মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী অফিসারদ্বয়ের জন্য সুসজ্জিত দু’টি ক্যাবিনের ব্যবস্থা করে দিলেন এবং নিজে সব সময় তাঁদের খোঁজখবর নিতে লাগলেন।
কান্দাই বন্দর ত্যাগ করে জাহাজ শাহান শাহ’ সাগরবক্ষে অগ্রসর হলো।
গভীর নীল উচ্ছল জলরাশি প্রচন্ড আস্ফালন করে তীর-বেগে ছুটে এসে আছড়ে পড়ছে জাহাজের গায়ে। ভীম গর্জন করে জাহাজখানা এগিয়ে যাচ্ছে সাগরের মধ্যস্থানে।
ক্রমে কান্দাই বন্দর ঝাপসা হয়ে এলো, এক সময় অদৃশ্য হলো বন্দরটা সম্পূর্ণরূপে।
ডেকে দাঁড়িয়ে সিগারেট পান করছিলেন মিঃ আহম্মদ। মিঃ জাফরী দাঁড়িয়েছিলেন পাশে। দৃষ্টি তাদের সীমাবদ্ধ দূরে সাগর আর আকাশখানা যেখানে মিশে এক হয়ে গেছে।
মিঃ জাফরী বললেন মিঃ আহম্মদকে লক্ষ্য করে–স্যার, দস্যু বনহুর বেশ কিছুদিন ডুব মেরে থাকার পর আবার সে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
সেই কারণেই আমরা বন্ধাই চলেছি মিঃ জাফরী; আশা করি আমরা এবার তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবো।
এমন সময় ক্যাপ্টেন জমরুদীর আগমনে চুপ হলেন পুলিশ অফিসারদ্বয়, বিশেষ করে যখন তখন দস্যু বনহুরের ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করাটা ভাল লাগলো না তাদের।
ক্যাপ্টেন জমরুদী বললেন–চলুন বৈকালের নাস্তাটা আমার ওখানেই করবেন।
মিঃ আহম্মদ এবং মিঃ জাফরী অমত করতে পারলেন না। কারণ এ জাহাজে আরোহণ করার পর ক্যাপ্টেনের ব্যবহারে তাঁরা মুগ্ধ।
মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী ক্যাপ্টেন জমরুদীকে অনুসরণ করলেন।
জাহাজখানা তখন ভীম গর্জন করে বিরাট জলজন্তুর মত সাগরবক্ষে এগিয়ে চলেছে।
মন্থনা দ্বীপের মহারাজ জয়কান্ত সেন আহার নিদ্রা সব ত্যাগ করেছেন। মহারাণী মায়াবতীর অবস্থাও তদ্রূপ। পুত্রশোকে মুহ্যমান রাজদম্পতী।
রাজকুমার প্রদীপ সেনের অভাবে সমস্ত মন্থনা দ্বীপ ঝিমিয়ে পড়েছে। রাজ্যময় একটা অশান্তির ছায়া ঘনিয়ে এসেছে। রাজার মনে সুখ নেই, প্রজাদের আনন্দ থাকবে কি করে।
রাজবংশের একমাত্র দীপশিখা প্রদীপ কুমার।
জয়কান্ত সেন বহুদিন নিঃসন্তান থাকার পর কোনো এক সন্ন্যাসীর আশীর্বাদে লাভ করেছেন। প্রদীপকে। মহারাজ এবং মহারাণীর শিবরাত্রির সলতে প্রদীপ কুমার। একমাত্র সন্তানকে তারা কোনো সময় দৃষ্টির আড়াল হতে দিতেন না। শুধু মহারাজ এবং মহারাণীই নয়, সমস্ত রাজপরিবারের নয়নের মণি ছিলো প্রদীপ।
প্রজারা ভালবাসতো, সমীহ করতো–রাজকুমারের আচরণে মুগ্ধ ছিলেন তারা।
প্রদীপ কুমার শুধু সুন্দরই ছিলো না, তার হৃদয় ছিলো বড় উদার। শিকার করা ছিলো প্রদীপের। নেশা।
মাঝে মাঝে প্রদীপ কুমার তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে শিকারে যেতো। বন হতে বনান্তরে ছুটতে অশ্ব নিয়ে।
প্রতিবারের মত এবারও প্রদীপ শিকারে গিয়েছিলো সঙ্গীদের নিয়ে।
সঙ্গে শুধু সঙ্গীরাই ছিলো না, প্রদীপ কুমারের দেহরক্ষী ছিলো অনেক।
শিকার করা রাজকুমারের নেশা হলেও রাজরাণী এতে সব সময় উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করতেন। না জানি কখন কোন্ বিপদ এসে পড়ে। একমাত্র সন্তানের অমঙ্গল চিন্তায় রাজদম্পতী সদা-সর্বদা চিন্তিত থাকতেন। ছোট শিশু নয় যে ধরে রাখবেন। বয়স হয়েছে–এখন প্রদীপ যুবক।
মহারাজ জয়কান্তা সেন এখন বৃদ্ধ; রাজ্য চালনায় তিনি আর আগের মত উৎসাহী নন। এখন পুত্র প্রদীপকে রাজ্যভার সমর্পণ করে তিনি বিশ্রাম গ্রহণ করতে চান।
কিন্তু প্রদীপের ইচ্ছে ঠিক তার উল্টো, রাজ্যভার গ্রহণ করতে সে কিছুতেই রাজি নয়, আরও কিছু পরে সে এ দায়িত্ব গ্রহণ করবে বলে পিতার কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মহারাজ জয়কান্ত এবং মহারাণীর ইচ্ছা পুত্রের অমতে তারা জোরপূর্বক কিছু করবেন না।
প্রদীপ ভালবাসে মন্ত্রীকন্যা মীরা দেবীকে, মীরাও প্রদীপের জন্য সদা ব্যাকুল।
মহারাজার ইচ্ছা না থাকলেও মহারাণীর অনুরোধে তিনি পুত্রকে মন্ত্রীকন্যা মীরা দেবীর সঙ্গেই বিয়ে দেবেন মনস্থ করে রেখেছেন। মন্ত্রি চন্দ্রনাথ জাতীকুলে মহারাজের সমকক্ষ। কন্যা মীরা অপূর্ব রূপবতী, সর্বগুণে গুণবতী কাজেই মহারাজের অমত করবার কোনো কিছু রইলো না। মীরাকে পুত্রবধু করে নেবেন মনস্থ করে রাখলেন।
মীরা আর প্রদীপের মধ্যে তাই ছিলো না কোনো বাধার প্রাচীর। উভয়ে মিলিত হতো উভয়ের সঙ্গে, হাসি-গানে মেতে উঠতো ওরা! জোছনা রাতে নদীবক্ষে বজরা ভাসিয়ে চলে যেতো দূরে, অনেক দূরে। কখনও বা ছিপ নৌকায় রাজকুমার আর মন্ত্রিকন্যা বেরিয়ে পড়তো, মাছ ধরতো বড়শী নিয়ে। কোনো কোনো সময় বনে যেতো ওরা শিকার করতে প্রদীপ কুমারের সঙ্গে মীরাও পরতো শিকারীর ড্রেস। প্রদীপ আর মীরার মধ্যে ছিলো না কোন সংকোচ বা দ্বিধা। উভয়ে। উভয়কে গভীরভাবে ভালবেসেছিলো।
এবার প্রদীপ শিকারে যাবার সময় মীরাকে সে সঙ্গে নেয়নি, কারণ মীরা অসুস্থ ছিলো।
মীরার কাছে প্রদীপ বিদায় নিয়ে গিয়েছিলো, হাসিমুখে তাকে বিদায় দিয়েছিলো মীরা।
কিন্তু শিকার থেকে প্রদীপ আর ফিরে আসেনি।
ফিরে এসেছে তার সঙ্গী-সাথীরা। ফিরে এসে তারা জানিয়েছে এক মহা দুঃসংবাদ।
গহন বনে যখন তারা শিকার করছিলো, তখন ভীষণ ঝড়-বৃষ্টি আর তুফান শুরু হয়। সেই ঝড়-বৃষ্টি-তুফানের মধ্যে শিকারীর দল কে কোথায় ছিটকে পড়েছিলো তা কেউ জানে না।
ঝড়-বৃষ্টি-তুফান যখন থেমে গেলো তখন দেখা গেলো,দলের অনেকেই আহত হয়েছে, কারো অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হয়ে পড়েছে। কিন্তু কুমার কোথায়!
