সবাই ফিরে এলো, শুধু একমাত্র ফিরে এলো না প্রদীপ।
সেদিনের পর থেকে রাজ্যময় একটা অশান্তির কালোছায়া ঘনিয়ে এলো, রাজারাণী পুত্রশোকে মূহ্যমান হয়ে পড়লেন। রাজপরিবার থেকে মুছে গেলো সব আনন্দ। প্রজাদের মনে রেখাপাত করলো রাজপরিবারের এই অশান্তির করাল ছায়া।
মন্থনা দ্বীপ একমাত্র প্রদীপকে হারিয়ে অন্ধকার হয়ে গেলো।
রাজ্যময় গভীর শোকের হাওয়া বইতে লাগলো।
মন্ত্রিকন্যা মীরা দেবী রাজকুমারের বিরহ বেদনায় আরও অসুস্থ হয়ে পড়লো, সদা-সর্বদা সে প্রদীপের জন্য অশ্রুবিসর্জন করে চললো।
মীরা দেবী পিতামাতার আদুরিনী কন্যা–তাছাড়া ভাবী রাজপুত্রবধু, তার এই করুণ অবস্থায় মন্ত্রিপরিবার মুষড়ে পড়লো। কন্যাকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন মন্ত্রি চন্দ্রনাথ।
কিন্তু মীরার চোখের অশ্রু শুষ্ক হলো না, বরং আরও বেড়ে গেলো।
প্রদীপকে না পেলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। মীরার কক্ষে ছিলো প্রদীপ ও মীরার যুগল একটি বড় ছবি। মীরার সব সময় ঐ ছবিখানার সম্মুখে দাঁড়িয়ে নীরবে রোদন করতো।
একদিন নয়, দুদিন নয়–বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। রাজকুমার প্রদীপের সন্ধানে যারা গিয়েছিলো সবাই বিমুখ হয়ে ফিরে এলো। মন্থনা দ্বীপের শান্তি লোপ পেলো চিরতরে।
*
মন্থনা দ্বীপে যখন প্রদীপকুমারের নিরুদ্দেশ ব্যাপার নিয়ে মহা হুলস্থুল পড়ে গেছে তখন জাহাজ শাহানশাহ’ এসে নোঙর করলো মন্থনা বন্দরে।
এখানে শাহানশাহ’ দুদিন অপেক্ষা করবে। তারপর আবার রওনা দেবে বন্ধাই অভিমুখে। পথে আরও কয়েকটি বন্দরে শাহনশাহ’ নোঙর করবে বলে জানিয়েছেন ক্যাপ্টেন জমরুদী।
মিঃ জাফরী এবং পুলিশ সুপার মিঃ আহম্মদ মন্থনা দ্বীপে অবতরণ করবেন বলে জানালেন। মন্থনার পুলিশ অফিসে।
খবর পেয়েই পুলিশ সুপার এলেন কান্দাই এর পুলিশ সুপারকে অভ্যর্থনা জানাতে। মন্থনার পুলিশ সুপার মিঃ মুখার্জী ও অন্যান্য পুলিশ অফিসারগণ কান্দাই এর পুলিশ অফিসারদের অভিনন্দন জানিয়ে গেলেন নিজেদের অফিসে।
শহরময় একটা সাড়া পড়ে গেলো–কান্দাই পুলিশ সুপার এসেছেন মন্থনা দ্বীপ পরিদর্শনে। তাঁর সঙ্গে এসেছেন মিঃ জাফরী এবং আরও অন্যান্য পুলিশ অফিসারগণ।
মিঃ মুখার্জী শাহানশাহর’ ক্যাপ্টেন জমরুদীকেও আমন্ত্রণ জানালেন। প্রথমে ক্যাপ্টেন জমরুদী তার দাওয়া কবুল করছিলেন না, পরে রাজি হলেন মিঃ জাফরীর অনুরোধে।
পুলিশ অফিস পরিদর্শনের পর মিঃ মুখার্জী পুলিশ অফিসারগণ এবং ক্যাপ্টেন জমরুদীকে নিজ বাসভবনে নিয়ে গেলেন, সেখানে তাঁদের দ্বিপ্রহর ভোজনে আপ্যায়িত করলেন।
মিঃ মুখার্জী মন্থনার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
ভোজনকালে একথা-সেকথা নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছিলো। মন্থনা দ্বীপের রাজকুমার প্রদীপের নিরুদ্দেশ ব্যাপার থেকে শুরু করে মুখার্জী তার কন্যা রীতার বিয়ের কথা পর্যন্ত তুললেন। অবশ্য মিঃ আহম্মদ তাঁর পুরানো বন্ধু লোক, তাই নিঃসঙ্কোচে কথাবার্তা চলছিলো।
মিঃ মুখার্জী কথায় কথায় তার কন্যা রীতার বিয়েতে অনেক মূল্যবান একটি হার দিচ্ছেন জানালেন। হারটির মূল্য প্রায় পঞ্চাশ হাজার। আরও অনেক গহণা তিনি কন্যার জন্য তৈরি করে রেখেছেন। আগামী সপ্তাহে বিয়ে।
খাওয়া-দাওয়া পর্ব শেষ হলো, তারপর চললো দাবা খেলা। মিঃ আহম্মদ ও মিঃ মুখার্জী বহুদিন পর একত্র হয়েছেন, কাজেই তারা মেতে উঠলেন আনন্দে।
জাহাজে ফিরতে রাত হয়ে গেলো।
ফিরে আর কোনো আলাপ-আলোচনা করবার মত কারো মনের অবস্থা ছিলো না। সবাই আজ বেশ পরিশ্রান্ত। গোটা মন্থনা দ্বীপ তারা আজ ঘুরে ফিরে দেখেছেন।
নিজ নিজ ক্যাবিনে প্রবেশ করে সবাই বিশ্রামের আয়োজন করতে লাগলেন।
*
রাত বেড়ে আসছে।
শাহানশাহ’ নিস্তব্ধ। সমস্ত আরোহীরা যার যার স্থানে নিদ্রায় মগ্ন। একটা সার্চলাইট জাহাজের মাথায় আপন মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। সার্চলাইটের আলোতে আবার সমস্ত জাহাজখানায় আলোর তুলি বুনিয়ে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে সমুদ্রের উচ্ছল ঢেউ এর বুকে।
ঠিক আলোটা যখন সমুদের বুকে গিয়ে পড়লো, জাহাজটা তখন অন্ধকারে ছেয়ে গেলো–ঐ মুহূর্তে একটা জমকালো ছায়া-মূর্তি জাহাজের পিছন ডেকের দিকে দ্রুত অগ্রসর হলো।
সার্চলাইটের আলো সমুদ্রের বুক থেকে ফিরে আসার পূর্বেই ছায়ামূর্তি অদৃশ্য হলো পিছন ডেকের আড়ালে।
জাহাজের পিছনে একটা মোটা রাশি ঝুলছিলো, তার নিচেই দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি বোট।
ছায়ামূর্তি রশি বেয়ে নিচে নেমে গেলো, তারপর লাফিয়ে পড়লো বোটের উপর।
তর তর করে বোটখানা তীরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জমকালো মূর্তিটা বসে আছে, আর দু’জন কালো পোশাক পরা লোক দাঁড় বেয়ে চলেছে।
নিপুণ অভিজ্ঞ চালক ওরা।
অল্পক্ষণেই বোটখানা তীরে এসে ভিড়লো।
উঠে দাঁড়ালো ছায়ামূর্তি, চাপা গম্ভীর গলায় বললো–সাবধান, কেউ যেন তোমাদের দেখে না। ফেলে। তোমরা সতর্কভাবে আশেপাশে কোথাও অপেক্ষা করো, যতক্ষণ আমি ফিরে না আসি।
লোক দু’জন মাথা নিচু করে অভিবাদন করলো।
একজন বললো–আচ্ছা সর্দার।
ছায়ামূর্তি বোটের উপর থেকে লাফিয়ে নেমে পড়লো তীরে।
অদূরে বন্দরের নিকটে কয়েকটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়েছিলো। ছায়ামূর্তি প্যান্টের পকেট থেকে রিভলভারখানা বের করে নিয়ে এগিয়ে গেলো। যে ট্যাক্সিখানা সর্বপ্রথম দাঁড়িয়েছিলো, সেই ট্যাক্সির পাশে এসে দাঁড়ালো। দেখলো ড্রাইভার নিশ্চিন্ত মনে নাক ডেকে পিছন আসনে ঘুমাচ্ছে।
