ছায়ামূর্তি রিভলভারখানা আবার পকেটে রাখলো, তারপর রুমালটা বের করে নিয়ে উঠে পড়লো গাড়ির মধ্যে। বলিষ্ঠ হাত দিয়ে কৌশলে ঘুমন্ত ড্রাইভারের মুখটা বেঁধে ফেললো মজবুত করে। তারপর হাত দু’খানাও বাধলো পকেটে সিল্ক-কর্ড ছিলো তাই দিয়ে। এবার ড্রাইভারের দেহটা গড়িয়ে দিলো আসনের নিচে।
ছায়ামূর্তির হাতে গাড়িখানা উল্কাবেগে ছুটে চললো। শব্দ-হীন গাড়িখানা–কাজেই তেমন কোনো আওয়াজ হচ্ছিলো না।
ঠিক পুলিশ সুপার মিঃ মুখার্জীর বাড়ীর পিছনে এসে থেমে পড়লো গাড়িখানা। ছায়ামূর্তি নেমে পড়লো, অতি সতর্কতার সঙ্গে পিছন প্রাচীর টপকে প্রবেশ করলো ভিতরে।
পুলিশ সুপারের বাড়িতে যদিও বহু পাহারাদার সদা-সর্বদা নিয়োজিত হয়েছে তবুও এদিকটায় পাহারার তেমন কোনো প্রয়োজন হয় না। সুউচ্চ প্রাচীর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
ছায়ামূর্তি সেই বিরাট উঁচু প্রাচীর অতি সহজে পার হয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো, তারপর অতি নিপুণতার সঙ্গে পিছন পাইপ বেয়ে উঠে গেলো উপরে।
কৌশলে খুলে ফেললো জানালার কাঁচের শার্শী।
কক্ষমধ্যে প্রবেশ করলো ছায়ামূর্তি।
শয্যায় অঘোরে ঘুমাচ্ছেন মিঃ মুখার্জী। বহুদিন পর পুরাতন বন্ধুর সঙ্গে বেশ আনন্দে কেটেছে সন্ধ্যা রাতটা, পরম নিশ্চিন্ত মনে এখন তিনি ঘুমাচ্ছেন।
জমকালো ছায়ামূর্তি শয্যার পাশে এগিয়ে গেলো। রিভলভারের আগা দিয়ে মিঃ মুখার্জীর গা থেকে চাদর সরিয়ে দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে মুখার্জীর সুখনিদ্রা ভঙ্গ হলো, আচম্বিতে উঠে বসে তাকালেন, সম্মুখে জমকালো একটি ছায়ামূর্তি দেখে মুহূর্তে বিবর্ণ হলো তার মুখমন্ডল, বললেন–কে! কে তুমি?
চাপা গম্ভীর কণ্ঠস্বর–আমি যেই হই–চাবি দাও, চাবি।
চাবি! কিসের চাবি?
সিন্দুকের চাবি।
কেন?
দাও, বেশি কথা আমি বলতে আসিনি।
মিঃ মুখার্জী বিবর্ণ ফ্যাকোশে মুখে তাকালেন ছায়ামূর্তির হস্তস্থিত উদ্যত রিভলভারের দিকে।
ছায়ামূর্তি আবার চাপা কণ্ঠে বলে উঠলো–বিলম্ব হলে মৃত্যু নিশ্চিত…।
মিঃ মুখার্জী হঠাৎ এমন অবস্থায় পড়বেন কল্পনাও করতে পারেননি। এতো পাহারা পরিবেষ্টিত থাকা সত্বেও দস্যু কি করে প্রবেশে সক্ষম হলো। পাশেই টেবিলে ফোন, কলিং বেল রয়েছে কিন্তু হাত দেবার উপায় নেই। দস্যুর রিভলভার তার বুক লক্ষ্য করে উদ্যত রয়েছে।
মিঃ মুখার্জী চাবির গোছছা বালিশের তলা হতে বের করে এগিয়ে দিলেন, চোখ দুটো তার আগুনের ভাটার মত জ্বলে উঠলো। তিনি কত দস্যকে গ্রেপ্তার করেছেন আর আজ একটা দস্যুর কাছে তাঁর এতোবড় পরাজয়!
দস্যু চাবির গোছা হাতে নিয়ে বললেন–উঠুন।
সুবোধ বালকের মত উঠে দাঁড়ালেন মিঃ মুখার্জি।
দস্যু চাবির গোছা পুনরায় মিঃ মুখার্জীর হাতে দিয়ে বললো–চলুন আপ্নার সিন্দুকের পাশে।
মিঃ মুখার্জী বাধ্য হয়েই দস্যুর কথামত কাজ করলেন।
কন্যার বিবাহের জন্য যত গহনা তিনি তৈরি করিয়ে রেখেছিলেন সব তুলে দিলেন দস্যু-হস্তে; শুধু অলঙ্কারই নয়, যা কিছু অর্থ ছিলো বাড়িতে সব তুলে দিতে হলো।
দস্যু সব কিছু গ্রহণ করার পর যে পথে কক্ষে প্রবেশ করেছিলো সেই পথে বেরিয়ে গেলো।
দস্যু বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রিসিভার তুলে নিলেন হাতে, ফোন করলেন পুলিশ অফিসে। কলিং বেল বাজিয়ে সবাইকে ডাকলেন।
অল্পক্ষণের মধ্যে পুলিশ সুপারের বাড়ি পুলিশে ছেয়ে গেলো।
অফিস থেকে ছুটে এলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর এবং ও, সি। ঘটনা শুনে সবাই থ’ খেয়ে গেলেন। কি অদ্ভুত কান্ড–পুলিশ সুপারের বাড়িতে দস্যুতা!
চারিদিকে পুলিশ ফোর্স দস্যুর সন্ধানে ছুটলো কিন্তু কোথায় দস্যু–সব যেন হাওয়ায় মিশে গেছে।
পরদিন ঘটনাটা পত্রিকায় ছড়িয়ে পড়লো। শুধু পত্রিকাতেই নয়, লোকের মুখে মুখে নানাভাবে কথাটা বিচিত্র রূপ ধারণ করলো।
এমন সাহস কোন্ দস্যুর হতে পারে–একমাত্র দস্যু বনহুরই পারে একাজ করতে!
মন্থনা দ্বীপের অধিবাসীগণ রাজকুমারের শোকে একেই মূহ্যমান হয়ে পড়েছিলো, কারো মনে। ছিলোনা কোনো শান্তি বা আনন্দ, তার মধ্যে এক ভয়াবহ ডাকাতি, মন্থনার পুলিশ সুপারের বাড়িতে দস্যুতা। সে যে সে দস্যু নয়–স্বয়ং দস্যু বনহুর।
মন্থনার পুলিশ মহল নড়ে উঠলো, সবাই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত রইলো, কখন কোথায় আবার দস্যু বনহুর হানা দিয়ে বসবে কে জানে।
দ্বীপের অধিবাসীরা আশঙ্কায় দুরু দুরু বক্ষে কানাঘুষা করতে লাগলো। সবাই ভীত আতঙ্কিত; সন্ধ্যায় বাইরে পথেঘাটে কারো সাধ্য নেই একা সাহস করে বের হয়।
মন্থনার মহারাজ জয়কান্ত পুত্রশোক বিস্মৃত হয়ে প্রজাদের রক্ষণাবেক্ষণের সুব্যবস্থায় নিয়োজিত হলেন। দস্যু বনহুর যেন তাঁর প্রজাদের সর্বস্ব লুটে নিতে না পারে বা কাউকে হত্যা করতে না পারে।
শাহানশাহ’ বসে সংবাদ পেলেন মিঃ আহম্মদ এবং মিঃ জাফরী। সংবাদপত্রে জানাবার পূর্বেই রেডিও-সংবাদে তারা অবগত হলেন সব।
মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী বিস্ময়ে আড়ষ্ট, দস্যু বনহুর গ্রেপ্তারে তারা বন্ধাই শহরে চলেছেন, কিন্তু কি আশ্চর্য! সেই দস্য তাদের আগমনের পূর্বেই পৌঁছে গেছে মন্থনা দ্বীপে।
মিঃ আহম্মদ বললেন–আমি ভাবতেও পারিনি, এমনভাবে দস্যু বনহুর…কথা শেষ না করেই থেমে পড়লেন। দেখলেন ক্যাপ্টেন জমরুদী ক্যাবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে। মিঃ আহম্মদের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই হাস্য উজ্জ্বল মুখে ক্যাবিনে প্রবেশ করতে করতে বললেন মিঃ জামরুদী–আপনাদের সঙ্গে সঙ্গেই সেও বিচরণ করবে।
