করে দিয়ে গেছে।
সব জানতে পেরেছি মুখার্জী; সব সংবাদ পেয়েছি। এমনভাবে দস্যু সব লুটে নিয়ে যাবে– কল্পনার অতীত।
হাঁ, আমি কোনোদিন ভাবতেও পারিনি আমার বাড়িতে দস্যু হানা দেবে। একটু থামলেন মিঃ মুখার্জী, তারপর আবার বলতে শুরু করলেন–এতো পাহারা থাকা সত্বেও কি করে দস্যু আমার। শয়নকক্ষে প্রবেশে সক্ষম হলো জানি না। হঠাৎ আমার নিদ্রা টুটে গেলো, আমি চোখ মেলে তাকাতেই দেখি জমকালো পোশাক পরিহিত একটি লোক আমার সম্মুখে দন্ডায়মান; হস্তে তার উদ্যত রিভলভার।
ক্যাবিনের সকলেই স্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন, মিঃ জাফরী সকলের অলক্ষ্যে একবার ক্যাপ্টেন জমরুদীর মুখে তাকিয়ে দেখে নিলেন।
ক্যাপ্টেন জমরুদী তখন একটি সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করছিলেন।
মিঃ মুখার্জী বলে চলেছেন–আমি ফোন বা কলিং বেলে হাত রাখতে পারলাম না। দস্যু আমার কাছে সিন্দুকের চাবি চাইলো, আমি বাধ্য হলাম তার কথা অনুযায়ী কাজ করতে। সব নিয়ে তবেই সে বিদায় নিলো।
মিঃ জাফরী বললেন–স্যার, একটা প্রশ্ন করবো আপনাকে, দয়া করে জবাব দেবেন?
হতাশা ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন মিঃ মুখার্জী মিঃ জাফরীর দিকে।
মিঃ জাফরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–দস্যুর চেহারা নিশ্চয়ই আপনার স্মরণ আছে স্যার?
আছে।
দস্যুর দেহে জমকালো পোশাক ছিলো বলেছেন!
হাঁ, দস্যুর দেহে জমকালো পোশাক ছিলো।
মাথায় টুপী?
না, দেহের পোশাকের মতই কালো পাড়ি ছিলো।
পাগড়ির কিছুটা অংশ….
পাগড়ির কিছুটা কাপড় দিয়ে মুখের নিচের অংশ ঢাকা ছিলো। কিন্তু তার চোখ দুটো আমি দেখেছি, তীব্র সে চাহনি…একটু থেমে আবার বললেন মিঃ মুখার্জী–দস্যু যে সাধারণ কোনো মানুষ নয় তা আমি বুঝতে পেরেছি…
হাঁ, আপনার অনুমান সম্পূর্ণ সত্য, দস্যু সাধারণ জন নয়।
মিঃ জাফরীর কথায় বলে উঠেন মিঃ আহম্মদ–আপনার কি মনে হয় দস্যু বনহুর মন্থনায় আগমন করেছে?
শুধু মন্থনা দ্বীপেই নয় আমাদের জাহাজেও যে তার আগমন হয়নি, তা নয়। দস্যু বনহুর আমাদের পিছু নিয়েছে।
মিঃ আহম্মদ বললেন–তাহলে আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে এসেছে, দস্যু বনহুরকে আমরা মন্থনা দ্বীপেই পেয়ে গেলাম।
হাঁ, এখন কৌশলে তাকে বন্দী করা! কথাটা বলে ফিরে তাকালেন মিঃ জাফরী ক্যাপ্টেন জমরুদীর মুখে, বললেন–ক্যাপ্টেন, কারণবশতঃ আপনাকে ‘শাহানশাহ’ নিয়ে মন্থনায় কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আপনিও আমাদের সাহায্য করবেন। আশা করি।
