জীবনে কোনোদিন বনহুর এমন ঝড়ের কবলে পড়ে নি। পর্বতের গায়ে সেকি ভয়ঙ্কর তুফান।
এখানে বনহুর ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলছিলো।
ওদিকে তাজ গাছের ডালের সঙ্গে বাঁধা লাগামটা প্রাণপণ চেষ্টায় ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছিলো।
তাজের দেহে অসীম বল। দস্যু বনহুরের অশ্ব সে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তাজ লাগাম ছিঁড়ে ফেললো।
ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে সে ছুটতে শুরু করলো যেদিকে তার প্রভু চলে গেছে। পশু হলেও তাজের বুদ্ধিবল ছিলো অদ্ভুত। তাজ এতো বিপদেও নিজকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে প্রভুর সন্ধানে অগ্রসর হলো। কিন্তু এলোমেলো দমকা ঝড় তাজ বেশি দূর এগুতে সক্ষম হলোনা। তাছাড়াও পর্বতটা বেশ খাড়া তাজ পর্বত বেয়ে উপরে উঠতে পারছিলো না।
তাজ বার বার পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে লাগলো।
বনহুর তখন তাজের নিকট হতে অনেক দূরে উপরে উঠে গেছে। ঝড়ের মধ্যে বনহুরের একবার মনে পড়লো তাজের কথা। কিন্তু বেশিক্ষণ কিছু চিন্তা করবার মতো এখন পরিবেশ নয়।
বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে প্রবল, বৃষ্টিপাত শুরু হলো।
পর্বতের গায়ে কিছুতেই বনহুর নিজকে ধরে রাখতে পারছিলোনা এদিকে ঝড় আর একদিকে বৃষ্টি, বনহুরের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন হয়ে উঠেছিলো।
হঠাৎ বনহুর তাকালো সম্মুখে, বিদ্যুতের আলোতে যেন অস্পষ্ট দেখতে পেলো দূরে একটি গুহার মুখে দাঁড়িয়ে আছে তার নূরী, শুভ্রবসন এলোচুল আঁচলখানা ঝড়ের বেগে উড়ছে।
বনহুর ভুলে গেলো ঝড়বৃষ্টি আর প্রচন্ড জলস্রোতের কথা। দু’হাত প্রসারিত করে ছুটে গেলো–নূরী–নূরী— সঙ্গে সঙ্গে বনহুর পড়ে গেলো সম্মুখস্থ ফাটলের মধ্যে। প্রচন্ড জলরাশি গর্জন করে নিচের দিকে ছুটে চলেছে, সেই জলস্রোতের মধ্যে বনহুর তলিয়ে গেলো কোন্ অতলে।
২.০৬ বনহুরের অন্তর্ধান
গভীর রাত্রির নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে প্রতিধ্বনি জাগে–খট খট খট খট…
আস্তানায় বিশ্রাম করছিলো রহমান। সেদিন সর্দারের নিরুদ্দেশের পর আজ পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান নেই। কান্দাই জঙ্গল থেকে কান্দাই শহর রহমান চষে ফিরেছে, কোথাও সর্দারের সন্ধান পায়নি। সমস্ত অনুচর সর্দারের খোঁজে দেশ হতে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। তন্ন তন্ন করে সন্ধান চালিয়েছে তারা শহরে-নগরে-বন্দরে। আবার সবাই এক এক করে ফিরে এসেছে–কেউ জানেনা কোথায় তাদের সর্দার।
সেদিনের পর থেকে রহমানের চোখের ঘুম অন্তর্ধান হয়েছে। সদা-সর্বদা ঐ এক চিন্তা, সর্দার কাউকে কিছু না বলে গেলো কোথায়? বনহুরের মনে অশান্তির কথা আর কেউ না জানলেও জানে রহমান, কাজেই সর্দারের জন্য রহমান আশঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
হঠাৎ অশ্বপদ শব্দে রহমান চমকে উঠে, অন্যান্য অনুচরগণের মনেও দোলা লাগে, এ শব্দ যে তাদের অতি পরিচিত। দস্যু বনহুরের অশ্ব তাজের পদশব্দ এটা।
রহমান সুড়ঙ্গ মুখে দাঁড়ায়। দূরবীণ চোখে লাগিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিন্তু অন্ধকারে কিছুই সে দেখতে পায় না।
আস্তানায় সার্চলাইট জ্বেলে দেওয়া হলো। যেদিন থেকে অশ্বপদ শব্দ আসছিলো সেই দিন সার্চলাইটের আলো পড়তেই রহমান বিস্ময়ে চমকে উঠলো, তাজ বেগে ছুটে আসছে–কিন্তু তার পিঠ শূন্য।
রহমান সুড়ঙ্গ পথের বাইরে এসে দাঁড়ালো।
ক্রমে তাজের পদশব্দ স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। অল্পক্ষণেই তাজ এসে দাঁড়ালো। একি! তাজের লাগাম এমন ঘেঁড়া কেন? অর্ধেকটা লাগাম তাজের মুখের মধ্যে ঝুলছে।
রহমান তাজের পিঠে-গলায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলো–ওরে, সর্দারকে তুই কোথায় রেখে এলি? বল, ওরে বল…
তাজ যেন রহমানের কথা বুঝতে পারলো, সম্মুখের পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে লাগলো সে, কোনো কথা যেন তাজ তাকে বুঝিয়ে বলতে চায়।
রহমান এবং আরও অন্যান্য অনুচরগণ এসে তাজকে ঘিরে দাঁড়ালো। সকলের চোখেই বিস্ময়, তাজের লাগাম এভাবে অর্ধেকটা ছিন্ন কেন।
তাজ পশু, সে বলতে পারলো না–জবাব দিতে পারলো না বনহুরের অনুচরদের কাছে।
বনহুর যখন তাজকে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে রেখে বিশ্রাম করছিলো, ঠিক তখন তার কানে ভেসে এসেছিলো পরিচিত একটি সুর। তন্দ্রাগ্রস্তের মত যখন সে অগ্রসর হয়েছিলো, এগিয়ে গিয়েছিলো গহন বনের দিকে।
তারপর আর ফিরে আসেনি বনহুর।
ঝড় উঠেছিলো–সেকি ভীষণ তুফান! আকাশ গাঢ় মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিলো, গাছ-পালা মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ছিলো। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছিলো জলস্রোত। তাজ নিজকে আর স্থির রাখতে পারেনি, তুফানের ঝাপটায় সে অস্থির হয়ে পড়েছিলো। শেষ পর্যন্ত লাগাম ছিঁড়ে ছুটে ছিলো মনিবের সন্ধানে।
পাহাড়ের পাদমূলে এসে আর সে উঠতে পারেনি উপরে। অনেক চেষ্টা করেছিলো তাজ, অনেক খুঁজেছিলো সে প্রভুকে। যখন সে প্রভুর কোনো সন্ধান পেলো না, তখন সে ছুটলো কান্দাই অভিমুখে। পথে কোনো বাধা-বিঘ্নই সে মানলো না, অবিরাম ছুটে কয়েকদিন পর সে তাদের আস্তানায় এসে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। তাজের মুখের সঙ্গে ঝুলছে এখনও সেই ছিন্ন লাগাম খানার খানিকটা অংশ।
রহমান অনুমানে বুঝে নিলো নিশ্চয়ই তাদের সর্দারের কোনো বিপদ হয়েছে। না হলে তাজ এভাবে একা কখনও ফিরে আসতো না। তাছাড়া তাজের যে অবস্থা তাতে বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে–তাজ অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।
রহমান তার কয়েকজন সেরা অনুচর সহ তাজের সঙ্গে অশ্ব নিয়ে আবার আরাকান অভিমুখে রওনা দিলো।
