বনহুর একটা অজ্ঞাত। আকর্ষণে ছুটে চলেছে কে যেন তাকে হাত ছানি দিয়ে ডাকছে। কিছুতেই সে নিজকে ধরে রাখতে পারছে না।
মাথার উপরে প্রখর সূর্য অগ্নিবর্ষণ করছে যেন।
নীচে মৃত্তিকা গণগণে সীসার মতো তীব্র জ্বালাময় হয়ে উঠেছে। বনহুরের সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে চুপসে উঠেছে। বারবার হাতের পিঠে ললাটের ঘাম মুছে নিচ্ছিলো সে।
পিপাসায় কণ্ঠ শুকিয়ে উঠছিলো, ক্ষুধায় নাড়ী হজম হবার জোগাড় কিন্তু কোনোদিকে খেয়াল নেই বনহুরের।
পথে কোন বৃক্ষলতা না থাকায় এতোটুকু ছায়ার চিহ্ন ছিলো না যেখানে বনহুর তার অশ্ব নিয়ে একটু বিশ্রাম করে নেবে।
তাজ প্রভুর কষ্ট বেশ উপলব্ধি করতে পারছিলো তাই সে দ্রুত আরও দ্রুত ছুটছিলো।
তাজও হাঁপিয়ে পড়েছিলো অত্যন্ত। আজ ক’দিন সে অবিরত ছুটেছে। পথে দু’দিন কেটে গেছে আজ তৃতীয় দিন।
বেলা গড়িয়ে আসতেই বনহুর এক পর্বতের পাদমূলে এসে পৌঁছলো।
এটাই আরাকানের প্রথম সীমানা, আরাকান পর্বত।
অদূরে পর্বতটার পাদমূলে অসংখ্য নাম-না-জানা বৃক্ষলতা গুল্ম। মাঝে মাঝে উঁচুনীচু টিলা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একটা বিরাট অশথ বৃক্ষের নিচে এসে বনহুর তাজের পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো।
বনহুর বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে তাকালো চারিদিকে। অত্যন্ত পিপাসা বোধ করলো সে। কিন্তু কোথায় পানি শুকনো মাটির বুক যেন খাঁ খাঁ করছে।
বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিলো। একটা শীতল বাতাস তার সমস্ত শরীর জুডিয়ে দিয়ে গেলো। বনহুর অনেকটা শান্তিবোধ করলো এবার। তাজকে পাশে বেঁধে বৃক্ষতলে বসে পড়লো। অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো সে। হাতের উপর মাথা রেখে চীৎ হয়ে শুয়ে পড়লো বনহুর, অল্পক্ষণেই নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লো।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছে খেয়াল নেই হঠাৎ একটা সুমিষ্ট গানের সুরের আবেশে ঘুম ভেঙে গেলো বনহুরের। চোখ মেলে তাকালো কোন দিক থেকে সুরটা ভেসে আসছে শুনতে চেষ্টা করলো।
উঠে বসলো বনহুর। অস্পষ্ট একটা গানের সুর দূরে–বহু দূরে থেকে যেন ভেসে আসছে।
তন্দ্রাচ্ছন্নের মত বনহুর কান পেতে শুনতে লাগলো। সুরটা এখনও সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। বনহুরের হৃদয়ে এ সুরের রেশ এক মোহময় পরিবেশের সৃষ্টি করে চললো। বনহুর এবার উঠে দাঁড়ালো, সুরের টানে এগিয়ে চললো সে আরাকান পর্বতের দিকে।
পিছনে গাছের ডালের সঙ্গে তাজের লাগাম বাঁধা রয়েছে। বনহুরকে মন্থর গতিতে তন্দ্রাচ্ছন্নের মত পর্বতের দিকে এগুতে দেখে তাজ চঞ্চল হয়ে উঠলো। পশু-প্রাণ হলেও সে যেন বুঝতে পারলো তার প্রভু কোনো অজানার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
তাজ সম্মুখের পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে লাগলো।
কিন্তু বনহুর ফিরেও তাকালো না সে যেন কোনো যাদুমন্ত্রে এগুচ্ছে।
ঝোপ-ঝাড় আগাছা জঙ্গল পেরিয়ে বনহুর অগ্রসর হলো। ছোট ছোট টিলাগুলি পড়ে রইলো পিছনে। পর্বতের গা বেয়ে উঠতে লাগলো বনহুর উপরের দিকে।
গানের সুর আরও স্পষ্ট হয়ে ভেসে আসছে।
বনহুরের মুখমন্ডল দীপ্তময় হয়ে উঠেছে এ যেন তার অতি পরিচিত সুর। কত দিন যেন সে এ সুর শুনেছে যে সুর গাথা হয়ে রয়েছে তার অন্তরের অন্তরে।
বনহুর তন্দ্রাচ্ছন্নের মত এগুচ্ছে।
ললাটে ফুটে উঠেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। চোখ দুটো উজ্জ্বল দীপ্তময়, সুরের রেশ স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে।
পর্বতের কন্দরে কন্দরে সেই সুরের প্রতিধ্বনি করুণ কান্নার মতো ঝরে পড়ছে।
অপূর্ব অভূত সে সুর।
কোনোদিকে খেয়াল নেই বনহুরের, শুধু সুরের টানে সে অগ্রসর হচ্ছে।
ঘনজঙ্গলে পর্বতের গা আচ্ছন।
তেমনি ঝাপসা অন্ধকার চারিদিক ঘোলাটে করে তুলেছে। বনহুরের শরীরে কাঁটার আঁচড় লেগে রক্ত ঝড়ে পড়তে লাগলো। জামা ছিঁড়ে গেলো, পাগড়ির কোনো কোনো অংশ কাঁটায় বিধে রইলো। তবু চলেছে সে, অতি মন্থর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বনহুর সামনের দিকে।
এমন সময় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে আসে।
কখন যে আকাশে ঘন মেঘ জমে উঠেছিলো সেদিকে খেয়াল করতে পারেনি বা খেয়াল হয়নি বনহুরের।
দমকা বাতাস প্রচন্ড বেগে এগিয়ে আসছে। যেন শত শত রাক্ষস হুঙ্কার দিয়ে ছুটে আসছে তার দিকে।
ভীষণ ঝড় শুরু হলো।
বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
এতোক্ষণ যে সুর বনহুরকে আকৃষ্ট করে টেনে নিয়ে চলেছিলো সে সুরের রেশ থেমে গেছে, হারিয়ে গেছে যেন প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যে।
বনহুরের কানে এখনও যে সুরের প্রতিধ্বনি জেগে রয়েছে। উদ্ভ্রান্তের মতো এগুচ্ছে সে। সম্মুখের দিকে।
মস্ত মস্ত গাছ পালাগুলো মড় মড় শব্দে ভেঙে পড়ছে।
কোনো কোনো গাছ সমূলে উপড়ে পড়ে যাচ্ছে বিরাট দৈত্যের নিহত দেহের মতো।
কোনোদিকে খেয়াল নেই বনহুরের।
তখনও সে এগিয়ে যাচ্ছে, দেখতে চায় বনহুর–কে সেই সুরের অধিকারিণী কে সেই মায়াময়ী।
ঝড়ের বেগ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
বনহুর কখনও হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে, কখনও উঠেছে আবার এগুচ্ছে সম্মুখ দিকে। পর্বতটার গা বেয়ে অনেকখানি উপরে উঠে এসেছে সে।
বনহুর এখন এমন একস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে থেকে পর্বতের পাদমূল অনেক নিচে। ওপাশেই পর্বতের গা বেয়ে মস্ত বড় একটা ফাটল। ফাটলের তলদেশে খরস্রোতা এক নদী।
এতো জোরে ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়েছে কিছু দেখতে পাচ্ছেনা বনহুর। শুকনো পাতা আর ধূলো রাশিরাশি তার দৃষ্টিশক্তিকে অন্ধ করে দিচ্ছে। সম্মুখে দু’হাত প্রসারিত করে এগুচ্ছে সে।
