সুচতুর তাজ সর্বাগ্রে ছুটলো, পিছনে রহমান দুর্কীর পিঠে। অন্যান্য অশ্বপৃষ্ঠে আর আর অনুচরগণ।
আরাকানে পৌঁছে রহমান দলবল নিয়ে সমস্ত বন-জঙ্গল পাহাড় প্রান্তর সব নিপুণভাবে খুঁজলো। তাজ যেদিকে চলে সেই দিকেই রহমান ছোটে তার দলবল নিয়ে।
এমন কোনো যায়গা রইলো না যেখানে রহমান সন্ধান করলো না তাদের সর্দারের!
কিন্তু কোথায় বনহুর? পৃথিবীর বুকে থাকলে রহমানের চোখে সে নিখোঁজ হতে পারবে না।
*
এদিকে রহমান যখন বনহুরের সন্ধানে আরাকানের মাটি তন্ন তন্ন করে ফিরছে, তখন বন্ধাই এর গভর্ণর হাউসে ভীষণ এক ডাকাতি হয়ে যায়। দুর্দান্ত দস্যু বনহুরই এই দস্যুতা করেছে পুলিশ রিপোর্টে এই রকম বলা হয়েছে। দস্যু শুধু অর্থ আর ধন-সম্পদই লুটে নিয়ে যায়নি, গভর্ণর কন্যা মিস্ এরুনাকেও হরণ করে নিয়ে গেছে।
দস্যু বনহুর গভীর রাতে বন্ধাই এর গভর্ণর হাউসে প্রবেশ করে কয়েকজন পুলিশ এবং পাহারাদারকে নিহত এবং আহতও করেছে।
বন্ধাই এর এই ভীষণ ডাকাতি-সংবাদ শুধু বন্ধাইতেই সীমাবদ্ধ রইলো না, দেশ হতে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়লো। এতোবড় দস্যুতা কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রথম হলো। কি ভাবে গভর্ণর হাউসে সশস্ত্র পাহারা পরিবেষ্টিত থাকা সত্বেও দস্যু প্রবেশ করে গভর্ণর মিঃ রাজেন্দ্র ভৌমকে অজ্ঞান করে তাঁর যথাসর্বস্ব নিয়ে পালিয়েছে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পুলিশ মহলে সাড়া পড়ে গেছে।
সমস্ত পুলিশ অফিসার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, টেলিগ্রাফে খবরটা প্রতিটি পুলিশ অফিসে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ অফিসে অফিসে আবার পড়ে গেছে সাজো সাজো রব।
শুধু এক দেশেই নয়–প্রত্যেকটা দেশে দস্যু বনহুরের নামে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ মহলই শুধু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েনি, প্রতিটি দেশের মানুষের বুকে কম্পন শুরু হয়েছে। বেশ কিছুদিন দস্যু বনহুরের অত্যাচার থেকে তারা মুক্ত ছিলো, আবার আঁতঙ্ক সৃষ্টি হলো সকলের মনে।
কান্দাই শহরের পুলিশ মহলও জেগে উঠলো, দস্যু বনহুর আবার উপদ্রব শুরু করলো! এতোদিন বেশ নিশ্চিন্ত মনেই পুলিশ অফিসারগণ নিজ নিজ কাজ করে যাচ্ছিলেন।
হঠাৎ করে আবার এই সংবাদে দেশের আবহাওয়া যেন পাল্টে গেলো। সবাই সজাগ হয়ে উঠলো আপন আপন কাজে।
বন্ধাই থেকে ডাক এলো পুলিশ সুপার মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরীর।
মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী এ ক’মাসে যেন হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। তেমন কোনো কাজ না থাকায় অস্বস্তি বোধ করছিলেন তারা। দস্যু বনহুরের পুনঃ আবির্ভাবে আবার সজাগ হয়ে উঠলেন। কর্মময় জীবন তাঁদের, বসে থাকার জন্য নয়।
মিঃ আহমদ ও মিঃ জাফরী বন্ধাই অভিমুখে রওনা দিলেন। সঙ্গে তাদের কয়েকজন অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসার রইলো। বনহুরকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় মিঃ জাফরীর মনে দারুণ একটা ক্ষোভ ছিলো। তিনি এবার বদ্ধ পরিকর হলেন, দস্যু বনহুরের পুনঃ আবির্ভাব যখন ঘটেছে তখন একবার দেখে নেবেন–দস্যু বনহুর মানুষ না অশরীরি আত্না। তাকে এবার গ্রেপ্তার না করে ছাড়বেন না কিছুতেই। দস্যু বনহুর তাকে যে নাকানি চুবানি খাইয়েছে তা তিনি কোনোদিন ভুলবেন না। দস্যু বনহুরের প্রতি তার শুধু রাগই নেই, ভীষণ আক্রোশ আছে, ওকে গ্রেপ্তার করতে না পারলে তিনি কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছেন না।
কান্দাই ছেড়ে পৃথক এক দেশ বন্ধাই।
যদিও প্লেনে যাওয়া-আসার সুবিধে আছে তবু মিঃ আহম্মদ ও মিঃ তাঁদের সহকারীদের নিয়ে জলপথে রওনা দিলেন।
কান্দাই বন্দর থেকে জাহাজযোগে বন্ধাই যাবেন মনস্থ করে নিলেন পুলিশ সুপার মিঃ আহম্মদ আর মিঃ জাফরী। নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে উঠে পড়লেন।
কান্দাই থেকে বন্ধাই এ পৌঁছতে সপ্তাহ কয়েক লেগে যাবে। পথে বন্দরে বন্দরে জাহাজ নোঙর করবে। মিঃ আহম্মদ এবং জাফরীর ইচ্ছা–তারা এ সব বন্দরে অবতরণ করে নানারূপ সন্ধান চালিয়ে খোঁজখবর নেবেন।
জাহাজ শাহান শাহ’ বন্দর ত্যাগ করবার পূর্বে মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী ক্যাপ্টেন জমরুদীর সঙ্গে গোপনে কিছু আলাপ করে নিলেন।
মিঃ জাফরী ক্যাপ্টেন জমরুদীকে বললেন–দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে আমরা বন্ধাই রওনা দিলাম বটে, কিন্তু আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত প্রয়োজন।
ক্যাপ্টেন জমরুদীর মুখে স্মিত একটুকরো হাসি ফুটে উঠলো, তিনি গম্ভীর স্থির কণ্ঠে বললেন–দস্যু বনহুর গ্রেপ্তারে আমি আপনাদের সর্বান্তকরণে সাহায্য করবো।
থ্যাঙ্ক ইউ ক্যাপ্টেন; আপনার সহযোগিতাই হবে আমাদের এ যাত্রার একমাত্র কামনার বস্তু।
‘শাহান শাহ’ কান্দাই এর সর্বশ্রেষ্ঠ জাহাজ। যাত্রীবাহী এ জাহাজে প্রায় পাঁচ শত লোক এক সঙ্গে আরোহণ করতে পারে। সুন্দর সুসজ্জিত মনোরম এই জাহাজখানায় এমন কিছুর অভাব নেই, যা যাত্রীদের অসুবিধায় ফেলতে পারে। দোকান-পাট, বাজার, হোটেল, এমন কি সিনেমা হলও রয়েছে শাহান শাহে।
এহেন সর্ব উৎকৃষ্ট জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন মিঃ জমরুদী বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে। বলিষ্ঠ সুঠাম গঠন, দীপ্ত উজ্জ্বল চোখ। মুখে ছাট করা দাড়ি। দু’চারটে চুলে পাক ধরেছে। দাড়িও পেকেছে মাঝে মাঝে। ক্যাপ্টেন জমরুদী গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ, কথা কম বলেন–কাজ করেন বেশি।
জাহাজে তিনি আরোহীদের সঙ্গে মধুর ব্যবহার করেন। ক্যাপ্টেন হয়েও তিনি সমস্ত জাহাজের সর্বত্র ঘুরে ফিরে দেখাশোনা করেন, কারও কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা নিজে খবর রাখেন।
